সুভাষ বৈদ্য, কলকাতা: মা, সিভিক ভলান্টিয়ার ছিলেন৷ খুন হয়ে গিয়েছেন৷ বাবা, ইঞ্জিনিয়ার৷ তবে, অসুস্থতার জেরে বেকার৷ এ দিকে, সুপারি কিলারদের দিয়ে মা-কে খুন বাবা-ই করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ৷

এই খুনের ঘটনায় ঠাকুমাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে৷ আর, এই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে তিন বছরের সন্তানের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, সেই বিষয়টি এখন প্রশ্নের সম্মুখীন৷

মহিলা এই সিভিক ভলান্টিয়ার শম্পা দাসকে খুনের ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে৷ সোমবার শম্পা দাসের স্বামী সুপ্রতিক দাস এবং শাশুড়ি মীরা দাসকে গ্রেফতার করা হয়৷ এ দিনই তাদেরকে দু’দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত৷

পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার দফায় দফায় জেরার পরে স্ত্রীকে খুনের কথা স্বীকার করে নিয়েছে সুপ্রতিক দাস৷ সুপারি কিলারদের দিয়ে এই খুন করানো হয়েছে বলেও স্বীকার করে নিয়েছে শম্পা দাসের স্বামী৷ খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মৃত এই মহিলা সিভিক ভলান্টিয়ারের শাশুড়ি মীরা দাসকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷

অন্যদিকে, সুপারি কিলার রশিত মোল্লা এবং তার দুই শাগরেদকে সোমবার গ্রেফতার করা হয়েছে৷ মঙ্গলবার এই তিনজনকে আদালতে পেশ করা হবে৷ সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি সদর অমিত পি জাভালগি জানান, মৃত শম্পা দাস (২৭)-কে তাঁর স্বামী সুপ্রতিম দাস সুপারি কিলার দিয়ে খুন করিয়েছে৷ তার জন্য সুপারি কিলারদের ৬০ হাজার টাকা দিয়েছিল সে৷ খুনের পাশাপাশি, সোনা সহ ঘরের মূল্যবান জিনিস নিয়ে যাওয়ার জন্য সুপারি কিলারদের সুপ্রতিম দাস বলেছিল৷ এই খুনের কিনারা পুলিশ মাত্র দু’ দিনেই করে ফেলল৷

গত শুক্রবার রাত ন’টা নাগাদ কৈখালিতে বাড়ির সিঁড়ি থেকে শম্পা দাসের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল৷ তাঁর দেহে ধারাল অস্ত্রের আঘাত ছিল৷ এবং, স্বামী সুপ্রতিম দাসকে ঘরের ভিতরে একটি চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল৷ তার দেহেও ধারাল অস্ত্রের আঘাত ছিল৷ সূত্রের খবর, ওই দিন পুলিশের নজরে আসে সুপ্রতিম দাস চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় থাকলেও, ওই বাঁধন অনেকটাই আলগা ছিল৷ তার শরীরের ক্ষত দেখেও পুলিশের সন্দেহ হয়েছিল৷ সুপ্রতিম দাস নিজেই তাঁর শরীরে আঘাত করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের মনে হয়েছিল৷

রবিবার সারা রাত ধরে মৃত মহিলা সিভিক ভলান্টিয়ারের স্বামীকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ৷ সূত্রের খবর, রবিবার গভীর রাতে স্ত্রীকে খুনের কথা স্বীকার করে নেয় সে৷ কেন খুন করল, সে বিষয়েও পুলিশকে সে জানিয়েছে৷ যার জেরে, সুপ্রতিম দাস এবং তার মা মীরা দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ এই খুন যে পরিকল্পনা মাফিক, তা আগেই প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করেছিল পুলিশ৷ সুপ্রতিম দাস স্বীকার করে নেওয়ায়, গোটা ঘটনা পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়৷

পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে স্পন্ডিলাইসিসে ভুগছে সুপ্রতিম দাস৷ চিকিৎসার অঙ্গ হিসাবে তার বাড়িতে মালিশ করাতে আসে উত্তর ২৪ পরগণার মিনাখাঁর বাসিন্দা রশিত মোল্লা৷ এই সুপারি কিলার বিধাননগর পুরনিগমে সাফাইকর্মী৷ মাস ছয় আগে রশিত মোল্লার সঙ্গে স্ত্রীকে খুনের পরিকল্পনা করে সুপ্রতিম দাস৷ ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন তার এলাকার অন্য দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে আসে রশিত মোল্লা৷ তাদের সঙ্গে ধারাল অস্ত্র ছিল৷ শম্পা দাস বাড়িতে ফেরার আগেই তারা পৌঁছে যায়৷

এ দিকে, ঘটনার দিন শম্পা দাস ইকো পার্কে ডিউটিতে ছিলেন৷ তাঁকে ফোন করে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলে সুপ্রতিম দাস৷ ডিউটি শেষ হওয়ার একটু আগেই বাড়ি ফেরার জন্য রওনা দিয়েছিলেন মৃত এই সিভিক ভলান্টিয়ার৷ অন্যদিকে, পরিকল্পনা মাফিক বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সুপ্রতিম দাসের মা, ছেলে ও পরিচারিকাকে৷ শম্পা দাস ফিরতেই তাঁকে প্রথমে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করে সুপারি কিলাররা৷ নৃশংসতার শেষ হয়নি তখনও৷ শম্পা দাসের মৃত্যু নিশ্চিত করতে, তাঁর শ্বাসরোধ করে দেয় সুপারি কিলাররা৷

মৃত এই সিভিক ভলান্টিয়ারের দাদা মিলন বিশ্বাস পুলিশকে এমনই জানিয়েছেন, শম্পা দাসের একটা সম্পত্তি রয়েছে৷ সেই সম্পত্তি নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকদের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই তাঁর ঝামেলা হত৷ অন্যদিকে, স্ত্রীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে, সুপ্রতিম দাসের এই দাবিও অস্বীকার করেছেন মিলন বিশ্বাস৷ তিনি এমনই জানিয়েছেন, তাঁর বোনের সঙ্গে কেউ এই ধরনের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন না৷ তবে, শেষ পর্যন্ত খুনের কথা স্বীকার করলেও, সুপ্রতিম দাস পুলিশকে এমনই জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই শম্পা দাস তাকে ও তার মাকে মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচার করছিলেন৷ এমনকী তার মায়ের নামে বাড়িটি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য শম্পা দাস চাপ সৃষ্টি করছিলেন বলেও জানিয়েছেন সুপ্রতিম দাস৷