অনুপম হাজরা: সালটা ২০০৫। ওনাকে প্রথম সামনে থেকে দেখি। উনি তখন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আর আমি বিশ্বভারতীর সোশ্যাল ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র।

যেহেতু আমার বাবা তখন বীরভূম ডিস্ট্রিক্টের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ’এর (District IB) অফিসার, সেজন্য উনি দুর্গাপূজার সময় নিজের জন্মস্থান বীরভূমের মিরিটি গ্রাম বা ওনার দিদির বাড়ি বীরভূমের কীর্ণাহারে যখন আসতেন, ওনার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকতেন আমার বাবা। সেই সময় বাবার সঙ্গে কীর্ণাহারে গিয়েই ওনাকে প্রথম দেখি, ধুতি পরে খালি গায়ে দুর্গাপুজো করতে।

এখনও মনে পড়ে, বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন “দেবনাথ, তোমার ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে?” ব্যাস, প্রথম আলাপ এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশের অর্থমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে যতবারই উনি বীরভূমের গ্রামের বাড়িতে আসতেন, আমার বাবা থাকতেন ওনার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে, তাই বাবা কে উনি নাম ধরে “দেবনাথ” বলেই ডাকতেন।

যাই হোক, ওনার সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ প্রথম সাক্ষাতের ঠিক ১০ বছর পর অর্থাৎ সালটা ২০১৫। তখন উনি দেশের রাষ্ট্রপতি, আমি তখন বোলপুরের সাংসদ এবং আমার বাবা তখন রাজ্য পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত একজন আধিকারিক।

এবার বাবাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম রাষ্ট্রপতি ভবন, ওনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। বাবাকে দেখেই একগাল মিষ্টি হাসি নিয়ে বললেন, “দেবনাথ তোমার সেই ছোট্ট ছেলে তো এখন আমার এমপি (যেহেতু উনার জন্মস্থান, কীর্ণাহার এলাকাটি বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত)! বাচ্চা এমপি !”

কথাটা দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছে শোনার পর, কি যে অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল বলে বোঝাতে পারব না। ১০ মিনিটের ধার্য করা সেই সৌজন্য সাক্ষাৎ গড়াল ২৭ মিনিটে। এর মধ্যেই ছোট্ট করে উনি কিভাবে সাইকেল নিয়ে গ্রামের কাদা মাটির রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতেন হাফপ্যান্ট পরে, সেই কাহিনীর বর্ণনা করলেন। সঙ্গে চলল বাবার সঙ্গে পুরনো দিনের কিছু স্মৃতিচারণ। পুরো ব্যাপারটাই খুব উপভোগ করলাম।

এরপর ২০১৫-র অক্টোবর মাসে, রাষ্ট্রপতি’র ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন-কম্বোডিয়া সফরে ভারতের বিভিন্ন দল থেকে বাছাই করা পাঁচজন সাংসদের মধ্যে আমিও ডাক পেলাম।

ভারতবর্ষের সবথেকে বড় বিমানে যখন চাপলাম, উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুইতো খেতে ভালবাসিস, কি খাবি ?” আমি একটু নার্ভাস হয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, “আমার তো টিপিক্যাল বাঙালি খাবার পছন্দ, সেটা কি এখানে পাওয়া যাবে??”

মুচকি হেসে বলেছিলেন, “রাধাবল্লভী আর মিষ্টি ডাল আছে, চিন্তা করিস না।” আসলে তখন ঠিকমতো জানতামই না, যে রাষ্ট্রপতির সফরে রাষ্ট্রপতি যেহেতু বাঙালি, তাই ওনার কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে বাঙালি খাবারের আয়োজন ও রাখা হয়েছে এয়ার ইন্ডিয়ার সেই বিশেষ বিমানে।

এই সফরের আরেকটা মিষ্টি ঘটনা সারা জীবন আমার কাছে খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঘটনা টা কিছুটা এই রকম –

ইজরাইল যাবার উদ্দেশ্যে, ফ্লাইট যখন মধ্যগগনে, সুযোগ বুঝে একটু আড্ডা দিতে গেছিলাম ওনার সঙ্গে। আলাপচারিতার মাঝেই, উনি আমাকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন “সেলফি কিভাবে তুলতে হয় জানিস?” আমি গদগদ হয়ে বললাম এক্ষুনি শিখিয়ে দিচ্ছি। আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করা সেই বিশেষ সেলফি তোলার মুহূর্ত আমি আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আর মাঝেমধ্যেই বন্ধু-বান্ধবদের গর্ব করে বলে থাকি, দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে আমি সেলফি তোলা শিখিয়েছিলাম।

বোলপুরের সাংসদ থাকাকালীন, আমার সঙ্গে যে আট-দশ বার দেখা হয়েছে, তাতে উপলব্ধি করেছিলাম, রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের উপর উনি কথা বলতে বা গল্প করতে বেশ ভালোবাসতেন। স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। ওনার সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, বরাবরই মিষ্টি করে বলতেন “এইতো বাচ্চা এমপি এসেছে” বা কখনো

সম্বোধন করতেন “দেবনাথের ছেলে” বলে – দেশের রাষ্ট্রপতি’র কাছে এরকম বিশেষ আদুরে সম্বোধনটা বেশ উপভোগ করতাম। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, দেশের রাজনীতি নিয়ে যে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী উনি ছিলেন (যদিও সেই জ্ঞানের গভীরতা পরিমাপ করার দুঃসাহস আমার ছিলনা), তাতে তাঁকে প্রকৃত অর্থেই “ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য” বলা চলে।

উনি আজ আমাদের সকলকে ছেড়ে গেলেন। সৃষ্টি হল ভারতীয় রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা, সেই শূন্যস্থান হয়তো কেউ কোন দিন পূরণ করতে পারবে না। আজ আমাদের দেশ তাঁর রাজনৈতিক অভিভাবক কে হারালো; বলাবাহুল্য, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীও ওনাকে ঠিক বাবার মতোই শ্রদ্ধা এবং সম্মান করতেন।

(লেখক: অধ্যাপক ডঃ অনুপম হাজরা, বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন সাংসদ এবং বর্তমানে বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সহ-সভাপতি)

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।