সত্তরের দশকের শেষ দিকে গুলজারের চিত্রনাট্য অবলম্বনে ‘ঘরোন্দা’ ছবিটির কথা মনে আছে তো? ওই ছবিটিতে সুদীপ (অমল পালেকার) এবং ছায়া (জারিনা ওয়াহাব) তখন বম্বেতে ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে কেমনভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন৷ আর, ওই প্রতারণার ফলে তাদের বাসা গড়ার স্বপ্নই শুধু ভেঙে পড়েনি, দু’জনের জীবনে এক বিপর্যয় নেমে এসেছিল৷

তারপর তিন-চারটে দশকর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও বাড়ি কিনতে গিয়ে নানা রকম ঝামেলায় পড়তে হয় অনেককে৷ ঠকতে হয়েছে বলে প্রায়শই অভিযোগ শোনা যায়৷ টাকা নিয়ে ঘোরাচ্ছে অথচ ফ্ল্যাট দিচ্ছে না অথবা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়ি তৈরি করেনি প্রোমোটার, এমন অনেক ক্রেতারই অভিযোগ রয়েছে৷

সেক্ষেত্রে ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার আগে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার৷ কেনার আগে বেশ কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে৷

ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনতে গেলে অনেকেই ব্রোকারের উপর নির্ভর করে, তাঁরা কতটা নির্ভরযোগ্য?

ওই ব্রোকারের বাজারে কতটা সুনাম আছে অবশ্যই দেখে নেওয়া দরকার৷ তাছাড়া ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাড়িটি সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনে নেওয়া দরকার৷ বাড়ি ঘরদোর দেখানোর জন্য ‘চেন অফ ব্রোকার’ থাকে ৷ সাধারণত দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্রেতারা যার সঙ্গে কথা বলেন, তিনি আসলে ওই ‘চেনে’র মাঝখানে অবস্থান করছেন৷ ফলে, বিস্তারিত তথ্য দিতেও পারেন না এমন ব্রোকাররা৷ সেক্ষেত্রে মূল ব্রোকারের সঙ্গে কথা বলাই শ্রেয়৷

প্রোমোটার কেমন হওয়া দরকার?

একই ভাবে বলব সুনাম আছে এমন প্রোমোটারে সঙ্গেই যোগাযোগ করতে৷ বড় প্রোমোটারদের তুলনায় ছোটখাট প্রোমোটারদের মাঝপথে প্রকল্প আটকে যেতে অথবা প্রকল্প শেষ করতে দেরি হতে দেখা যায়৷ তাছাড়া প্রোমোটারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে, রাজ্যের ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে অভিযোগ করা যায়৷

অনলাইনে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা আছে কী?

দেখুন, মোবাইল বা ক্যামেরা মতো জিনিস অনলাইনে কেনা যেতে পারে৷ কিন্তু, বাড়ি বা ফ্ল্যাট অন্য রকমের জিনিস৷ সেটা অনলাইনে একই ভাবে কেনা সম্ভব নয়৷ মনে রাখবেন, মাপ এক হলেও যে কোনও ফ্ল্যাটই অন্য একটি থেকে আলাদা৷ তাই একেবার ‘স্পটে’ গিয়ে যেটা কিনছেন সেটির ‘লোকেশেন’, ‘পজিশন’ ইত্যাদি সব বুঝে নেওয়া দরকার৷ দেখতে হবে দক্ষিণ খোলা না পূর্ব খোলা, হাওয়া খেলবে কতটা ঘরে, আলো কতটা ঢুকবে ঘরে৷ সেটা অনলাইনে বোঝা সম্ভব নয়৷ একটা কথা মনে রাখবেন, এত টাকা দিয়ে জিনিস কিনছেন তাই আপনাকেও কিছুটা বুঝে নিয়ে সতর্ক হয়েই এগোতে হবে৷

কেনার আগে সচেতন হতে হবে কী কী বিষয়ে?

অনেকগুলি দিক রয়েছে৷ যেমন ধরুন যার কাছ থেকে কিনছেন সেই নির্মাণ সংস্থার আর্থিক অবস্থা কেমন, নির্মিত বাড়ির গুণগত মান কেমন, সময়মতো নির্মাণের কাজ শেষ হচ্ছে কি না? এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে, ওই বিল্ডারের করা আগের প্রকল্পে গিয়ে সেখানকার বাসিন্দারদের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷

নতুন প্রকল্প  সম্পর্কে কী জানতে হবে?

নতুন অ্যাপাটমেন্ট কিনতে গেলে সেটির ফ্লোর প্ল্যানের প্রতিলিপি দেখে নিন৷ লিফট, সিঁড়ির মতো ‘কমন এরিয়া’ হিসেবে কতটা জায়গা ধরা হচ্ছে সেটা বুঝে নিতে হবে৷ কারণ এই হিসেবে কোনও গড়মিল দেখিয়ে চার্জ করা হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে৷ ফ্লোর প্ল্যানে শোবার ঘর, বসার ঘর, রান্না ঘর, স্নানের ঘর কেমনভাবে সাজানো হয়েছে সেটা আগে দেখে নেওয়া দরকার৷ কারণ, অদক্ষভাবে এটা সাজানো হলে জায়গার অপচয় হয়৷ তাছাড়া প্রস্তাবিত নির্মাণের পরিকল্পনার প্রতিলিপি দেখে নেওয়া উচিত৷ কারণ দেখতে হবে এমন কোন ‘ফেসিলিটি’ জোর করে দেওয়া হচ্ছে কি না, যা ক্রেতার প্রয়োজন নেই৷

কেনার চুক্তির বিষয়ে কতটা সতর্ক হতে হবে?

ফ্ল্যাট কিনতে কখন, কত টাকা কি জন্য দিতে হবে সেটা বুঝে নেওয়া দরকার৷ প্রস্তাবিত চু্ক্তিতে সেই সব শর্তই উল্লেখ করা থাকে৷ তাই চুক্তির প্রতিলিপি নিয়ে কোনও আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত৷ চুক্তি করার আগে বুঝে নেওয়া দরকার, সেখানে ক্রেতার স্বার্থ সুরক্ষিত থাকছে কি না৷ মনে রাখবেন, যার কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনা হচ্ছে তার তা বেচার অথবা সেখানে বাড়ি করার অধিকার আছে কি না সেটাও তো খতিয়ে দেখে নিতে হবে, নইলে পরে পস্তাতে হবে৷ দেখতে হবে নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরসভার অনুমোদন রয়েছে কি না৷ পারলে ওই জমি বা বাড়ির মালিকানার ইতিহাসটা জেনে নিতে হবে৷ অন্তত পুরসভার খাতায় ওই বিল্ডারের নামে তা হস্তান্তর হয়েছে কি না তা দেখে নেওয়া জরুরি৷ দেখতে হবে পুরসভার কাছে ওই বাড়ি বা ফ্ল্যাটের কোনও কর বকেয়া আছে কিনা, থাকলে কেনার আগে সেটা মেটানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷

দাম দরাদরি করার ক্ষেত্রে কোনও উপায় আছে নাকি?

নিশ্চয়ই আছে৷ সব রকম তথ্য নেওয়ার পর ক্রেতা তুলনা করে নিতে পারবেন অন্যান্য বিল্ডাররা তাদের প্রকল্পে জন্য কেমন শর্ত রেখেছেন৷ বাড়ির বাজার সম্পর্কে তথ্য হাতে এলে তখনই একটা দরাদরির অবস্থায় আসা যাবে৷ তবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ‘টাইটেল ডিড’য়ের প্রতিলিপি নিয়ে আইনজীবীকে দিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে৷ তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন, সেখানে আদৌ তেমন কিছু লেখা আছে কি না, যা ক্রেতা স্বার্থের পরিপন্থী৷ তেমন কিছু থাকলে তা পরিবর্তন করে তবেই কেনার জন্য চুক্তি করা যাবে৷

কেনার পরেও তো সমস্যা হয়৷

হ্যাঁ, কেনার পর প্রকল্পের কাজ ঠিকমতে এগোচ্ছে কি না, সে দিকে নজরদারি করা উচিত৷ এজন্য মাঝে মাঝে নির্মাণ স্থানে যাওয়ার দরকার৷ প্রথমেই নির্মাণ কাজে কোনও রকম বিচ্যুতি নজরে এলে তা অভিযোগ জানালে সাধারণত বিল্ডাররা ঠিক করে দেন৷ কিন্তু নির্মাণ অনেকটা এগিয়ে গেলে তখন তা ভেঙে পরিবর্তন করতে চান না বিল্ডাররা৷ এই সমস্যা এড়াতে হলে ওই সময় বিল্ডারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে৷

কেনার পর নিজের নামে নথিভুক্ত করা উচিত?

কেনার পর পুরসভায় মিউটেশন এবং ক্রেতার নামে প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন করে নেওয়া দরকার৷ তবেই বলা চলে বাড়ি কেনার কাজ সম্পূর্ণ হল৷