পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য প্রশাসনের হাতে থাকা যাবতীয় নেতাজি ফাইল প্রকাশ করেছেন৷ সেইসঙ্গে তাঁর আরজি, কেন্দ্রও এবার তাদের সিন্দুক থেকে নেতাজি ফাইলগুলি বের করে জনসমক্ষে নিয়ে আসুক৷মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এতে কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যাও হবে না, দেশেও কোনও সংকট দেখা দেবে না৷তাহলে সেগুলি কেন ভারতের নাগরিকরা দেখার অধিকার পাবেন না?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

যদিও এখনও পর্যন্ত যতটুকু জানা গিয়েছে তাতে রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের হাতে থাকা নেতাজি ফাইলে তেমন বিস্ফোরক কিছু নেই, যা আগে জানা যায়নি৷ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর পরিবারবর্গের উপর যে নজরদারি চলত, এবং সেই নজরদারি যে স্বাধীনতার পরেও বজায় ছিল, এ কথা অনেক দিনই সাধারণ মানুষের জানা৷বাঙালি তথা দেশপ্রেমী মানুষের খারাপ লাগলেও বাস্তব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অক্ষশক্তির অপরাধ বিচার করার জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল তার রায়মোতাবেক সুভাষচন্দ্র বসুও ছিলেন একজন ‘‘যুদ্ধাপরাধী’৷তাই তাঁর এবং বসু পরিবারের বাকি আত্মীয়স্বজনের গতিবিধি উপর নজরদারি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কোনও ‘‘চক্রান্তে’’’র ফসল ছিল না৷বরং তাঁর সরকার যদি সে কাজ না করত, তাহলে বিশ্বগোষ্ঠীর কাছে তাঁকে কৈফিয়ত দিতে হত৷ ভারত স্বাধীন করার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু যে দেশটির সহায়তা পেয়েছিলেন কিংবা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই দেশটির নাম জাপান হলেও সেই জাপান কিন্তু আজকের জাপান ছিল না৷ সেই জাপান ছিল সমরবাদী জাপান৷যাদের লক্ষ্য ছিল চিন, ভারত সহ গোটা পূর্ব এশিয়ার উপর আধিপত্য বিস্তার৷ সেই সময়কার জাপ সমরশক্তি নৃশংসতা ও বর্বরতায় হিটলারের নাৎসি জার্মানির চাইতে কোনও অংশে কম ছিল না৷ বরং, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চিন-কোরিয়া-মেকং বদ্বীপ সহ বিস্তীর্ণ এশিয়া ভূখণ্ডে তারা যে ভয়ংকর তাণ্ডব ও পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়েছিল, তার কোনও কোনও নজির হিটলার-হিমলারকেও লজ্জা দেবে৷
তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি৷জাপানি সেনাবাহিনী বিনা প্ররোচনায় চিন আক্রমণ করেছিল৷জাপানই ছিল পৃথিবীর প্রথম সমরশক্তি যারা রেডক্রসের অ্যাম্বুলেন্সে লক্ষ্য করেও বিমান হামলা চালিয়েছিল৷কেউ কি কিশোরবেলায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’ পড়েছেন? সেখানেই পেয়ে যাবেন দুই তরুণ বাঙালি চিকিৎসকের চোখে দেখা চিনের উপর জাপ আক্রমণের মর্মন্তুদ বিবরণ৷সেই জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হয়ে উঠেছিল আরও রক্তপিপাসু৷ বিশেষ করে নারী লাঞ্ছনা এবং নারীজাতির বেইজ্জতিতে অক্ষশক্তির অন্য সদস্যরা তাদের ধারেকাছেও ছিল না৷ সেই জাপানের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হাত মিলিয়েছিলেন৷ আর সে কারণেই বাঙালিদের ভালো না লাগলেও ওয়র ট্রাইব্যুনালের রায়ে তিনিও ছিলেন যুদ্ধাপরাধী৷সেই ইশপের গল্প৷ বকের দলে নাম লিখিয়ে শস্য চুরি করে খেতে গেলে সারসও কি আর রক্ষা পায়?
আমরা বাঙালিরা সত্যিই বড় বিচিত্র৷ আমরা সুভাষচন্দ্র বসুর নামে সামান্য সমালোচনা সহ্য করি না (ঠিক যেমনটা নিজের ব্লগে লিখেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু), অথচ আর এক বসু-র নাম বললেও চিনতে পারি না! তাঁর নাম বরেন বসু৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই বরেন বসু একটি বই লিখেছিলেন৷ বইটির নাম ‘রংরুট’৷ নামেই উপন্যাস৷ আসলে লেখকের জীবনকথা৷এখনকার বাঙালি পাঠক শুনলে আশ্চর্য হবেন, বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর একাধিক বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল৷তার পর চলে যায় বিস্মৃতির অতলে৷মানে দায়িত্ব নিয়ে সেখানে পাঠানো হয়৷তার কারণ, জীবনের সেই একমাত্র অসাধারণ সৃষ্টিতে বরেন বসু পরিষ্কার লিখেছিলেন, সত্যি সত্যিই আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল জাপ সেনাবাহিনীর স্কাউট স্কোয়াড৷ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে আসল লড়াইটা হয়েছিল জাপ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর৷আর ব্রিটিশ বাহিনীর গোরামুখো যত নামজাদা রেজিমেন্ট, সব্বাইকে কচুকাটা করেছিল জাপানিরা৷তাহলে জাপানিদের রুখল কারা? তৎকালীন ব্রিটিশ বাহিনীর সব চাইতে শক্তিশালী অংশ, ভারতীয় তথা গুরখা ও পাঞ্জাবিদের নিয়ে গঠিত রেজিমেন্টগুলি৷সেই ভারতীয় যোদ্ধারাই অকুতোভয়ে হাতাহাতি যুদ্ধ করেছিলেন জাপানি ফৌজের সঙ্গে৷জাপানিরা গাছে উঠে নিজেদের ডালে বেঁধে অবিরাম মেশিনগান চালাত৷গুরখা ও পঞ্জাব রেজিমেন্টের যোদ্ধারা অকুতোভয়ে উন্মুক্ত খুকরি ও কৃপাণ হাতে গাছ বেয়ে উঠে তাদের বধ করেছিলেন৷ ঠিক যেভাবে কারগিল যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীকে নিধন করেছিল নাগা রেজিমেন্ট৷কই তাঁদের অবদানের কথা তো কাউকে বলতে শোনা যায় না? সেই যা বলার, লেখার, সবই শেষ হয়ে গিয়েছে বরেন বসুর সঙ্গে সঙ্গে৷নেতাজি ফাইল প্রকাশ্যে আসছে, আরও আসুক৷ খুব ভালো৷ কিন্তু আর এক বসু, বরেন বসুর মতো মানুষের কথাও আমরা স্মরণ করব না কেন? তাঁকেও শ্রদ্ধা জানাব না কেন?
পুনশ্চ: প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অসম্ভব ভক্ত ছিলেন৷মূলত বরুণ সেনগুপ্তর ক্রমাগত চাপ ও ক্ষুরধার লেখনীর জেরেই গঠিত হয়েছিল মুখার্জি তদন্ত কমিশন৷ তবু তাঁর প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি, শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন তাঁকে নিজমুখে বলতে শুনেছিলাম বরেন বসুর কথা, তাঁর সঙ্গে আড্ডা মারার কথা৷বুঝেছিলাম, আসলে সুভাষচন্দ্র বসু কিংবা বরেন বসুর মতো অকপট মানুষের প্রতি বরুণদার মনে একটা আলাদা জায়গা আছে৷ শ্রদ্ধার জায়গা, ভালোবাসার জায়গা৷বরুণদার কাছেই জেনেছিলাম, বরেন বসু থাকতেন রমেশ মজুমদার স্ট্রিটে৷ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের ঠিক পিছনের গলিতে৷ছোট্ট ঘর, এক ফালি তক্তাপোশে বিছানা, আর দেওয়াল জুড়ে সিলিং পর্যন্ত খালি থাক থাক পাঁজা পাঁজা বই!
কোথায় হারাল সেই মগ্ন নির্জন পাঠক বাঙালি, চিন্তাশীল বাঙালি, দুঃসাহসী বাঙালি? রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখে যে বলতে জানে, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’?