ভারতের তরফ থেকে আফ্রিকার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে৷ আফ্রিকাও ভারতের মতো বন্ধুকে স্বাগত জানিয়েছে প্রকৃত ভালোবাসা ও উষ্ণতায়৷ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার বন্ধুত্ব নতুন কিছু নয়৷ এক সময় সমুদ্রপথে ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন রাজত্বের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল৷ ছিল বহুযুগ আগে থেকে, ভাস্কো দা গামা তখনও উত্তমাশা অন্তরীপ খুঁজে পাননি৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

এমন নয় যে, নরেন্দ্র মোদী একটা নতুন কিছু করে দেখালেন৷ জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে স্বাধীন ভারত বরাবর আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামের পাশে থেকেছে৷দীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ যখনই স্বাধীনতা লাভ করেছে, তৎক্ষণাৎ নেহরু তাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, স্বাগত জানিয়েছেন৷জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে আফ্রিকার নব-উদিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির ভরসা ছিল যে জেন্টল কলোসাসের ছায়া, তা ছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুরই৷সুতরাং, নরেন্দ্র মোদী একটা যে নতুন কিছু করলেন তা নয়, তিনি পুরানো সম্পর্ককেই ফিরিয়ে আনার একটা উদ্যোগ নিলেন৷অবশ্যই এজন্য তাঁর প্রশংসা প্রাপ্য৷
ভারতের দিক থেকে এই তৎপরতার প্রয়োজন ছিল৷বিশেষ করে, একদিকে আফ্রিকার একাধিক দেশে যখন ফের অশান্তি পেকে উঠেছে এবং অন্যদিকে আফ্রিকাকে পুনরায় গ্রাস করতে নয়া ঔপনিবেশিকতার চেহারা নিয়ে সেখানে থাবা বাড়িয়েছে লালচিন এবং আরব শেখশাহি৷এই উদ্যম আরও একটু আগে দেখালে ভালো হত৷
চিন্তা এটাই যে, পরবর্তীকালেও এই সহমর্মিতা বজায় থাকবে তো? ভারত সরকারের এখন একটা বড় লক্ষ্য হল রাষ্ট্রসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী পদ লাভ৷এই পদ ভারত যাতে না পায়, তার জন্য যত প্রকারে পারা যায় তত ভাবেই বাগড়া দিচ্ছে বেজিং৷ আফ্রিকার সঙ্গে মৈত্রীসম্পর্কে নতুন করে প্রাণসঞ্চারের পিছনে নরেন্দ্র মোদী সরকারের একটি বড় উদ্দেশ্য হল, নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী পদ লাভের জন্য ভারতের দাবিকে আফ্রিকা সমর্থন জানাক৷এর জন্য অবশ্য আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশকে ভারত সব সময়ই পাশে পেত৷কিন্তু যতই হোক, নরেন্দ্র মোদী নিজেও গুজরাতি, তায় তাঁর পার্টিও আদতে ‘বানিয়া পার্টি’৷ তাই এক্ষেত্রেও তিনি একটা ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ পলিসি চাললেন৷আফ্রিকাকে আমরা অর্থনৈতিক সহায়তাও জোগাব, বিনিময়ে রাষ্ট্রসংঘে আমাদের পিছনে থাক৷
বাস্তবিক, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চার স্থায়ী সদস্য যদি ভারতের পাশে থাকে এবং সেইসঙ্গে সাধারণ সভার বেশিরভাগ দেশ যদি ভারতের দাবি সমর্থন করে (যেটা তারা করছেও), তাহলে কেবল ভিটো পাওয়ার প্রয়োগ করে এবং একে ওকে ঘুষ দিয়ে পঞ্চম স্থায়ী সদস্য চিন এমনিতেই বেশি দিন টানতে পারবে না৷এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে বরং চার স্থায়ী সদস্যই তাকে চোখ রাঙিয়ে বলতে পারে, তুমি নিজেই তো ঠাঁই পেয়েছিলে আমাদের নিজেদের মধ্যেকার ঠান্ডা লড়াইয়ের (যখন একদিকে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্স আর অন্যদিকে রাশিয়া) সুযোগে৷বেশি ঝামেলা করলে তোমাকেই ফের ‘রোগ স্টেট’ বলে দাগিয়ে একঘরে করে দেব! অর্থাৎ, সেদিক থেকে দেখলেও নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ সময়ের অপেক্ষা৷
এখন ধরে নেওয়া যাক, ভারত নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পেল এবং মানবজাতির জন্মদাত্রী আফ্রিকা সর্বান্তঃকরণে তাকে সমর্থন জানাল৷অতঃকিম? রাত পোহালেই নরেন্দ্র মোদীর সরকার আফ্রিকার কথা ভুলে যাবে না তো? তখনও আফ্রিকার দীর্ঘকালের বঞ্চনা, নিপীড়ন এবং সীমাহীন শোষণের কথা ভেবে কি দিল্লির বুকে ব্যথা জাগবে?
এমনিতে যেদেশে গায়ের রং কালো হলে কোনও মেয়ে ‘সৎপাত্র’স্থ হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয় না, যে দেশের দণ্ডমুণ্ডের বর্তমান কর্তাদের গ্রে-ম্যাটারে ‘মিথ’ আর ‘হিস্ট্রি’ গুলিয়ে যায়, সেই দেশ যদি নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী পদ পাওয়ার পরেও ‘বসুধৈব কুটুম্বকমে’র কথা মনে রেখে আফ্রিকার বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাকে মর্যাদা দেয়, তাহলে স্বীকার করতেই হবে ভারতের নেতৃবর্গ অন্তত ‘কৃতজ্ঞতা’ ও ‘কৃতঘ্নতা’র ফারাকটা বোঝেন৷
তখন স্বীকার করতেই হবে, এঁরা ‘সিডস অব চে গেভারা’র মূল্য তত না বুঝলেও, তাঁদের কদর করতে জানেন৷