মানব গুহ, কলকাতা: দিল্লিতে কি জারি হতে চলেছে রাষ্ট্রপতি শাসন? রাজধানীর রাজনীতিতে কান পাতলে অন্তত এমনটাই শোনা যাচ্ছে৷ দিল্লীর মুখ্যসচিব অংশু প্রকাশকে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে শাসক দলের বিধায়কদের মারধরের ঘটনায় টালমাটাল দিল্লি৷ দিল্লিতে রীতিমত আমলা বনাম রাজ্য প্রশাসনের লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে৷ এই সুযোগে বিজেপি, দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন৷

গত সোমবার রাতে, মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতেই আপ বিধায়করা মুখ্যসচিব অংশু প্রকাশকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে শারীরিক ভাবে হেনস্থা করে বলেই অভিযোগ। মুখ্যসচিবকে শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দিল্লি। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে রাজধানীর আমলা মহল৷ অভিযোগ পেয়ে তদন্ত শুরু করে দিল্লি পুলিশ। মুখ্যসচিবকে মারধরের ঘটনায় আপ বিধায়ক আমানাতুল্লাহ খান ও প্রকাশ জারওয়ালকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলেছে দিল্লি পুলিশ।

পড়ুন: মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত CCTV ফুটেজে ব্যাপক গরমিল

শুধু তাই নয়৷ রাজ্যের চিফ সেক্রেটারিকে মারধরের ঘটনার প্রমাণ জোগাড় করতে দিল্লি পুলিশ CCTV ফুটেজের খোঁজে অভিযান চালায় মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতেও। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে এই ধরণের পুলিশি অভিযান দিল্লিতে প্রথম। কয়েকজন অফিসারের নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাড়িতে শুক্রবার যায় দিল্লি পুলিশের প্রায় ১৫০ জনের একটি দল। বাজেয়াপ্ত করা হয় ২১ টি CCTV ক্যামেরা৷

আমলা মহল থেকে অভিযোগ ওঠে, মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ শিশোদিয়ার উপস্থিতিতেই মুখ্যসচিব অংশু প্রকাশকে ঘরে ঢুকিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে৷ দিল্লিতে এই মূহুর্ত্বে আমলারা রীতিমত বিদ্রোহ শুরু করেছেন৷ আজ সোমবার দিল্লি আদালতে শুনানির পর আগামিকাল মঙ্গলবারও এই মামলার শুনানি হবে৷

পড়ুন: নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাসে কাঁপছে মানিকের ত্রিপুরা

ভারতীয় জনতা পার্টির দিল্লী শাখা, রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করার পক্ষে জোরদার সওয়াল করেছে৷ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এই ঘটনাকে ‘ব্রেকডাউন অফ গভর্নেন্স’ অর্থাৎ সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেছে৷ আর এটাকেই হাতিয়ার করেছে দিল্লি বিজেপি৷ যদিও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা এখনও দিল্লির এই ঘটনা নিয়ে একেবারেই চুপ৷ তাঁরা দেখছেন জল কোনদিকে গড়ায়৷

ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, রাজ্যপালের রিপোর্ট পেলে রাষ্ট্রপতি পারেন একটি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে৷ কোন রাজ্যে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হলে রাজ্যপাল রিপোর্ট পাঠান রাষ্ট্রপতিকে৷ বা রাষ্ট্রপতিও রিপোর্ট চাইতে পারেন রাজ্যপালের কাছে৷ দিল্লির ক্ষেত্রে লেফটেন্যান্ট গভর্ণর অনিল বাইজলের রিপোর্টের উপর নির্ভর করবে অনেক কিছুই৷ অনিল বাইজলের রিপোর্ট দেখে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার মত সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন রাজ্যপাল।

পড়ুন: শিশুদের জন্য আসছে ‘বাল আধার’, জেনে নিন খুঁটিনাটি তথ্য

মুখ্যসচিবকে মারধরের ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্যের আইএএস সংগঠন৷ ইতিমধ্যেই তাঁরা সংগঠনের তরফ থেকে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কে এই ঘটনা নিয়ে কড়া রিপোর্ট পাঠিয়েছেন৷ সেখানে তাঁরা এই শারীরিক নিগ্রহকে ‘Functional Crisis’ এবং ‘Breakdown of Governance’ বলেছেন৷ ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অফিসারস সংগঠনের তরফ থেকে কড়া রিপোর্ট পাঠান হয়েছে লেফটেন্যান্ট গভর্ণর অনিল বাইজলের কাছে৷

দিল্লি বিজেপির মুখপাত্র প্রভীন শংকর জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে বিজেপির তরফ থেকে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার আবেদন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালকে এখনই পদত্যাগপত্র দিতে বলার দাবিও তুলেছেন তাঁরা। যদিও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা এই ইস্যুতে একেবারেই চুপ।

পড়ুন: হিন্দুরা এক হও: মোহন ভাগবত

যদিও রাজধানীর সিনিয়ার আইনজীবীদের মতে, এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, ক্রিমিন্যাল অফেন্স। মুখ্যসচিবকে মারধরের ঘটনায় বিধায়কদের জেল হওয়া উচিত, রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবার মত কোন পরিস্থিতি হয়নি বলেই তাঁদের মত।

কিন্তু, ইতিমধ্যেই দিল্লিতে প্রশাসনিক সংকট চলছে। আমলারা আপ মন্ত্রী- বিধায়কদের সঙ্গে কোন বৈঠক করছেন না। কেজরিওয়াল সরকারের তরফ থেকেও আমলাদের সঙ্গে কোন বৈঠক করা হয় নি, এই সমস্যা মেটাতে।

সব মিলিয়ে দিল্লিতে আমলাদের মন্ত্রী বয়কট, সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করে কিনা সেটাই দেখার। তবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে কি হবে না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর অনিল বাইজলের রিপোর্টের উপর। রিপোর্ট পাওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি কি সিদ্ধান্ত নেন সেটাই এখন দেখার।