ছবি- শশী ঘোষ

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, দেশের তরুণ সম্প্রদায়ের শিক্ষার কথা না ভেবে যে শিক্ষিতরা শুধু নিজের উন্নতির কথা ভাবে, তাদের আমি দেশদ্রোহী মনে করি৷ স্বামীজির সেই কথাই মাথায় রেখে সুন্দরবনের মতো জায়গায় স্রেফ নিজের রোজগারের জোরে শিক্ষার প্রসারে নেমেছেন এক ট্যাক্সিচালক। তাঁর আপ্তবাক্য, ‘শিক্ষা চাই, শিক্ষা চাই, গরিব অনাথদের শিক্ষা চাই, সর্ব জাতির শিক্ষা চাই’।

মহানগরীতে ট্যাক্সি চালিয়ে খান গাজি জালালুদ্দিন৷ শিক্ষা আন্দোলনে নামা এই মানুষের মতো মানুষটি সুন্দরবনের ঠাকুরচকের বাসিন্দা। শিক্ষাকে সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবনের অঙ্গ করতে তাঁর ভরসা অনুদান এবং ট্যাক্সি চালিয়ে পাওয়া পয়সা। ওইটুকু পাওনায় তাঁর চাহিদা শুধুই শিক্ষা। তাঁর গড়া দুটি মুসলিম অনাথ স্কুলে তৈরি হচ্ছে চারশ জনের ভবিষ্যৎ। যদিও এই চারশ শিশুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম সব জাতির অনাথ শিশুই রয়েছে৷

নিজে অভাবের জন্য ক্লাস টু-র বেশি পড়াশোনা চালাতে পারেননি গাজি জালালুদ্দিন। সেই না-পাওয়াটাই তাঁর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ জাগায়। শিক্ষার আলোয় সমাজকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখার শুরু মাত্র সাত বছর বয়সে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথ কখনই সোজা হয়নি। পেটে খাবার থেকে মাথার উপর ছাদ কিছুই ছিল না। অগত্যা ভিক্ষা ও ফুটপাথই ভরসা ছিল অহোরাত্র। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের জেদ হারিয়ে যায়নি। ১৯৮০ সাল থেকে ট্যাক্সি চালাতে শুরু করেন জালালুদ্দিন। শুরু হয় স্বপ্নপূরণের নবযাত্রা। ট্যাক্সির আরোহীদের কাছেই আবেদন করতেন অনাথ শিশুদের পড়াশোনার বই কিনে দেওয়ার জন্য। কেউ কেউ তাঁর এই আবেদনে সাড়া দিতেন, কেউ আবার দিতেন না। সাহায্যের টাকা থেকে বইয়ের পাশাপাশি গরিব অনাথ শিশুদের ওষুধপত্র, জামাকাপড়ও কিনে দিতে থাকেন জালালুদ্দিন।

এইভাবে লড়াইটা চলে ১৯৯৭ সাল অবধি। তিনি বুঝতে পারেন, বড় কিছু করতে গেলে এখানেই থেমে গেলে হবে না। মাথায় ঘুরতে থাকে স্কুল তৈরির ভাবনা। জালালুদ্দিনের ভিটেমাটি সুন্দরবনে। সেখানেই নিজের স্বপ্নের ভিত গড়বেন বলে ঠিক করেন। কিন্তু ভাবনা এবং তার বাস্তবায়নের মাঝে অনেক ফারাক। স্কুল গড়বেন বলে ১০ কাঠা জমি চেয়েছিলেন এলাকার মানুষের থেকে। কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। অগত্যা ট্যাক্সি চালিয়েই তৈরি ২ কামরার বাড়ির একটি ঘরে স্কুল গড়বেন বলে স্থির করেন তিনি।

১৯৯৮ সালে এলাকারই ২২ জন গরিব ও অনাথ ছাত্রছাত্রী এবং দুই শিক্ষিকাকে নিয়ে শুরু হয় গাজির স্কুল। এখন ওই স্কুলেই রয়েছে ১২টি ঘর, যেখানে রোজ চলছে ২০০ দুঃস্থ শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ। স্কুলে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থাও করেছেন গাজি। স্কুল ফি-র ব্যাপার নেই, তবে স্কুলে ভরতির জন্য বর্তমানে সামান্য কিছু অর্থ নেওয়া হয়। আসলে গুরুদক্ষিণা ছাড়া শিক্ষা সাঙ্গ হয় না। সেজন্যই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে।

তবে এখানেই থেমে থাকেনি তাঁর স্বপ্নের ঘোড়া। ২০০৯ সালে আরও দুটি স্কুল তৈরি করেন গাজি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ভরসা সেই ট্যাক্সি চালিয়ে আনা পয়সা। তবে ট্যাক্সির আরোহীদের মধ্যে ছিলেন বেশ কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষ। যাঁরা গাজি জালালুদ্দিনের এই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণ করতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ক্রমে দুই বিঘা সাত কাঠা জমিতে তৈরি হল সুন্দরবন অরফ্যানেজ মিশন ও সুন্দরবন শিক্ষায়াতন মিশন। শিক্ষায়তন মিশনে বর্তমানের পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ২০০। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন চলছে। গাজি সাহেবের দুটি স্কুল ও এক অরফ্যানেজ মিলিয়ে কাজ করছেন ২১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও চারজন অশিক্ষক কর্মী।

টানা প্রায় চার দশক ধরে বাংলা শিক্ষার মান হু হু করে পড়তে থাকায় বেশ উদ্বিগ্ন গাজি জালালুদ্দিন। তিনি জানান, ‘‘বহু দিন ধরেই দেখছি স্কুলে স্কুলে যাঁরা পড়ান, তাঁদের মধ্যে পড়ানোর তাগিদ, শেখানোর তাগিদ খুব কম’’। তাঁর মতে, শিক্ষকদের মধ্যেও রাজনীতির রং বহু কাল যাবৎই লেগে গিয়েছে। এই শিক্ষা তাঁর একদমই পছন্দ নয় বলে জানালেন তিনি। এই রাজনীতির কারণেই বাংলার শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে বলে মনে করেন গাজি জালালুদ্দিন।

কলকাতাতেও এ রকম একটি স্কুল গড়ার স্বপ্ন আছে তাঁর। তবে ‘‘সাধ আছে, সাধ্য নেই’’। কেউ যদি সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো এই ইচ্ছাও পূরণ হতে পারে। শিক্ষার আলো ছড়ানোর এই কাজের মাঝে কবে যে কেটে গিয়েছে ৭০টি বসন্ত খেয়াল নেই গাজি জালালুদ্দিনের। সমাজের একেবারে পিছনে পড়ে থাকা মানুষের ছেলেমেয়েদের বর্ণপরিচয় ঘটানোর স্বপ্ন এখনও দেখেন এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। তাঁর জীবনের আর এক মন্ত্র: ‘সর্ব বিষয় জানতে হলে শিক্ষা ছাড়া গতি নাই’।