বিনোদ ঘোষাল

কলকাতার নামী স্কুলের দুই শিক্ষক(!) সেই স্কুলের একটি ফুলের মতো শিশুর ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে তা শুনে যে কোনও সুস্থ মানুষের মতো আমিও ঘৃণায়, আতঙ্কে উদ্বেল হয়েছি। দিশেহারা লাগছে, এ কোন সভ্যতার দিকে চলেছি আমরা। মানুষের সমাজে শিশু নির্যাতন আজকের ঘটনা নয়। বহুযুগ ধরে ছেলে কিংবা মেয়ে শিশুরা বিকৃতকাম পুরুষের দ্বারা নানাভাবে যৌন অত্যাচারের বলি হয়েছে। সেইসব শিশুর পরবর্তী জীবনও মানসিকভাবে হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

আবার এটাও সত্যি যে এমন ঘটনা কোটিতে দুটিই আমাদের নজরে এসে যায়। পৃথিবীর গ্রামে-গঞ্জে ছোট-বড় শহরে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে এমন নরপিশাচদের দ্বারা কত ফুল যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা আমরা জানতেও পারি না। কিন্তু কেউ ধরা পড়লে মানব সমাজের সুস্থ নর-নারী প্রত্যেকেই সেই পিশাচের কঠোরতম শাস্তি দাবী করে। খুব স্বাভাবিক। এমন শাস্তি আমিও চাই, যাতে ভবিষ্যতে এই মানসিকতার শয়তানগুলো এই জাতীয় অপরাধ করার আগে থমকে যায়। কিন্তু তার পরেই আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে। যে পকেটমারটি ভিড় বাসে পকেট মারতে ওঠে, সে জানে ধরা পড়লে হয়তো গণপিটুনিতে তার প্রাণনাশও হতে পারে, যে খুন করে সেও জানে ধরা পড়লে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, কিন্তু ‘ধরা পড়ব না’ এই চান্সটাই সে নেয়। নিয়ে থাকে। সে ধরা পড়তে পারে, পড়লে কী হতে পারে সেই পরিণতির কথা ভাবে না। ভাবলে এতদিনে, খুন, ডাকাতি কিংবা অন্য অপরাধ এতদিনে বন্ধ হয়ে যেত।

ঠিক একই ব্যাপার এই ধর্ষণকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ধর্ষণ একটি বিকৃত প্রবৃত্তি। সব পুরুষের এই প্রবৃত্তি থাকে না। কিছু পুরুষের থাকে। সেই বিকৃতির নানা ধরন থাকে। যার মধ্যে শিশুনির্যাতন একটি। এবার কথা হল, যেসব পুরুষের এই প্রবৃত্তি থাকে এবং সুযোগ পেলে তারা যখন নিজেদের বিকৃতকাম চরিতার্থ করার কাজে লিপ্ত হয় তখন তার মাথায় থাকে না সে ধরা পড়তে পারে, ধরা পড়লে আইন কিংবা জনরোষে তার নিষ্ঠুরতম পদ্ধতিতে সাজা হবে পারে। সে পরিণতির কথা ভুলে যায়।

তাহলে? তাহলে এই ধরা পড়া এইসব নর-পিশাচদের চুড়ান্ত শাস্তি, তা লিঙ্গচ্ছেদই হোক বা শিরশ্ছেদ তাই দিয়ে অপরাধীকে ভয় দেখানোর থেকে, ভবিষ্যতে এই ধরণের মানসিকতার পুরুষদের সাবধান করার থেকে আমাদের নিজেদের শান্তি দেওয়াটাই মুখ্য হয়ে ওঠে?

একটা সময় মানসিক রোগকে কোনও রোগ হিসেবে ধরা হত না। ‘পাগল’ আখ্যাই একমাত্র পথ ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে মানসিক চিকিৎসা যথেষ্ট প্রাধান্য পেয়েছে। আমাদের জীবনযাত্রার কারণে মানসিক বৈকল্যও বাড়ছে লাফিয়ে। প্রতি পাঁচজন মানুষে একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। পিডোফেলিয়া হোক বা নারীকে ধর্ষনেচ্ছা একটি বিকৃত মানসিকতা। মানসিক চিকিৎসকদের কাছে আমার সবশেষে একটি প্রস্তাব এবং প্রশ্ন রয়েছে। যে দেশে আধার কার্ড নিয়ে এত কড়া নিয়ম চালু করতে পারেন সরকার, সেই ক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিককে নিয়মিত মনোচিকিৎসকের কাছে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভিজিট করা, সিটিং দেওয়ার মাধ্যমে এই বিকৃতি আটকানোর চেষ্টা করা কি অসম্ভব? মনোচিকিৎসকরা নিশ্চয়ই একজন মানুষের যৌনতা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক তা কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে বোঝার ক্ষমতা রাখেন। এবং সেইমত ট্রিটমেন্টও করাতে পারেন। এইভাবে কি আদৌ কিছুটা সুরাহা হওয়া সম্ভব? এটা আমার প্রশ্ন।

যদি চিকিৎসকরা বলেন, হ্যাঁ অনেকটা সম্ভব, তাহলে সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা একদিনে নোটবন্দি করার ক্ষমতা রাখতে পারলে এই পদ্ধতিটিও কিন্তু চালু করার ক্ষমতা রাখেন। দয়া করে ভেবে দেখবেন। অসম্ভব বলে যে কিছুই নেই, সেটা তো আপনারা ইতোমধ্যেই অনেককিছুতে প্রমাণ রেখেছেন। জনগণের নিরাপত্তার দোহাইতে সবকিছুতে আধার লিংক, যদি সম্ভবপর হতে পারে তাহলে এটা কেন অসম্ভব হবে? আমাদের জীবনযাপন অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে আমরা কিন্তু মানসিক অবসাদ, আত্মহত্যাপ্রবণ, অসহিষ্ণু ইত্যাদি আরও নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছি প্রতিদিন। ভেবে দেখার, প্রতিরোধের সময় হয়ে এসেছে। নইলে একদিন পুরো পৃথিবীটাই পাগলাগারদ হয়ে যাবে।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে এইভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে নাগরিক দেশীয় আইনকে কতদিন মান্যতা দেবে তাই নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। কোনও সুস্থ মানুষই চিরকাল এমন বর্বরতাকে সহ্য করতে পারবে না। আশা করি ভেবে দেখবেন আপনারা।

- Advertisement -