কল্যাণ বসু: বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক হলেও ভবিতব্যই ছিল৷ আসন্ন মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী-অভিভাবকদের কয়েক জন আদালতের দ্বারস্থ হলেন পরীক্ষাসূচি পিছানোর দাবি নিয়ে৷গত বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের তুলনায় এ বছর পরীক্ষা দুটি যথাক্রমে ২৩ দিন ও ২৬ দিন এগিয়ে আনা হয়েছে৷ আর এই যে এগিয়ে আনা সেটা শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই জানিয়ে না দিয়ে মাঝপথে দুম করে ঘোষণা করায় পরীক্ষার্থীরা অপ্রস্তুত৷ মাধ্যমিকের প্রায় ১১ লক্ষ ও উচ্চ মাধ্যমিকে প্রায় ৭ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মূল্যবান প্রায় এক মাস পড়ার সময় যদি কেটে নেওয়া হয়, তাহলে তো অসন্তোষ দেখা দেবেই৷ আশ্চর্যজনক বিষয় হল, এই বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের নিয়ে যে সুবিশাল সংখ্যক জনগণ, তাদের তরফে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি৷ শুধুমাত্র হা-হুতাশ, উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ নিয়েই দিনাতিপাত৷ অবশেষে এই নিস্তরঙ্গ ক্ষোভ ও অভিমানের মাঝে আদালত-আশ্রয়ী সামান্য মুভমেন্ট৷ দুটি পরীক্ষাই গত বছরের সূচিমাফিক এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে স্কুলশিক্ষা দফতর, বিভাগীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের কাছে৷ কিন্তু কোনও সুরাহা না মেলাতেই দ্রুত শুনানির আরজি জানিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হল৷ কর্তৃপক্ষের যে সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত, তার কারণগুলি একে একে বলা যাক৷
এক, প্রথমেই আসবে সিলেবাস কী করে শেষ হবে, সেই সমস্যা৷ পরীক্ষা এত দিন এগিয়ে আনলে পড়ুয়ারা নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে যথেষ্ট যে বেগ পাবে, এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই৷ কারণ যে সিলেবাস প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্ধারিত ছিল, সেই অনুযায়ী প্রতিটি অধ্যায় বা ইউনিটের জন্য বরাদ্দ ক্লাস সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া আছে৷ অর্থাৎ সময়সূচি মেনেই প্রতিটি বিষয়ের সিলেবাস নির্ধারণ করা হয়েছে৷ এখন সিলেবাস অপরিবর্তিত রেখে বরাদ্দ সময় যদি কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষ নিজেরাই নিজেদের অযৌক্তক প্রতিপন্ন করছেন না কি?
দুই, একটি সরকারের প্ল্যানিং কালচার না থাকার অপটুতার শিকার হচ্ছে অল্পবয়সী নিরপরাধ ছাত্রছাত্রীরা৷অথচ একটা সিলেবাস কত দিনে কীভাবে ভাগ করে শেষ করা হবে তার প্ল্যানিং যেমন প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর হিসাব করা থাকে, শিক্ষক মহাশয়দেরও তা-ই৷ হঠাৎ-ঘোষণার মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষককুলের সেই প্ল্যানিংয়ে বড়সড় ধাক্কা মারল কেন সরকার?
তিন, আগেই বলেছি পাঠসূচির পরিমাণ ও বরাদ্দ দিনসংখ্যা পরস্পর নির্ভরশীল৷ পূর্বনির্ধারিত ছুটির বাইরেও অনিবার্য কারণে বেশ কিছু ছুটিছাটা থেকেই যায়, যা স্কুলের ক্লাসের বরাদ্দ দিনসংখ্যা কমিয়ে দেয়৷ ফি বছর প্রায় চালু হয়েছে গরমের জন্য অতিরিক্ত বেশ কিছু দিন স্কুল বন্ধ থাকা৷ ফলে ক্লাসসংখ্যা আরও কমল৷এর পর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-র মতো পরীক্ষার্থীদের পড়ার দিনসংখ্যা আরও এক মাস প্রায় কেটে পরীক্ষা এগিয়ে আনার বন্দোবস্ত হল! সরকার বা তার শিক্ষা নিয়ামক সংস্থার ভারপ্রাপ্ত বিজ্ঞজনেরা কি বিষয়টা ভাবেননি? তাঁরা কি এতটাই অসংবেদনশীল?
চার, নতুন পাঠসূচি, নতুন প্রশ্নের ধরন বা পরীক্ষার প্যাটার্ন নিয়ে পরীক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই গিনিপিগ সাব্যস্ত হয়েছে, তার উপর আবার এই পরীক্ষা এগিয়ে এনে পাঠ্যদিনের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত৷ এদিকে বিধানসভার প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় উলটে জানিয়েছেন, আগামী বছরগুলিতে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দুটিকে ধাপে ধাপে আরও এগিয়ে আনা যেতেই পারে? কিন্তু পড়ুয়ারা যে কী আতান্তরে পড়ছে সরকার কি একটু সংবেদনশীল হয়ে সেটা ভেবে দেখবেন?
পাঁচ, স্কুল করে, প্রাইভেট টিউশনের চাপ সামলে পড়ুয়াদের বাড়িতে পড়াশোনা করার সময় সংকুচিত হয়ে এসেছে৷এই অবস্থায় ফাইনাল পরীক্ষার আগে স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষার (যা টেস্ট পরীক্ষা বা সিলেকশন টেস্ট নামে পরিচিত) পর যে আড়াই-তিন মাস থাকত, সেটাই তাদের কাছি নিজেদের প্রস্তুতির সেরা সময়৷ সেই সময় যদি কোপ পড়ে, মাসখানেক যদি কাটা যায়, তাহলে তো তাদের সমূহ বিপদ৷ তাই নয় কি?
ছয়, অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা মনে করছেন, এমনিতেই বিরাট সিলেবাস স্কুলে শেষ করা কষ্টসাধ্য, তার উপর পরীক্ষা এগিয়ে আনলে সেটা অসাধ্যের পর্যায়ে চলে যাবে৷ বাড়বে প্রাইভেট টিউশনের প্রতি আরও নির্ভরতা৷ দরিদ্র ঘরের পড়ুয়ারা যৎসামান্য যা স্কুলের পড়ানোর উপর নির্ভরশীল তাদের কী হবে? প্রাইভেট টিউশনের বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করার যে সরকারি সদিচ্ছার কথা শোনা যায়, সেটা কুম্ভীরাশ্রু প্রতিপন্ন হল না কি?
সাত, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পরবর্তী উচ্চতর পড়াশোনার জন্য রাজ্য বা সর্বভারতীয় স্তরে যে ভরতি পরীক্ষা চলে তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই এই পরীক্ষার দিনক্ষণ এত দিন ঠিক হয়ে এসেছে৷ বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় বোর্ডগুলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই এই পরীক্ষার সূচি ঠিক হয়েছে৷ এখন এক মাস যদি পরীক্ষা এগিয়ে আনা হয়, তাহলে সেই ভারসাম্য থাকবে কী করে?
এর বাইরেও কিছু কথা আছে, যা সমাজ থেকে উঠে আসছে৷ যেমন,
এক, স্কুলে যদি সিলেবাস শেষ না করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-নির্ভরতা কমবে৷ রাজ্য জুড়ে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে না-আসার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে৷ এর পর তো তাহল তাদের কাছে স্কুল আরও গুরুত্বহীন হয়ে উঠবে!
দুই, সময়ের অভাবে শিক্ষক যদি সিলেবাস শেষ করতে অক্ষম হয়, তাহলে তার সব দায় বর্তাবে শিক্ষকেরই উপর৷ফলে সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ম হওয়ার সমূহ আশঙ্কা৷
তিন, এত দিন পরীক্ষা এগিয়ে আনার এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পড়ুয়া ও শিক্ষকমণ্ডলীর সঙ্গে সবিস্তার আলোচনা করে নিলে কি ভালো হত না? শুধুমাত্র পরীক্ষাটা ঠিকঠাক নিয়ে নিতে পারলেই কি সরকার দায়মুক্ত? তাই কি এ রকম একটা একতরফা সিদ্ধান্ত?
চার, শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ছাত্রছাত্রীদের গরমের হাত থেকে রেহাই পাওয়াতেই না কি পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷কিন্ত সমাজ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে৷ কলকাতা পুরসভা সহ রাজ্যের একাধিক পুরসভার নির্বাচনের জন্য যেভাবে রাজ্যের জয়েন্ট এনট্রান্স পরীক্ষার দিনক্ষণ পালটানো হয়েছিল, ঠিক তেমনই ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই প্রায় ১৮ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার দিনক্ষণ এত দিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত৷
এক শিক্ষা অধিকর্তা বলেছিলেন, স্কুলগুলি যদি পরীক্ষা এগিয়ে আনার কারণে উদ্ভূত সমস্যাগুলি নিয়ে তাঁদের কাছে আসেন, তাহলে তাঁরা তা সমাধানের কথা ভাববেন৷ এই ভাবনাটিই জরুরি৷ ২৬ বছর ধরে একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করছি৷বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা হলেও অভিজ্ঞতা আছে৷ ফলে একজন শিক্ষক হিসাবে এবং ২০১৬-র উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী কন্যার পিতা হিসাবে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর হয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন রাখছি, বিজ্ঞানসম্মত কারণেই পরীক্ষার দিনক্ষণ এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন৷ একটু সংবেদনশীল হন৷ সেইসঙ্গে যাঁরা রবীন্দ্রনাথের উক্তি টেনে স্মরণ করাচ্ছেন: ‘কর্তৃপক্ষ আজকাল আমাদের শিক্ষার মধ্যে পোলিটিক্যাল মতলবকে সাঁধ করাইবার চেষ্টা করিতেছেন, তাহা বুঝা কঠিন নহে’, তাদেরও মিথ্যা প্রতিপন্ন করুন৷

লেখক রসায়নের শিক্ষক