বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে নামেই চালু হয়েছে মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল৷ কারণ, এ রাজ্যে ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে চালু হওয়া ওই সব হাসপাতাল অকেজো৷ এমনই দাবি বিভিন্ন সময় উঠেছে এ রাজ্যেরই খোদ সরকারি চিকিৎসক সহ বিভিন্ন মহলের তরফে৷ ওই দাবিকেই এ বার সিলমোহর দিল স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে থাকা এ রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরেরই এক নির্দেশ৷ আর, ওই নির্দেশের জেরে আবার এই ধরনের অভিযোগও প্রমাণ হয়ে গেল যে, ২০১৬-র বিধানসভা ভোটের দিকে লক্ষ্য রেখেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল চালুর কথা বলে আসলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গেও প্রতারণা করা হয়েছে৷

পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে চার বছরের সাফল্যের খতিয়ানে উল্লেখ করা হয়েছিল, এ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ৪১টি মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল চালু হয়েছে৷ একই সঙ্গে ওই খতিয়ানে এ রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের দাবিও করা হয়েছিল৷ যদিও, খোদ এ রাজ্যেরই সরকারি ডাক্তারদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের তরফে এমনই দাবি করা হয়েছিল যে, ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’৷ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চালু হওয়া মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি NAYAGRAMহাসপাতাল প্রসঙ্গে ওই সংগঠনের তরফে এমন প্রশ্নও তোলা হয়েছিল, ওই সব হাসপাতালে আপৎকালীন বিভাগ-ই নেই৷ কাজেই, সুপার স্পেশালিটি পরের প্রশ্ন৷ তার আগে এই বিষয়টি দেখার যে, কীভাবে আপৎকালীন বিভাগ ছাড়া কোনও চিকিৎসা কেন্দ্রকে হাসপাতাল বলা যায়? এই সব হাসপাতাল কোনও মতেই সুপার স্পেশালিটি হতে পারে না৷ চালু হওয়া এই সব হাসপাতালকে খুব বেশি হলে পলিক্লিনিক বলা যেতে পারে৷ সাধারণ মানুষ যদি উপকৃত না হন, তা হলে শুধুমাত্র হাসপাতালের জন্য বিল্ডিং আর কাচের ঘর দাঁড় করিয়ে কীভাবে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি করা যায়?

তবে, অবিশ্বাস্য হলেও এখন সত্য যে, খোদ রাজ্যের সরকারি ডাক্তারদের ওই ধরনের অভিযোগ-দাবিকেই এ বার স্বীকৃতি দিল স্বাস্থ্য দফতরের এক নির্দেশ৷ গত ১৫ জুন ইস্যু করা রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ওই নির্দেশে এমনই বলা হয়েছে, যে সব গ্রামীণ হাসপাতালে মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছে, সেই সব গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা ওই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত হবে তখন, যখন ওই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল কার্যকারী হবে৷ সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলেন, ‘‘এই নির্দেশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য দফতরই স্বীকার করে নিল যে ওই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল চালু হলেও সেগুলি কার্যকারী নয়৷ অর্থাৎ, নামেই চালু হয়েছে ওই সব হাসপাতাল৷ সরকারি নির্দেশে এ ভাবে স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমে আবার এটাও প্রমাণ হয়ে গেল যে, ভোটের দিকে লক্ষ্য রেখেই বলা হয়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল চালু হয়েছে৷’’

সরকারি নির্দেশে এখনও অকেজো চালু হওয়া মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল৷
সরকারি নির্দেশে এখনও অকেজো চালু হওয়া মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল৷

তবে, শুধুমাত্র যে চালু হওয়ার পরেও মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলি অকেজো থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিল সরকারি এই নির্দেশ, তাও আবার নয়৷ সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘এই নির্দেশে যেমন বলা হয়েছে ওই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল কার্যকারী হলে সেখানে ওই সব গ্রামীণ হাসপাতাল স্থানান্তরিত হয়ে যাবে৷ তেমনই, এই নির্দেশেই আবার বলা হয়েছে, প্রোমোটিভ এবং প্রিভেনটিভ কেয়ার সার্ভিসেস অর্থাৎ, জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের পরিষেবা আগের মতোই চালু থাকবে৷ এর ফলে, যদি শেষ পর্যন্ত এই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল কার্যকারীও হয়, তা হলে, সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় প্রাইমারি, সেকেন্ডারি এবং টার্শিয়ারি লেবেলের পরিষেবার বিষয়টিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এ ভাবে পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার থেকেও বেশি আশঙ্কার বিষয়, হয়তো দেখা যাবে এই সব মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব এক সময় বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হবে৷’’

‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে কলকাতার আইপিজিএমইআর৷ ফাইল ছবি৷
‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে কলকাতার আইপিজিএমইআর৷ ফাইল ছবি৷

কেন এই ধরনের আশঙ্কা? ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলেন, ‘‘মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের কথা বলা হচ্ছে৷ অথচ, মাল্টি স্পেশালিটি এবং সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে৷ আসলে, এই হাসপাতালগুলির মধ্যে কোনটি মাল্টি স্পেশালিটি, আর কোনটি সুপার স্পেশালিটি, সেই বিষয়টিও স্পষ্ট নয়৷ তার উপর, মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল বলা হলে যে সব বিভাগ, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকার কথা, সে সব নেই৷ এমনকী ইমার্জেন্সি বিভাগ-ই নেই৷ এখনও ইনডোর অর্থাৎ, অন্তর্বিভাগও চালু হয়নি৷ কোথাও কোথাও মাঝে মাঝে ডাক্তার নিয়ে গিয়ে আউটডোর অর্থাৎ, বহির্বিভাগের পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘অন্যদিকে, সুপার স্পেশালিটি হল এসএসকেএম হাসপাতাল৷ যে কারণে এসএসকেএম হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের সুপার স্পেশালিটি বিভাগ যেমন, কার্ডিওলজি, কার্ডিওথোরাসিক, নিউরোলজি, ইউরোলজি, নেফ্রোলজি, প্লাস্টিক সার্জারি, পেডিয়াট্রিক সার্জারি রয়েছে৷ অথচ, বিভিন্ন ধরনের পরিকাঠামোগত খামতি নিয়ে চালু হওয়া এই সব হাসপাতালে সুপার স্পেশালিটি বিভাগের জন্য যেমন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই৷ তেমনই, এই সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-যন্ত্রও নেই৷ দেখা যাবে, এই সব হাসপাতালের পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণের জন্য হয়তো এক সময় বেসরকারি সংস্থাকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে৷ আর, এ ভাবে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় আরও বেশি করে বেসরকারীকরণের পথও খুলে যাবে৷’’

প্রতীকী ছবি৷
প্রতীকী ছবি৷

গত ১৫ জুন জারি হওয়া ওই নির্দেশের কপি বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, আলিপুরদুয়ার, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে পাঠানো হয়েছে৷ একই সঙ্গে ওই নির্দেশের কপি পাঠানো হয়েছে বড়জোড়া, ছাতনা, ওন্দা, সাগরদিঘি, ফালাকাটা, ডেবরা, শালবনী, গোপীবল্লভপুর, উত্তর মেছোগ্রাম এবং খড়িকামাথানি মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্টকে৷ বড়জোড়া, ছাতনা, ওন্দা, সাগরদিঘি, ফালাকাটা, ডেবরা, শালবনী, গোপীবল্লভপুর, উত্তর মেছোগ্রাম এবং খড়িকামাথানি গ্রামীণ হাসপাতালের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকদেরও পাঠানো হয়েছে ওই নির্দেশের কপি৷ এই সব জেলার বাইরে রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে চালু হওয়া মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলি কি তা হলে কার্যকরী রয়েছে? সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অবশ্য বলছেন, ‘‘নামেই চালু হওয়া অন্য মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলির অবস্থাও একই রকম৷ পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি নিয়ে এই সব হাসপাতাল চালু করে দেওয়া হয়েছে৷ সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় উন্নয়নের নামে এ ভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে৷ সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে৷ চূড়ান্ত মিথ্যাচার করা হচ্ছে৷’’

কী বলছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী? স্বাস্থ্য দফতরের ওই নির্দেশে উল্লেখিত জেলাগুলির মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলি কার্যকারী হতে এখনও কত সময় লাগতে পারে? বিশ্বরঞ্জন শতপথী বলেন, ‘‘আশা করছি, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এই হাসপাতালগুলি কার্যকারী হয়ে যাবে৷’’ অভিযোগ উঠছে, এই জেলাগুলির বাইরে থাকা রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে চালু হওয়া মাল্টি অথবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলিও পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি নিয়ে অকেজো হয়ে রয়েছে? রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বলেন, ‘‘কারা অভিযোগ করছেন, আমার জানা নেই৷ আমাদের কাছে অভিযোগ এলে খতিয়ে দেখা হবে৷’’

______________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) হাসপাতালে বেড না মিললে পৌঁছে যেতে হবে কালীঘাটে!
(০২) শাসকের দেউলিয়া রাজনীতিতে ডাক্তার-হাসপাতাল!
(০৩) সন্তানের পরিচয় জানাতে প্রথমেই আসুক মায়ের নাম!
(০৪) দলবদলের সঙ্গেই বাতিল করতে হবে জনপ্রতিনিধি-পদ
(০৫) ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না যৌনপল্লির ১৬% বাসিন্দা
(০৬) ৪.৫ কোটি ভুক্তভোগীতেও চাপা পড়ে যাবে সারদাকাণ্ড!
(০৭) কলকাতায় এ বার উবের ক্যাব চালাবেন যৌনকর্মীরা
(০৮) কলকাতায় ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারে বিরল নজির
(০৯) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’
(১০) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(১১) এক ক্যুইজ মাস্টার আর বাংলার ‘সবুজ লাড্ডু’র কাহিনি
(১২) সারদা-নারদের সত্য এবং মদন বনাম মদন আর মিত্র
(১৩) সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া
(১৪) সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!
(১৫) কৃমিনাশক কর্মসূচিতে প্রস্তুত ছিল না স্বাস্থ্য দফতর!

______________________________________________________________