গৌতম রায় : জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ঘিরে যে আশঙ্কা, আলাপ-আলোচনা, উদ্বেগ আসামে শুরু হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে বাংলার দিকে আসতে শুরু করেছে। ত্রিপুরা ও এই উদ্বেগ থেকে বাদ যাচ্ছে না। আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এখন অফিস কাছারি, চায়ের ঠেক থেকে শুরু করে, দামি রেস্তোরাঁ– সব জায়গাতেই আলাপ-আলোচনা আড্ডার ভিতরে এন আরসির প্রসঙ্গটা একবার উঠে পরছে এনআরসিকে ঘিরে প্রথাগত শিক্ষা আলো পাওয়া মানুষদের ভেতরেও যেমন উদ্বেগ-আশঙ্কা, তেমনিই প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মানুষদের মনেও প্রবল দুশ্চিন্তা।

গৌতম রায়

স্বাধীনতার এতকাল পরেও যদি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কা রাষ্ট্রকর্তৃক তৈরি করা হয়, তাহলে পরিবেশ পরিস্থিতি যতটা আশঙ্কামূলক জায়গায় যাওয়ার কথা, ততটাই যেতে চলেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল আর রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল এনএসসিকে ঘিরে পরস্পর এমন একটা ছদ্ম সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করছে, যার পলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিভ্রান্ত হতে শুরু করেছে।

কেন্দ্রের শাসক বিজেপির ঘোষিত অবস্থান ভারতবর্ষকে তারা আরএসএসের সদরদপ্তর নাগপুরের কেশব ভবনের ছাপ মারা হিন্দুর দেশে পরিণত করবে। বলাবাহুল্য আরএসএসের ছাপওয়ালা এই হিন্দুর সংজ্ঞাতে যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কোনও জায়গা নেই। এমনকি প্রথাগতভাবে যাঁরা নিজেদের হিন্দু বলে মনে করেন, হিন্দু আচার আচরণের সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রাখেন, অথচ, সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী নন, পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল– সেইসব মানুষদেরও আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি কোনও অবস্থাতেই হিন্দু বলে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়।

বিগত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে গোটা সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি এই প্রচার চালাতে শুরু করেছে যে; এনআরসি ঘিরে হিন্দুদের কোনও আশঙ্কার কারণ নেই। অর্থাৎ; ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দু ব্যতীত অন্য ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের জন্য একটি ‘নিষিদ্ধ দেশ’ হিসেবে তুলে ধরতে, এভাবেই প্রচার করা হচ্ছে যে; গোটা বিশ্বে ভারতবর্ষ হবে হিন্দুদের একটি ‘পীঠস্থান’।

হিন্দুদের জন্য তথাকথিত স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে এনআরসির জুজু ভিতর দিয়ে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া, ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা, চরম বেকারি, শিক্ষা ব্যবস্থার চরম নৈরাজ্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সংকট– এই সমস্ত বিষয় থেকে দৃষ্টিতে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রের শাসকেরা যখন এই পথে হাঁটছেন, তখন রাজ্যের শাসক এই এনআরসির বিষয়টিকে ঘিরে এমন অবস্থান নিচ্ছেন যাতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রটি একটি বিশেষ ধরনের সুবিধাদায়ক জায়গায় এসে পৌঁছাতে পারে। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার পাল্টা হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এই রাজ্যের শাসকেরা গত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত সফলভাবে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের যেমন সুবিধে করে নিয়েছে, তেমনই কেন্দ্রের শাসকদেরও সুবিধে করে দিয়েছে।

এনআরসি বিতর্ক প্রবল হওয়ার আগেই গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের শাসকদের পক্ষ থেকে ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলতে শুরু করে দেওয়া হয়। এই ভাষা ভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার ভিতর দিয়ে এমন একটি পরিবেশ এই রাজ্যের শাসক, পশ্চিমবঙ্গের বুকে গত প্রায় ছয় মাসে কায়েম করেছে, যার ফলস্বরূপ, রুটি-রুজির তাগিদে ভিন রাজ্য থেকে এই রাজ্যে আসা মানুষজন ক্রমশ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুধু পড়ে যাচ্ছেন না, তাঁদের জানমালের নিশ্চয়তা ঘিরেও সংশয় তৈরি হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্ভাবিত এই ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার পাল্টা হিসেবে ভারতবর্ষের অন্যান্য বহু রাজ্যে ইতিমধ্যেই বাঙালি বিদ্বেষী একটা মানসিকতার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। যার জেরে সেইসব রাজ্যগুলিতে রুটি-রুজির তাগিদে বিভিন্ন স্তরের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যেসব বাঙালিরা কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের জীবন-জীবিকা ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে শুরু করেছে।

কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি একদিকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষকে এটাই বোঝাতে চেষ্টা করছে যে, এনআরসি নিয়ে হিন্দুদের কোনও ভাবনার কারণ নেই। অর্থাৎ; এনআরসিকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গকে যে মুসলমান শূন্য করাটাই এদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য– সেই কথাটাই আরএসএসের হাজারো রকমের শাখা সংগঠন এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া কাজ খুব জোর কদমে চলছে।

এই কৌশল অবলম্বনের ভিতর দিয়ে সামাজিক বিভাজনের রেখাটিকে এতটাই তীব্র করে তোলার নোংরা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে যে, মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে নানা ছলছুতোয় অভিযোগ তুলে, তাঁদের বিরুদ্ধে ধর্মস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতনের পর্যন্ত অসত্য অভিযোগ তোলা হচ্ছে। মুসলমানদের জানমালের উপর অত্যাচার চালিয়ে, তাঁদেরকে দেশছাড়া করবার একটা নীল নকশা যে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির তৈরি করা হয়ে গিয়েছে– একথা বুঝতে এখন আর কারও অসুবিধা হচ্ছে না।

লোকসভা নির্বাচনের আগেই বুঝতে পারে গিয়েছিল যে, ভোটের ফল থেকে যদি বিজেপি একটা সুবিধাজনক অবস্থায় আসে, তাহলে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবরোধ হিন্দুত্ববাদীরা গড়ে তুলবে। সেই অবরোধের পরিবেশকে অতিক্রম করে মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবার বিভৎস ষড়যন্ত্রই এনআরসির ভিতর দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন বিজেপি সফল করতে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতি বিজেপির সহযোগী শক্তিগুলো পশ্চিমবঙ্গেও কায়েম করেছে।

এনআরসি ঘিরে বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসবে পর থেকে যেসব উপক্রম পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে, সেইসব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ভারতবর্ষের অ-বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে সমর্থন সাহায্য ও সহযোগিতা করে এসেছে।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যাকে অবলম্বন করে এনআরসির বিষয়টিকে নিয়ে বিজেপি আজকে ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ভেঙে তছনছ করে, ভারতবর্ষকে তথাকথিত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে সেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সব থেকে বড় সমর্থক ছিলেন আজকের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বামপন্থীরা সেদিন সংসদের ভিতরেও বাইরে নাগরিকত্ব বিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি কি ধরনের সামাজিক বিভাজন চালাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন। বামপন্থীরা সাধারন মানুষকে বারবার বুঝিয়েছেন, নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধনী অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার আনছে, সেই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য হল; তাদের চিন্তা চেতনার একদম আদিগুরু এম এস গোলওয়াকরের ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র তত্ত্বের বাস্তবায়ন।

গোলওয়ালকার তাঁর ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র তত্ত্বের ভিতর দিয়ে ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দুদের বাসভূমি বলেই খুব সুস্পষ্টভাবে একটি তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই তাত্ত্বিক অবস্থান নির্মাণের ক্ষেত্রে গোলওয়ালকার এটাও বলেছিলেন যে; রাজনৈতিক হিন্দুদের বাইরে যে সমস্ত মানুষ ভারতবর্ষে থাকবেন, তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন না। নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার তাদের থাকবে না। তাদের থাকতে হবে রাজনৈতিক হিন্দুদের দাসানুদাস হিসেবে।

অটল বিহারি বাজপেয়ি তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী এনে গোলওয়ালকারের এই ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র তত্ত্বকেই একটি আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন আর এস এস, অটলবিহারী বাজপেয়ী, বিজেপির সেই প্রচেষ্টার সবথেকে বড় সমর্থক ছিলেন, আজকের এন আর সির ছদ্ম বিরোধী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সঙ্ঘ, বিজেপির সেই রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে মানুষের কাছে সংসদের ভিতরে এবং সংসদের বাইরে তুলে ধরতে জান কবুল লড়াইয়ে বামপন্থীরা করেছিলেন। আজও তাঁরা বাংলা তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এনআরসির নাম করে মানুষে মানুষের বিভাজন, হিন্দু মুসলমানের বিভেদের প্রবাহ সৃষ্টি করে মুসলমানকে দেশছাড়া করবার এই নোংরা ষড়যন্ত্র, তার বিরুদ্ধে মাঠে ময়দানে জান কবুল লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।

ড. মনমোহন সিংয়ের প্রথম দফার প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে, প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র সাংসদ হিসেবে সংসদে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় তিনি সংসদের অধিবেশন কক্ষে বাংলায় এনআরসি লাগু করার দাবিতে শুধু একাধিকবার সোচ্চার হয়েছেন তাই-ই নয়, বাংলাতে এনআরসি চালু করার দাবি নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে, লোকসভার উপাধ্যক্ষ আটোয়ালজীকে কাগজের তোড়া ছুড়ে মারতেও দ্বিধা করেননি।

সেদিন মমতা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে মানুষজন অবৈধভাবে প্রবেশ করছে– বিজেপির এই দাবির সঙ্গে এক সুরে সুর মিলিয়ে লোকসভার ভিতর ও বাইরে সোচ্চার হয়েছিলেন। আর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বলছেন, তিনি নাকি পশ্চিমবঙ্গে এন আর সি চালু হতে দেবেন না। সাধারণ মানুষের কাছে এনআরসি ঘিরে এক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, দুই সময়ের, দুই চরিত্র– আজ প্রায় জলের মতো পরিষ্কার।

বাংলার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে, বাংলায় হিন্দু মুসলমানের ভিতরে ভয়াবহ বিভাজন রেখা তৈরি করতে, সেই বিভাজন রেখাকে আশ্রয় করে পশ্চিমবঙ্গকে মুসলমান শূন্য শুধু নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ আজ যে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের ভিতর দিয়ে, অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই দেশের গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ও মানুষকে চরম বিপদে ফেলে, সেখানকার ইসলামীয় মৌলবাদকে মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিয়ে, ভারতীয় উপমহাদেশকে আবার পাকিস্তানের ছায়া উপনিবেশে পরিণত করবার জন্য আরএসএস ও তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জড়িত, সেই চক্রান্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই তথাকথিত এনআরসি বিরোধী অভিনয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এনআরসি বিরোধী যে অভিনয় মমতা করে চলেছেন, যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আজ পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা এনআরসি লাগু হতে দেবেন না বলে সোচ্চারে দাবি জানাচ্ছেন, সেই মমতা কি একবারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, বিরোধী নেত্রী হিসেবে সংসদের ভিতরে কেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি লাগুর দাবিতে প্রথম দফার ইউপিএ সরকারের আমলে এতবার সোচ্চার হয়েছিলেন? কেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি লাগু করার দাবিতে লোকসভার উপাধ্যক্ষের এদিকে কাগজের তোড়া ছুঁড়ে মেরেছিলেন? এইসবের কোনও ব্যাখ্যা কি মুখ্যমন্ত্রী মমতা, তাঁর এই তথাকথিত এনআরসি বিরোধী অবস্থানের সময়কালে একবারের জন্যও দিয়েছেন?

সাধারণ মানুষ যাতে খাদ্যের দাবিতে সোচ্চার না হয়, শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার না হয়, বেকারত্ব নিরসনের দাবি না তোলে, স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবি না তোলে, নারীর ক্ষমতায়নের দাবি না তোলে, সংখ্যালঘুর অধিকার ব্রিটিশের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের কালের চুক্তি অনুযায়ী, সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা না তোলে ,আদিবাসী, দলিত, তপশিলি জাতি, উপজাতি ভুক্ত মানুষ, যাতে তাঁদের অধিকার, কর্মসংস্থান– ইত্যাদির প্রশ্ন না তোলে, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের কাছে বেচে দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনও প্রশ্ন যাতে তৈরি না হতে পারে, নতুন কোনও শিল্পের সম্ভাবনা কেন ভারতবর্ষে তৈরি করতে দেশের সরকার যত্নবান নয়– এই প্রশ্ন যাতে মানুষ না করেন– সেই জন্যই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এনআরসির জুজু সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে চলেছেন।

সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা ও ৩৫-এর এ ধারা অবলুপ্ত করে কাশ্মীরের মানুষদের অধিকার কেড়ে নেওয়া নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রশ্নকে অন্য খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, সেই জঘন্য উদ্দেশ্য নিয়েই এনআরসিকে ঘিরে এই তোড়জোড়।

৩৭০ নম্বর ধারা কাশ্মীর থেকে অবলুপ্ত হওয়ার পর, সেখানকার প্রতিটি অ-বিজেপি, প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অত্যন্ত সাধারণ কর্মী সমর্থক এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার কি ভয়াবহভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা নিয়ে যাতে সাধারন মানুষ কোনও প্রশ্ন না তুলতে পারেন, তার জন্যই সামনে তুলে আনা হয়েছে এই এনআরসির মতো বিষয়টি।

বিজেপি একদিকে এনআরসির বিষয়টিকে সামনে তুলে এনে তাঁদের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ব্যর্থতাগুলিকে এভাবে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন, অপরপক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এনআরসি ঘিরে দ্বিচারিতার ভূমিকা সবরকম ভাবে বিজেপিকেই সাহায্য করছে।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ধ্বংস করে, এই দেশকে রাজনৈতিক হিন্দুদের মুক্তাঞ্চল করার যে বিষয়টির দিকে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে, এনআরসি হল সেই ধাপেরই একটি প্রলয়ঙ্কর অংক। সেই অঙ্কের যোগফল সঙ্ঘ– বিজেপিকে মিলিয়ে দিতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের দাবার চাল হিসেবে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরতে আত্মনিবেদন করেছেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস।

* মতামত লেখকের নিজস্ব