সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : যে বেঙ্গল কেমিক্যাল আজ আলোচনার কেন্দ্রে, যে বাঙালির প্রতিষ্ঠান নিয়ে তোলপাড় ভারত। খোঁজ খোঁজ রব, যার প্রতিষ্ঠানে তৈরি হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি হুমকি দিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদীকে এমন খবরও উঠে আসছে। সেই মানুষটি অর্থাৎ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের উপরেও পড়েছিল ধর্মের গোঁসা।

কারণ তিনি যে মেডিসিন ড্রাগ তৈরির চেষ্টা করছিলেন তা তৈরি করতে তিনি গরুর হাড় ব্যাবহার করেছিলেন। শিল্প ও চিকিৎসাকে এক জায়গায় দেখতে চেয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। সেই জন্য তিনি প্রথমে সাইট্রিক অ্যাসিড বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে, সাজিমাটি থেকে সোডিয়াম কার্বোনেট। কিন্তু সব জায়গাতেই অন্য দেশের বিপুল ব্যাবসা ছিল ভারতে। প্রথমেই বুঝে গিয়েছিলেন এমন করলে হবে না।

একদম নিজস্ব কিছু করতে চেয়েছিলেন, সেই ভাবনা থেকেই ফসফেট অব সোডা এবং সুপার ফসফেট অব লাইম বানানোর চেষ্টা করলেন। আর সেখানেই তিনি পড়লেন ধর্মের রোষের মুখে। ফসফেট অব সোডা আর সুপার ফসফেট অব লাইম বানানোর প্রধান উপকরন গবাদি পশুর হাড়। তখনকার মত কাজের জন্য প্রফুল্লচন্দ্রর ১০-১৫ মন হাড়ের প্রয়োজন ছিল। তাঁর বাড়ির পাশেই রাজাবাজার এলাকায় কসাইয়ের দোকান থেকে কয়েক বস্তা গরুর হাড় সংগ্রহ করেছিলেল। তিনি এই হাড় তাঁর বাড়ির ছাদে শুকোতে দিতেন।

সময়টা শীতকাল। এমনিতে এই সময় বাংলায় বৃষ্টি খুব একটা হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই বছর জানুয়ারি মাসে টানা পনেরো দিন বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে হাড়ের সংলগ্ন মাংস পচে দুর্গন্ধ বেরোতে লাগল। পচা মাংসে সুতোর মত পোকাও দেখা দিল। তার ওপর শুরু হল ঝাঁকে ঝাঁকে কাকের উপ্রদ্রব। তারা মহানন্দে পচা হাড় আর পোকা খেতে শুরু করল। হাড় নিয়ে টানাটানিতে কাকের দল সেগুলো আশপাশের বাড়িগুলোর ছাদেও ছড়াতে লাগল। পাশেই ছিল হিন্দুপল্লী।

তারা প্রফুল্লচন্দ্রকে স্পষ্ট নোটিশ জারি করল, গরুর হাড় ছাদ থেকে স্বেচ্ছায় সরানো না হলে তারা সরকারী সাহায্য নিতে বাধ্য হবে। শেষকালে এক নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবসায়ী প্রফুল্লচন্দ্রকে সাহায্য করলেন। এই ব্যবসায়ীর মানিকতলার এক জমিতে হাড়গুলি একত্রিত করে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। মধ্যরাতে হাড়ের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। এতে স্থানীয় পুলিশ অফিসারের হল চক্ষুশূল।

তিনি মাঝরাতে আগুন জ্বলতে দেখে কোন কুকর্মের গন্ধ পেয়েছিলেন। অনেক কষ্টে তাকে বোঝান গেল ব্যাপারটা কি। সবশেষে হাড় ভস্মতে সালফিউরিক অ্যাসিড যোগ করে সুপার ফসফেট অব লাইম বানান গেল। সেখান থেকে সোডার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয় ফসফেট অব সোডা।

তবেই এই ঘটনায় প্রফুল্লচন্দ্র কিছুটা উৎসাহ পেয়েছিলেন। তিনি আরও পুরোদমে কাজ করেছিলেন। তিনি দেখলেন যে তাঁর তৈরি সিরাপ অব আওডাইড অব আয়রন কিছুদিন পরেই একটু হলুদ হয়ে যায়। অথচ বিদেশ থেকে আনা সেই একই জিনিস অনেকদিন হালকা সবুজ থাকে।

এই সমস্যার সমাধান তিনি পেলেন ওই সিরাপের সাথে সামান্য হাইপো ফসফরাস যোগ করে। এভাবে তিনি বিভিন্ন ‘trade secret’ নিজেই উদ্ভাবন করতে লাগলেন। অবশেষে তার তৈরি রাসায়নিক ও ওষুধ বাজারে ছাড়ার সময় হয়। প্রতিষ্ঠা হয় ‘Bengal Chemical and Pharmaceutical Works’।

তথ্যসূত্র: আত্মচরিত, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।