বিহারের নির্বাচন এবার নানা দিক থেকেই বাকি ভারতের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু৷ সেখানে এর মধ্যেই দুই দফায় ভোট হয়ে গিয়েছে৷ পরবর্তী ভোট ২৮ অক্টোবর৷বস্তুত, এবার থেকেই আসন সংখ্যাও ধাপে ধাপে বাড়ছে (তিন দফায় ভোট হবে যথাক্রমে ৫০, ৫৫ ও ৫৭টি আসনে)৷এবং, ভোট হতে চলেছে সেসব জায়গাতেই যেখানে নীতীশ-লালু-সোনিয়া গান্ধী কম্বাইন বনাম নরেন্দ্র মোদীর লড়াই জমবে অনেক বেশি৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

যদিও এই ভোটেও জাতপাতের সমীকরণকেই বড় আকারে তুলতে ধরার চেষ্টা চলছে এবং সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলিই একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বেশি, তবু বিহারের এই বিধানসভা নির্বাচন কেবল সেই নিক্তিতে বাঁধা থাকবে বলে মনে হচ্ছে না৷ অস্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না যে, নীতীশ কুমার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিহার তার আগেকার বদনাম বহুলাংশে ঘুচিয়েছে৷আইনশৃঙ্খলা থেকে গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন থেকে নানা সরকারি প্রকল্প, অগ্রগতির ছাপ যদি বিহারে সত্যিই দেখা দিয়ে থাকে, তাহলে তা নীতীশ কুমারের আমলেই ঘটেছে৷ কিন্তু বিগত সাধারণ নির্বাচনের মুখে স্রেফ ভোট ব্যাংকের অঙ্ক কষতে গিয়ে নীতীশ কুমার এমন একটা চাল দিয়ে বসলেন, যা কার্যত তাঁর পক্ষেই ব্যুমেরাং হয়ে গেল৷ গুজরাত দাঙ্গায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকার নিন্দা করে তিনি এনডিএ ত্যাগ করলেন৷ ভেবেও দেখলেন না যে, এমন একটা সময়ে তিনি এটা করছেন, যখন তাঁরই হাতে গড়ে-ওঠা নব্য বিহারের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্ত তরুণ প্রজন্মের চোখেও এক নতুন ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠেছেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী৷ করপোরেট কালচারের সৌজন্যে মোদীর সাম্প্রদায়িক মুখ বদলে গিয়েছে ‘আইটি মোদী’তে৷আর গোটা দেশের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্মের মতো বিহারের এই শ্রেণির তরুণ-তরুণীদেরও একমাত্র মন্ত্র: ভজ মোদী, কহ মোদী, লহ মোদীর নাম৷

সেই প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা নীতীশ কুমারকে সাধারণ নির্বাচনে তো পেতে হয়েইছে, এমনকী বিধান পরিষদ নির্বাচনেও হোঁচট খেয়েছেন তিনি৷ এনডিএ ছাড়ার পরেও হয়তো তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু আবার অঙ্কে ভুল করলেন৷ যে লালু প্রসাদ যাদবকে হটিয়ে তাঁর উত্থান, সেই লালুপ্রসাদ যাদবেরই হাত ধরলেন৷এখনও হয়তো এক শ্রেণির ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ তাঁকে স্তোক দিচ্ছে, মোদী হাওয়া কেবলমাত্র বিহারের শহরাঞ্চলেই আটকে আছে, আপনি ‘বেফিকর’ থাকুন৷ কিন্তু যারা এই অভয়বাণী তাঁকে শোনাচ্ছে, হয় তারা নিজেরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছে, নয়তো জেনেবুঝে নীতীশ কুমারকে ডোবাতে চাইছে৷

আরও একটা বিষয়৷এই প্রথম বিহারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন অনাবাসী বিহারিরা৷এমনকী, বিলেত-আমেরিকায় এমন অনেক অনাবাসী পরিবারই এর মধ্যে চায়ে পে চর্চার স্টাইলে লিট্টি পে চর্চার আয়োজনও করেছেন৷নীতীশ কি মনে করেন, তাঁরা নীতীশকে তুলে ধরতে চাইছেন? আমেরিকায় দু’-দু’বারের সফরে মোদী সেখানকার অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে যে উদ্দীপনা জাগিয়েছেন কিংবা তাঁর সফরকে ভারতের ভাবী উন্নয়নের মাইলস্টোন বলে যেভাবে ‘প্রজেক্ট’’ করা হয়েছে, নীতীশের কি ধারণা অনাবাসী বিহারিরা তার বিপরীত পথে হাঁটবেন?

আরও একটি বিষয় বিহারে এবারকার বিধানসভা ভোটে লক্ষ করার মতো৷তা হল, মহিলা ভোটারকুল এবার সেখানে একটা ‘ডিসাইডিং ফ্যাকটর’ হতে চলেছেন৷পুরুষ ভোটারের সংখ্যা সেখানে সাড়ে তিন কোটির একটু বেশি বটে, কিন্তু মহিলা ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১২ লক্ষ৷এখন প্রশ্ন হল এঁদের বৃহদাংশ পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য বলে ভোট দেবেন, নাকি নিজেদের মন স্থির করে নিজের ভোট নিজে দেবেন? প্রার্থী তালিকায় অবশ্য নীতীশ কুমারই সব থেকে বেশি প্রার্থী নামিয়েছেন, তাঁর দলের প্রার্থীদের মধ্যে দশ শতাংশই মহিলা৷ কিন্তু ভোট যেখানে দিল্লির মোদীর সঙ্গে পাটনার নীতীশের এবং বেশিরভাগের ঘরের ছেলেমেয়ে থেকে পোতাপুতি মোদী বলতে অজ্ঞান সেখানে মহিলা প্রার্থীরা হাতে লণ্ঠন নিয়ে খুব বেশি দূর এগতে পারবেন কি?

এখনও পর্যন্ত বিহারে দু’দফায় ভোট ভালোই পড়েছে৷ ৫০ শতাংশের বেশি৷মাওবাদী উপদ্রুত জেহানাবাদ-গয়াতেও ভোট হয়েছে কার্যত নিরুপদ্রবে, বিনা রক্তপাতে৷যদিও এখনও আরও তিন দফা বাকি, তবু গতবারের লোকসভা ভোটের মতো এবারেও নির্বাচন কমিশন সংঘর্ষ ঠেকাতে মরিয়া৷গত ভোট থেকেই কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিহারের অনেক বাহুবলীই কেমন ভিজে বিড়াল হয়ে গিয়েছেন৷

ভোট চলাকালীনই বিহারে ছটপুজো পড়ছে কি না, জানি না৷ বিহার ও বাইরে বসবাসকারী সমস্ত বিহারির কাছেই সূর্যপূজার আলাদা মহিমা৷ দেখা যাক, এই ভোটের ফলাফলে সেই সূর্যদেবের আলোর ছটা কার মুখে পড়ে৷মোদীর, না নীতীশের৷