তন্নিষ্ঠা ভাণ্ডারী: পুজোয় আটপৌরে শাড়ি, পয়লা বৈশাখে রেস্তোরাঁর বাঙালি ‘কম্বো’। এটাই এখন বাঙালিয়ানা। বাঙালি এখন Bong, তাই শুদ্ধ বাংলা বানান তো দূরে থাক, স্পষ্ট উচ্চারণের বাংলা যেন এক বিলুপ্ত প্রায় ইতিহাস হতে চলেছে। ৯০-এর দশকে ছোটদের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’ বাংলা বাংলার খেলার একটা চল ছিল। গ্লাস নয়- গেলাস, চেয়ার নয়- কেদারা… এখন তো খেলার ছলে বাংলা বলার দিনও শেষ। ‘ডট কম’ আর ‘ট্রান্সলেটর’-এর যুগে বাংলা ভাষার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। আর সেরকম একটা সময়ে প্রিয় শহরের বুকে খোলা হাওয়ার মত ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা পোস্টার।

কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় যাদের নিত্য যাতায়াত, তাঁদের চোখ আটকাবেই সেই পোস্টারে। লেখা আছে ‘সওরভ-এর থেকে সৌরভ ভালো। বলতেও। শুনতেও।’ কলকাতার তরুণ প্রজন্ম, যারা ‘সওরভ’ বলতেই অভ্যস্ত, তাঁরা একবার হলেও ঢোঁক গিলছেন পোস্টারটা দেখে। আবার যারা শুদ্ধ বাংলায় বিশ্বাসী, তাঁরা ঝট করে ছবি তুলে পোস্টাচ্ছেন ফেসবুকে। হু হু করে বাড়ছে শেয়ার। সত্যিই তো! যে ‘দাদা’-কে নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই, তার নামটাই নাকি এমন অ-বাংলা উচ্চারণে ডাকা হয়?

গত কয়েক মাসে তো শুধুই ছিল পুজোর থিমের ছড়াছড়ি। এমন কৌতূহল তৈরি করা কোনও পোস্টার দেখেই ধরে নেওয়া যাচ্ছিল, সেটা কোনও পুজোর গল্প বলছে। কিন্তু বাংলা নিয়ে বং প্রজাতিকে এমন খোঁচা দিচ্ছেন কারা? ‘বাংলাটা আমার ভালো আসে না…’, ‘আমার ছেলে একদম বাংলা বই পড়ে না…’ এসব যারা গর্ব করে বলেন, সেই বাঙালিকে এই পোস্টার বোধহয় একবার হলেও নাড়া দিচ্ছে।

আর একটি পোস্টারে লেখা আছে, ‘সামোসার থেকে সিঙাড়া ভালো। বলতেও। শুনতেও।’ অর্থাৎ, সামোসা কথাটায় যে সেই পরিচিত আলুর পুরের গন্ধটা নাকে আসে না, সেটাই আর একবার মনে করিয়ে দেওয়া। মনে হয়ত অনেকেই করেন। আপনার নামটা স্পষ্ট বাংলায় না ডাকলে মনে মনে হয়ত গালাগালিও দিয়ে দেন সামনের লোকটাকে। রাগ হয় বড্ড। তবে এই মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটা ক’জন করেন?

দুর্গা পুজোর বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে গিয়েছিল শহরের। আর সেই মরশুম শেষে এই পোস্টারগুলো ভালোবেসে ফেলেছেন অনেকেই। যে রসগোল্লার জিআই ট্যাগ নিয়ে এত লড়াই। কলকাতার সেই সিগনেচার মিষ্টিকেও নাকি আজকাল ‘রসগুল্লা’ বলে ডাকা হয়। কই ওরা তো ভুল করেও ‘পরোটা’ বলেন না! বলেন ‘পরাঠা’ই। তাই তো পোস্টারের একেবারের কোণার দিকে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা আছে ‘নিজের ভাষা, নিজের থাক।’ আর এই জমানার বহুল প্রচলিত দুটি শব্দও জায়গা পেয়েছে সেই পোস্টারে- ‘স্বচ্ছ ভারত’। যদি অন্তত বাঙালিরা বলতেন ‘পরিচ্ছন্ন ভারত’?

 

যাই বলুন। পোস্টারগুলো ভাবাচ্ছে। রাতে শুয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে ভাইরাল হওয়া সেই পোস্টারে চোখ আটকালে একবারও কি শুদ্ধ বাংলা বলতে ইচ্ছে করছে না? #ভালোভাষা বলে একটা হ্যাশট্যাগও তৈরি হয়েছে। না ‘হ্যাশট্যাগে’র বাংলাটা অবশ্য জানা নেই। কিন্তু সবশেষে একটাই প্রশ্ন, এভাবে নতুন করে বাংলার প্রেমে পড়াচ্ছেন কারা? ‘হাই-হ্যালো’ ভেসে আসা শহরের রাস্তায় এগুলো কীসের বার্তা? উত্তর থাকবে Kolkata24x7-এ। তার জন্য ছোট্ট অপেক্ষা। আপাতত ভাবুন।