Ok, so am I also supposed to return my Sahitya Academy Award? Oh Wait. Haven’t Got it’.

একের পর এক সাহিত্যিক যখন আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তখন এ রকম একটি টুইট করেছিলেন চেতন ভগত৷ সে নিয়ে বিস্তর মজা-মশকরা হয়৷ ব্স্তুত চেতনের অতিবড় ভক্ত পাঠকও তাঁর সঙ্গে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের বিষয়টি মেলাতে পারেননি৷ আর চেতনের কথাতেও প্রতিবাদের কোনও সুর ছিল না, বরং নিছক রসিকতা ছিল৷

saroj-darbar
সরোজ দরবার

কিন্তু এ টুইট থেকে মজা-রসিকতা ছেনে ফেলে দিলে, একটি মূলগত প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা৷ সাহিত্যিক, পরিচালকরা একের পর এক পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে৷ দেশজুড়ে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত, বিভাজনের রাজনীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে সম্মিলিত এই প্রতিবাদ৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, যাঁর পুরস্কার নেই, অথচ প্রতিবাদী বিবেক আছে, প্রতিবাদ জানানোর ইচ্ছে আছে, তিনি কী করবেন? তিনি তো আর পুরস্কার ফেরত দিতে পারছেন না, এবং অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে যত প্রতিবাদই তিনি করতে চান না কেন, মিডিয়ার আলোর করুণা তাঁর উপরে পড়বে না৷ তাহলে? তিনি তাঁর প্রতিবাদ জানাবেন কী করে? আর তাঁর একক প্রতিবাদ রাষ্ট্রের কান অবধি পৌঁছাবেই বা কী করে?

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে, শিল্পীদের বেছে নেওয়া এ পথ কতটা যুক্তিসংগত, আর কতখানিই বা আবেগতাড়িত? অধ্যাপক কালবর্গির হত্যা থেকে শুরু করে দাদরিতে নিরপরাধ আকলাখকে হত্যার মতো ঘটনাতেই যে ভবিষ্যতে বড়সড় বিভাজনের বীজ উপ্ত আছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ ভারত ভাগ্যবিধাতা হয়ে যে সরকার মসনদে আসীন, তারাও যে এই বিভাজনের রাজনীতির আগুনে তুষ ফেলছে তা বলাই বাহুল্য৷ শুধু তুষ ফেলা নয়, বরং এ সরকার চাইছেই ছলে বলে কৌশলে দেশকে একটা হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে৷ একাধারে দেশের সাংবিধানিকভাবে ঘোষিত ও ঐতিহ্যবাহী বহুত্ববাদকে কাঁচকলা দেখিয়ে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভাবনার উত্তরসূরি আর দীনদয়াল উপাধ্যায়ের শিষ্যরা নীরবতাকে সম্বল করেই গোপন ইন্ধন জুগিয়ে চলেছেন বিভাজনে, ধর্মীয় মৌলবাদে৷ বস্তুত তাঁরা জানেন, এই বিভাজনই তাঁদের আগামী নির্বাচনগুলিতে জেতার ইউএসপি হতে পারে৷ নয়তো শুধু কাজের দোহাই পেড়ে হালে পানি পাওয়া যাবে না৷ বিভিন্ন রাজ্যও নিজেদের পাপে এমন ডুবে আছে যে, নিজেদের ঘরে বসে হুড়ুম-দাড়ুম করলেও সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করতে তারা অপারগ৷ এই বাস্তবতা, এই বিভাজন, গোপন ইন্ধন আজ দেশে ‘ওপেন সিক্রেট’৷ স্বাভাবিকভাবেই শিল্পী-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানীরা এর বিরুদ্ধাচরণ না করে পারছেন না৷ আর তার রাস্তা হিসেবে পুরস্কার প্রত্যাখানই পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাঁরা৷

স্পষ্টতই তাঁদের ক্ষোভ কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে৷ সরকারের মাথায় চড়ে বসে থাকা ধর্মমূলক এক দলের বিরুদ্ধে৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, এই প্রতিবাদে কতজন শামিল হতে পারেন বা পারছেন? কতজন শিল্পী এই ধরনের পুরস্কার পেয়েছেন? যদি ১৩ জন পুরস্কার পরিচালক পুরস্কার প্রত্যাখান করেন, তাহলে কি ধরে নিতে হবে বাকিরা এই বিভাজন, এই মৌলবাদ সমর্থন করছেন? একদমই নয়৷ যে শিল্পী হয়তো পুরস্কার পেয়েও ফিরিয়ে দেননি, তিনিও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে৷ তিনিও চাইছেন দেশের সংহতি রক্ষিত হোক৷ কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান তাঁকে প্রতিবাদের পংক্তি থেকে সরিয়ে দিচ্ছে৷ তাঁর মতামত চলে যাচ্ছে মিডিয়ার আলোর আড়ালে৷ ফলত, তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে৷ যা সমষ্টির জোর দেখাতে পারত, তা একক বা মুষ্টিমেয়র আস্ফালনে পরিণত হচ্ছে৷

বস্তুত শিল্পীমহল দ্বিধাবিভক্ত এই প্রত্যাখানের প্রশ্নে৷ কেউ সমর্থন করছেন, কেউ করছেন না৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ বড় কথা, সকলে এই বিভাজন সমর্থন করছেন কি করছেন না? এই জায়গায় এসে বিভেদ প্রায় নেই বললেই চলে৷ শিল্পী হোন বা সাধারণ মানুষ, কেউই চান না দেশের বহুত্ববাদী মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরুক৷ এত ঝড়ঝাপটা, আগ্রাসনের মধ্যেও দেশ তার যে চরিত্র নিয়ে বেঁচে আছে, তাই-ই বজায় থাকুক, এমন প্রার্থনা করা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়, বরং অনেক অনেক বেশি৷ দেশ মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে হিন্দু তালিবান হয়ে উঠুক, এমনটা হয়তো কোনও সাচ্চা দেশবাসীই চাইছেন না৷এবং তাঁরাই সংখ্যায় অগণন৷ অবশ্যই সংগীতশিল্পী অভিজিতের মতো কেউ কেউ আছেন৷ কিন্ত ‘আচ্ছে’ দেশবাসী প্রমাণ করতে গিয়ে তাঁরা হয়তো নিজেরাই ভুলে যাচ্ছেন, দাঙ্গার আগুন কাপড় দেখে লাগে না৷ সে আগুন ছড়ালে তাঁর মুখ পুড়তেও বেশি দেরি হবে না৷ শিবসেনার নন্দীভৃঙ্গিদের তখন আর ডেকে-হেঁকেও পাওয়া যাবে না উদ্ধারকর্তা হিসেবে, এ কথা বুঝতে হয়তো তাঁর এখন খানিকটা অসুবিধাই হচ্ছে৷dibakar2

এই অবস্থায় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান বোধহয় তাই সঠিক যুক্তির পথ নয়৷ আবেগ সরিয়ে শিল্পীরা যদি একটু যুক্তি দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করতেন, তাহলে একটি প্রতিবাদী মঞ্চ তৈরি করা যেত পারত শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে৷ পুরস্কার থাকুক না থাকুক, ফেরান না ফেরান, যে রাজ্যেরই হোন না কেন, সমভাবনার শিল্পীরা একজোট হয়ে এক ধারণায় প্রভাবিত করতে পারতেন বৃহত্তর জনমানসকে৷ সেই প্রতিবাদ একখানা পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার থেকে অনেক জোরদার ও কার্যকরী হত বলেই মনে হয়৷ এখনও যে অভিঘাত তৈরি হচ্ছে না তা নয়৷ কিন্তু কে না জানে এক কান-কাটা গাঁয়ের বাইরে দিয়ে গেলেও, দু’ কান গাঁয়ের মাঝখান দিয়ে যায়! গুজরাত দাঙ্গা যাদের কাছে অতীত, তাদের এক এক করে পুরস্কার ফিরিয়ে বড়জোর একটু ঝাঁকুনি দেওয়া যায়, টলানো যাবে বলে তো মনে হয় না৷

আর থাকল শিল্পের পথ৷ প্রত্যেক শিল্পী যদি তাঁর শিল্পের মাধ্যম দিয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে একটা গোটা দেশ সেই প্রতিবাদের ভাবনা ধমনীতে নিয়েই বেড়ে উঠতে পারে৷ এখনও বিভাজন চাওয়া মানুষ অতি অতি সংখ্যালঘু, এ বিশ্বাস আছে এ কলমচির৷ ধর্ম ও সংস্কৃতিতে বহুত্ববাদে আস্থাশীল সংখ্যাগুরুরা যদি কাগজে-কলমে প্রতিবাদ ছেড়ে সত্যই সক্রিয় ভূমিকায় দেশের এই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার মুখোমুখি হতে পারেন, তবে এই বিভাজনকামীদের ছোঁড়া পাথর অনায়াসে গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে৷ শিল্পীরাই এক্ষেত্রে হতে পারেন যথার্থ অনুঘটক৷ অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে পুরস্কার ফিরিয়ে যদি আবার ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম নিয়ে সিনেমা বানাতে বসেন পরিচালকরা, তবে কোথাও একটা যেন তাঁদের প্রতিবাদটাই খাটো হয়ে যায়৷ হারিয়ে ফেলে গ্রহণযোগ্যতা৷

এ রাজ্যেও সাম্প্রতিক অতীতে বহুবার শিল্পী-সাহিত্যিকরা নানা ইস্যুতে পথে নেমেছেন৷কিন্তু তাতে কতগুলো প্রতিবাদের গান হয়েছে, কটা প্রতিবাদের কবিতা আমরা পেয়েছি? কটা সিনেমাতেই বা প্রতিবাদ উঠে এসেছে? কেউ কেউ নিশ্চয়ই করেছেন৷ তা ইতিহাসে থেকেও যাবে৷ কিন্তু রাজনীতির পাশাখেলা পটপরিবর্তনে যতটা সহায়ক হয়েছে ততটাই ভূমিকা কি নিতে পেরেছিল শিল্প-সাহিত্য? গণজাগরণের স্বপ্ন দেখিয়ে অঙ্গীকারে আবদ্ধ করতে পেরেছিল কি? অন্তত ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবাদী শিল্প-সাহিত্যের ভূমিকাকে নেহাত বালখিল্য মনে হওয়া অযৌক্তিক নয়৷ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিবাদের পথে হেঁটে আলো জ্বালাতে পারতেন শিল্পী-সাহিত্যিক-চিত্রপরিচালকরা৷ দুঃখের বিষয়, এখনও পর্যন্ত তা অধরাই থেকে যাচ্ছে৷box

চেতন মশকরাই করেছিলেন৷ কিন্তু তাঁর মশকরাটাই এখন যেন জ্বলন্ত ছ্যাঁকা হয়ে দেখা দিচ্ছে৷ শিল্পীদের কথা বাদ দিলাম, কোটি কোটি সাধারণ মানুষও তো চান না এই বিভাজন৷ চান না দেশটা গুজরাত হয়ে যাক৷ তাঁরা তাহলে কী করবেন? তাঁদের কণ্ঠস্বর কি পৌঁছাবে না কোথাও? অসহিষ্ণুতার বিনাশ অবশ্য একেবারে আত্মস্তর থেকেই হওয়া সম্ভব৷ আমি নিজে যদি ব্যক্তিগতভাবে আমার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পড়শির প্রতি সহজাত ও সাবলীলভাবে সহিষ্ণু হতে না পারি, ঠিক যেভাবে একজন প্রকৃত মানুষ আর একজন মানুষের দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সব প্রতিবাদই বৃথা৷ প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব পরিসীমায় ছোট ছোট অসহিষ্ণুতার ঘটনা, হিংসা, বিদ্বেষের চোরাটানগুলি যদি অতিক্রম না করা যায়, তাহলে সামগ্রিকতায় এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতিই এক ও অদ্বিতীয় হয়ে আমাদের ললাটলিখন লিখেই চলবে অনবরত৷ আর কে না জানে, সেই মুষলপর্বে আত্মধংসের নিয়তি ছাড়া আর কোনও বিকল্প থাকতে পারে না!

তাই আত্মস্তরের একক ক্ষেত্র থেকে সমষ্টিস্তরে এক সার্বিক মঞ্চের প্রয়োজন৷ লেখক-শিল্পীরাই তা তৈরি করে দিতে পারেন৷ তাঁদের শিল্পই জনগণের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে৷ পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া প্রতিবাদের পথ হতেই পারে, তবে এই গলিপথ ধরে হেঁটে অস্তিত্ব ঘোষণার কাঙ্ক্ষিত রাজপথে আদৌ পৌঁছানো যাবে কি না, সে ধন্দ থেকেই যাচ্ছে৷ শিল্পী-সাহিত্যিকরা কি পারেন না, যুক্তির কালি ও প্যাস্টেলে তাঁদের আবেগের তুলিকলমগুলিকে রাঙিয়ে নিতে?