প্রসেনজিৎ চৌধুরী: এক আরব রাজকন্যার উদ্দাম জীবনের ফল কী হতে পারে ? হয় মৃত্যু না হয় বাকি জীবন সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত হয়ে হারেমের গভীরতম কোণে কাটিয়ে দেওয়া৷ আর যদি সেটা না হয়, তাহলে তিনিই খুলতে চলেছেন বহু কোটি সম্পত্তির মালিক দুবাইয়ের শেখ পরিবারের ব্যাভিচার ও বিকৃত যৌনাচারের কাহিনি৷

এসবের পিছনে রয়েছেন পলাতক দুবাই কুলবধূর এক অদৃশ্য বন্ধুর অবস্থান ও তীব্র আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন৷ তেল সমৃদ্ধ আরব দেশগুলির সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সুসম্পর্কের উপর নির্ভর রাজকুমারী হায়ার পরবর্তী জীবন উপন্যাস৷

উপন্যাস বা আরব্য রজনীর অধ্যায় যাই বলা যায় সেটাই গ্রহণীয়৷ বিয়ের আগে প্রবল উদ্দাম জীবন৷ মুসলিম শাসনের বেড়া ভেঙে অতি উচ্চবিত্ত পরিবারের কন্যা হওয়ার সুবাদে অতুল্য ঐশ্বর্যের অধিকারিনী৷ জর্ডনের রাজকুমারী হায়ার শক্ত হাতে তীরের মতো ছুটত ছিপ নৌকা৷ রোয়িং করতে পারদর্শী-বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন৷ এমনকি জর্ডনের অলিম্পিক কমিটিতে ছড়িও ঘুরিয়েছেন৷ সবই ছিল বাপের বাড়ির সুবাদে পাওয়া ক্ষমতা৷ বিয়ের পর সব বদলে গিয়েছিল৷ কারণ তিনি তখন দুবাইয়ের শাসকের একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সবথেকে ছোট৷

সেই দুরন্ত হায়া এখন পলাতক৷ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে জার্মানি হয়ে ব্রিটেন৷ জানা যাচ্ছে, প্রাণের ভয়ে আত্মগোপনেই রয়েছেন এই আরব ললনা৷ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট, পারিবারিক অশান্তির জেরে পলাতক হায়া এখন লন্ডনের কেনসিংটন প্যালেস গার্ডেনের একটি বাড়িতে লুকিয়ে। সেই বাড়ির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার। এখান থেকেই বিবাহ বিচ্ছেদ মামলা লড়ার জন্য আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন তিনি৷ কড়া নিরাপত্তায় সেই বাড়ি ঘেরা৷

আরও পড়ুন: সেবার সোনার তলোয়ারে কাটা হয়েছিল রাজপুত্রের মাথা

বিবিসি জানাচ্ছে, দুবাইয়ের শেখের বয়স ৬৯ বছর৷ আর তাঁর স্ত্রী হায়ার বয়স ৪৫ বছর৷ ২০০৪ সালে দুজনের বিয়ে হয়েছিল৷ হায়া ছিলেন ষষ্ঠ স্ত্রী৷ আমিরশাহির সংবাদপত্র খালেজ টাইমস জানাচ্ছে, হায়ার আগের পাঁচ পক্ষের সবমিলে মোট ২৩ জন সন্তান রয়েছে৷ যে রূপের ঝলকে বহু কোটিপতির হৃদয় তছনছ হয়েছে তারাই এখন সব কিছু মুছে ফেলতে মরিয়া৷ তার জন্য পলাতক হায়া-কে ফেরত পেতে হবে৷ আর আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁক ফোঁকর ঘেঁটে দুবাইয়ের শেখ কুলবধূ চাইছেন ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়৷ পালিয়ে যাওয়া ছোটি বেগমকে ফেরত আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন দুবাইয়ের শাসক শেখ মহম্মদ আল মাখতুম৷

হায়া জানেন, তাঁকে নিয়েই আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে৷ একবারে যদি তাঁকে দুবাইতে ফেরত পাঠানো হয়েছে তাহলেই জীবনের ইতি৷ আরব দুনিয়ার শেখ পরিবারের অন্দরমহলে কী কী ঘটে তা তাঁর থেকে ভালো খুব কম জনেই জানেন৷ প্রভূত ঐশ্বর্যের অধিকারী শেখ স্বামীদের বিকৃত যৌনাচারের খেলা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে বহু মিথ ও ঘটনা ছড়িয়ে৷ তারই শিকার দুবাইয়ের কুলবধূ প্রিন্সেস হায়া বিনতে আল হুসেইন৷

কূটনৈতিক মহলের ধারণা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক খুবই ভালো৷ এখন আবুধাবির তরফে যদি লন্ডনের কাছে দুবাই শাসকের স্ত্রী হায়াকে ফেরত চাওয়া হয় তাহলেই বিপদ বাড়বে আরব সুন্দরীর৷ ঝামেলা ঘাড় থেকে নামতে হায়াকে ফেরত পাঠাতে পারে ব্রিটিশ সরকার৷

তবে সবই নির্ভর করছে কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরেই৷ সেক্ষেত্রে হায়াকে ফের লন্ডন ছেড়ে অপর কোনও দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হতে পারে৷ একবার ফিরে গেলেই আর সূর্যালোক দেখা হয়ত হবে না জীবনভর৷ তাই প্রাণভয়ে কাঁপছেন তিনি৷

বাপের বাড়ি জর্ডনের রাজপরিবার৷ সেখানেও ফিরে যেতে পারেন হায়া৷ কূটনীতিকরা সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছেন৷ উঠে আসছে জর্ডনের অর্থনীতির দিকটিও৷ কারণ, আমিরশাহিতে কর্মরত বহু জর্ডনিয়ান৷ তাঁরা প্রচুর বিদেশি মুদ্রা পাঠান দেশে৷ আর সৎ বোনের জন্য কতটাই বা দরাজ দিল হতে পারেন বর্তমান জর্ডন বাদশা আবদুল্লা৷ তিনিও এক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে রাখতেই পারেন৷

জর্ডনের রাজা হুসেইন বিন তালালের পরিবারের কন্যা হায়া৷ আরও আরব শেখ পরিবারের মতো জর্ডনের রাজবাড়িও বিভিন্ন কারণে কুখ্যাত৷ সেই পরিবারের সৎকন্যা হয়েও রাজকুমারী হায়া নিজের কীর্তিতে পরিচিত৷ পড়েছেন ব্রিটেনে৷ সেই থেকে মুক্তচিন্তা তাঁর মনে প্রবেশ করেছে৷ একাধারে ক্রীড়াবিদ ও আরব সুন্দরী৷ সবমিলে চর্চিত৷ হিসেব মতো বিয়েটা হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অন্যতম জনপদ দুবাইয়ের শেখ মহম্মদ আল মাখতুমের সঙ্গে৷ স্বামীর আরও অনেকগুলি বেগম ছিলেন৷ সেই হারেমে কনিষ্ঠতমা হয়েই ছিলেন জর্ডনের রাজকুমারি হায়া৷

বিবাহিত জীবন ধীরে ধীরে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল৷ যে শক্ত হাতে রোয়িং করতেন৷ সেই হাতেই গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে মরিয়া হয়েছেন হায়া৷ আর তারই ফল অলক্ষ্যে কোনও এক ‘গোপন বন্ধু’ পরামর্শ বা সাহায্যেই তিনি দুবাই ছেড়ে প্রথমে জার্মানি চলে যান৷ বাড়ির ছোট বৌ ও তাঁর কন্যা পালিয়েছে শুনে মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে দুবাই শাসকের৷ পরে দেখা যায় কোটি কোটি মার্কিন ডলার নিয়ে গিয়েছেন হায়া৷ আমিরশাহি সরকারের কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এইভাবে পালানোর পিছনে নিশ্চই কোনও প্রভাবশালীর হাত রয়েছে৷ কে সেই ব্যক্তি ? তাকে পেলেই সব রহস্যের সমাধান হবে৷ আরব দুনিয়ার কড়া ইসলামি আইনের বলে হয়ত রাজকুমারি তথা দুবাই শাসকের ছোট বেগমের সেই বন্ধুর মাথা কাটা হবে৷ কিন্তু তিনিও অদৃশ্য৷

আরব্য রজনীর আলেয়ায় আশা আশঙ্কার দোলাচলে প্রিন্সেস হায়া৷