অমিতাভ সিনহা, প্রদেশ কংগ্রেস নেতাঃ  করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে গোটা দেশে লকডাউন চলছে।গোটা দেশে কোটি কোটি মানুষ কাজ হারিয়ে চরম দারিদ্র ও অনাহারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরতে গিয়ে পুলিশের অত্যাচারের মুখে পড়ছেন।কেউ কেউ অনাহারে মারা যাচ্ছেন।ছত্তিশগড়ের ১৩ বছরের বালিকা মকদমের কথা এখন অনেকেই জেনেছেন। পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়।

একদিকে করোনা সংক্রমণ প্রতিহত করা ও অন্যদিকে অনাহারক্লিষ্ট মানুষের জন্য অন্ন সংস্থান করা মূল কাজ , তখনই বাংলার বুকে রাজ্যপাল-মুখ্যমন্ত্রীর পত্রযুদ্ধ দেখে রাজ্যবাসীর প্রশ্ন কেন্দ্র ও রাজ্য কি আদৌ বিশ্বজুড়ে এই ভয়ঙ্কর রোগের মোকাবেলায় আন্তরিক? প্রতিদিনই নিয়ম করে রাজ্যসরকারের বিভিন্ন মন্ত্রককে লক্ষ্য করে বিবৃতি দিয়ে থাকেন রাজ্যপাল জগদীশ ধনখড়। বর্তমানে তাঁর অভিযোগ বিজেপি নেতা সাংসদদের ত্রাণকার্যে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না, রেশনিঙ ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে , করনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য ঠিক মতন টেস্ট করা হচ্ছেনা , চিহ্নিত হলেও সঠিক চিকিৎসা হচ্ছেনা ইত্যাদি।

এছাড়াও রাজ্যপালের অন্যতম অভিযোগ তাঁর কথা মুখ্যমন্ত্রী শুনছেন না , তাঁকে উপযুক্ত সন্মান ও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সংবিধানের ১৬৩ নম্বর ধারাতে বলা আছে যে রাজ্যপাল রাজ্য মন্ত্রীসভার পরামর্শ মতন কাজ করবেন। কিন্তু এ রাজ্যে রাজ্যপাল হয়ে আসার পর থেকেই বর্তমান রাজ্যপাল বালখিল্যের মতো এবং এক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির মতন আচরণ করে চলেছেন।

হঠাৎ তিনি ২২ এপ্রিল এক টুইটার বার্তায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে মুখ্যমন্ত্রী জানান যে তিনি করোনা মোকাবিলার কাজে ব্যস্ত। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে রাজ্যপাল জানান তিনি “স্তম্ভিত এবং অপমানিত”। উল্লেখ্য এই “অপমানিত” শব্দটি তিনি এত ব্যবহার করেছেন যে এ নিয়ে অজস্র মিম এবং হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে।

এরপরই রাজ্যপালকে মুখ্যমন্ত্রীর ৫ পাতার চিঠি , জবাবে রাজ্যপালের ১৪ পাতার চিঠি যেখানে তিনি বলেছেন, সাংবিধানিক কর্তব্যের ধারাবাহিক অবহেলা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে শিষ্টাচার লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এবং সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ করার অভিয়োগ আনেন।মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে চিঠিতে মনে করিয়ে দেন যে রাজ্যপাল মনোনীত, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত।

তিনি রাজ্যপালকে শিষ্টাচার মেনে চলার কথা বলেন।শেষতম সংযোজন রাজ্যপালের ১৪ পাতার চিঠি যাতে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ করে করোনা মোকাবিলায় জঘন্য ব্যর্থতা,সঙখ্যালঘু তোষণ, করার অভিযোগ তোলা হয়। রাজ্যপাল শ্রী ধনখড়ের এই চিঠিতে অবশ্য এটি প্রমাণিত হয় যে তিনি এই ভয়ঙ্কর সময়েও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার চেয়েও যাদের দ্বারা মনোনীত হয়ে চেয়ারে বসেছেন তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ দেখতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

কেন্দ্রের মদত না থাকলে তিনি যে একাজ করতেন না তা আজ অত্যন্ত পরিস্কার। সংখ্যালঘু তোষণ কীভাবে হল? করোনা পরিস্থিতে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৃথক কোনও বিশেষ আর্থিক সাহায্য সংখ্যালঘুদের দুয়েছেন? আদৌ তা নয়। তাহলে ? রাগটা হচ্ছে তিনি কেন সংঘ পরিবারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলেননি যে দিল্লিতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিত নিজামুদ্দিনের তবলীগ জামাত থেকে সারা দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে এবং এর জন্য সংখ্যালঘুরাই (পড়ুন মুসলমান ) দায়ী। অবশ্য শ্রী ধনকড় এই সাম্প্রদায়িক তাসটি খেলার পর থেকেই মোদি আর মোহন ভাগবতরা আন্তর্জাতিক চাপে এখন ভক্তিমূলক গীত গাইছেন।

পবিত্র রমযান মাসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।অবশ্য ওই শুভেচ্ছা অন্য কেউ জানলে বলা হত ‘ সংখ্যালঘু তোষণ ‘ হচ্ছে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে কোনো আভাস না থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে করোনা ও লকডাউন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রের পর্যবেক্ষকরা শহরে পা দেওয়ার প্রায় তিন ঘন্টা পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তা মুখ্যমন্ত্রীকে জানান। উল্লেখ্য যেদিন এই দল কলকাতায় পদার্পণ করল সেদিন কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের মধ্যে যে চারটি রাজ্য করোনার আক্রমণে শীর্ষে সেগুলো হলো মহারাষ্ট্র , গুজরাট , মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি। পশ্চিমবঙ্গ ছিল দশম স্থানে।

কেরালা করোনা মোকাবিলায় আদর্শ উদাহরণ স্থাপন করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার গুজরাট , মধ্যপ্রদেশ কে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় দল পাঠাল পশ্চিমবঙ্গ , কেরালা , রাজস্থানে। কেরালায়( যেখানে সবচেয়ে ভালো ভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হয়েছে), রাজস্থান (যে রাজ্যের ভিলওয়ারা মডেল অনুকরণীয়)।কেন? বিরোধী দলের সরকার বলে? এই ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রাণের দামের চাইতে নিজেদের দলের ক্ষমতা দখলকে গুরুত্ব দেবে তাতো প্রমাণ হয়েই গেছে ।এরা মধ্যপ্রদেশে নির্বাচিত সরকার ভাঙার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে কয়েকজন কংগ্রেস বিধায়ককে ভাঙিয়ে সেখানে সরকার গঠন করেছে ও করোনা মোকাবিলায় চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কেন কেন্দ্রের এই প্রতিনিধি দলটিকে একদিন কাজ করতে বাধা দিল ? রাজ্য সরকার যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র- রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে লক্ষণরেখা আছে সেই বিষয়টি উত্থাপন করে যদি প্রথম থেকেই তাদের সহায়তা করত , তাহলে সেটাই হত সঠিক কাজ।রাজ্য সরকারের আচরণে মনে হয়েছে তাঁরা তথ্য গোপন করতে চাইছেন। এদিকে এই প্রতিনিধি দলটির কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে এর গঠনমূলক পরামর্শ দিতে আসেনি এসেছে ছিদ্রান্বেষণ করতে।

মন্ত্রীসভার সবচেয়ে প্রবীণ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি বলেছেন যে আমরা মমতা ব্যানার্জি কে ঠিকমতো সবাই সাহায্য করতে পারছিনা,সে একাই সব কাজ করছে। প্রশ্ন তো উঠতেই পারে যে কেন মুখ্যমন্ত্রী বাজারে গিয়ে সামাজিক দূরত্বের পাঠ দিতে খড়ির গন্ডী কাটবেন। এ কাজ তো থানার ওসি বা বিডিও দায়িত্ব নিয়ে কোনো কর্মীকে দিয়ে করাতে পারেন।কেনই বা রেশনে দুর্নীতি নিয়ে সব প্রশ্নের জবাব তিনি দেবেন। খাদ্যমন্ত্রী বা খাদ্যসচিবের কাজের দায়িত্ব তো এটা। তাহলে আর মন্ত্রীসভা কেন? স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সব খবর তাকেই বা জানাতে হবে কেন? স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য কি কোয়ারেনটাইনে চলে গেছেন?

কোভিড ১৯ এর মৃত্যুর ঘোষণা তো সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডাক্তার বা বড়জোর সুপার করতেই পারেন। কেন তার জন্য ডেথ কমিটি করে তথ্য লুকোতে হবে? এই মহামারীর তথ্য লুকোনোর বিনিময়ে কি একজন সুস্থ হয়ে যাবেন? রাজ্যের জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দপ্তরের মন্ত্রী কোথায়? সেই দপ্তরেরই বা ভূমিকা কি?বাঙুর হাসপাতালের ভিডিও প্রকাশ হবার পর কেন আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগীদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলো?

এলাকায় বিধায়ক পৌরপিতা থাকতে কেনই বা মুখ্যমন্ত্রীকে কলকাতা জুড়ে পথসভা করতে হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রীর মতো প্রচারসর্বস্ব হলে মহামারী কি করে সামলানো যাবে? কেরালায় মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বের সরকার বিরোধী নেতা রমেশ চেন্নিথালা ,শশী তারুর সহ সমস্ত কংগ্রেস নেতা ও সংগঠনকে নিয়ে একসঙ্গে সে রাজ্যে করোনা ঠেকানোর কাজ করেছে বলেই দেশজুড়ে আজ কেরালার সাফল্য। অথচ বামপন্থী ও কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ এই কাজের জন্য কি ঢাকঢোল পেটাচ্ছে? এদের দেখে কি শিখতেও ইচ্ছে করে না?

এটা সত্য যে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে কোভিড -১৯ এর পরীক্ষা অনেক কম হওয়ার কারণে দেশে আক্রান্তের সঙখ্যাটা অনেক কম দেখা যাচ্ছে। তাও বর্তমানে প্রায় ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি। আবার সর্বভারতীয় তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যতে এই পরীক্ষা আরো কম করা হয়েছে। যদিও সম্প্রতি জানা গেছে যে চিনে প্রস্তুত কিটগুলো একেবারেই নির্ভরযোগ্য নয়।

মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিক্যাল রিসার্চ ( যা ১৯৫২ তে জওহরলাল নেহরু স্থাপন করেছিলেন ) এর কিট ঠিকঠাক ফল দিত। কিন্তু নাইসেড , আই সি এম আরের দেওয়া কিট ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক নমুনার রিপোর্ট অসম্পূর্ণ এসেছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজ্য একই অভিযোগ করায় মাত্র ৩ দিনের মাথায় এই কিটে পরীক্ষা করা বন্ধ করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার কিটের দাম মাত্র ৩৩৭ টাকা যা কংগ্রেসশাসিত ছত্তিশগড়ের সরকার কিনেছে এবং এই কিট ব্যবহার করে কাঙ্খিত ফল পাওয়া সত্ত্বেও কেন তার দ্বিগুণ দামে চিন থেকে কিট আনা হল? আমেরিকা, বৃটেন সহ বহুদেশ এই কিটের গুণমান সম্পর্কে সাবধান করেছিল। তাহলে এই মহামারী মোকাবিলার সময় যে ডিল হয়েছে তা থেকেও দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ