এক লাথি৷ টাইপরাইটারটা ভেঙে দু’খণ্ড৷ ৬৫ বছরের বুড়োটা হাতজোড় করে সামনে দাঁড়িয়ে৷ ক্ষমা চাইছে৷ কাতর অনুনয় করছে যেন, ওটা ভেঙে না দেওয়া হয়৷ ওই তো ওর একমাত্র সম্বল৷ ৩৫ বছর ধরে নাকি ওটাকে আঁকড়েই দিন গুজরান করছে৷ তা কতটাকা আয় হয়? যতই হোক, লোকটা তো স্বাধীন৷ কারওর তোয়াক্কা করে চলতে হয় না৷ কারওর সামনে মাথা নোয়াতে হয় না৷ কাউকে কৈফিয়তও দিতে হয় না৷ কারও কাছে বিবেক বন্ধক রেখে অন্ধের মতো চাকরগিরি করতে হয় না৷ হতে পারে মোটে ৫০ টাকা আয়, কিন্তু এত স্বাধীনতা পাওয়ার ও কে হে! সুতরাং মারো এক লাথি৷ আরও দু’টুকরো হল টাইপরাইটারটির৷ হোক, হওয়াই উচিত৷ সামান্য একটা যন্ত্র সম্বল করে উনি এভাবে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেবে, আর গোটাএকচটা সংবিধান থাকতে, গায়ে খাকি উর্দি চাপিয়ে পুলিশকে দিনের পর দিন ‘জো হুজুর’ করে চলতে হবে তাওআবার হয় নাকি৷ অতএব মারো এক লাথি৷ হ্যাঁ, এবার যন্ত্রখানা ভেঙে খানখান৷ এবার যেন একটু শান্তি৷

আচ্ছা এবার কী হবে? নিশ্চয়ই এসব ছবি ইন্টারনেটের আপলোড হয়ে যাবে৷ মোবাইলে কয়েকজন যে ছবি তুলছিল তা তো আর নজর এড়ায়নি৷ সোশ্যল মিডিয়া উত্তাল হবে৷ মানবিকতা কলঙ্কিত হয়েছে বলে কাগজে কাগজে হেডলাইন হবে৷ সুন্দরী নায়িকা টুইটে নেমে পড়বেন মানবিকতা পুনরুদ্ধারে৷ বিজ্ঞ অভিনেতা রেগে যাবেন৷ আর অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যাঁরা রাস্তায় ছ্যারছ্যার করে পেচ্ছাপ করে, ফিক ফিক করে পানের পিক ফেলে দেশটাকে আস্তাকুঁড় বানিয়ে ফেলে, তারা সকলে মিলে ফেসবুকে নেমে পড়বে মানবিকতার হয়ে কুমীরের কান্না কাঁদতে৷ কেউ কেউ নিশ্চয়ই আবার তলিয়ে ভাবতে বসবেন, পুলিশ এমন করে কেন? দেশে, প্রদেশে, বিদেশের উদাহরণ টেনে টেনে কেউ দেখাতে থাকবেন পুলিশ কত নিষ্ঠুর৷ তাঁর শরীরে মানবিকতার কোনও কণিকামাত্রই নেই৷

krishna-kumar-and-policeনেই তো নেই৷ আচ্ছা পুলিশকে কেউ মান্য করেন নাকি? বুকে হাত দিয়ে ১০ জন লোকের ৮ জন বলুক তো দেখি পুলিশকে তারা মান্য করে৷ স্রেফ ভয় করে৷ ভয় করে কেননা, হাতে ডান্ডাটি আছে৷ ভয় করে কেননা আইন তাদের চোখ রাঙানোর ‘লাইসেন্স’টা দিয়েছে বলে৷ নইলে আর কে পাত্তা দিত৷ পুলিশ যদি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, দাদা এটা করবেন না, কেউ শুনত? মিনমিনে স্বরের পুলিশ অফিসারকে সিনেমার চিত্রনাট্য পর্যন্ত জায়গা দিতে পারে না, আর বাস্তব তো কোন ছাড়৷ নরম করে বলতে গেলে গরম হয়ে পাবলিকই পুলিশকে হিজড়া বানিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাততালি দেওয়াত৷ পুলিশ কি তাই দেখবে, আর আঙুল চুষবে? পুলিশ তাই চাক বা নাই চাক, নির্মম তাকে হতেই হবে৷ সঙ্গে কুত্তা থাকলে হাতে ডান্ডা নিতে হবে এটাই দস্তুর৷ এই যে ‘অসংখ্য’ বিবেকবান মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া শেম অন শেম অন করে ভাসিয়ে দিচ্ছেন তাঁরাই যখন আইন ভাঙেন, তাঁরাই যখন ঘুষ দেন, তখন কোথায় থাকে তাঁদের বিবেক বাছাধন৷ সব দোষ পুলিশের?

পুলিশ ভাল কাজ করলে নেতারা এসে টুঁটি চেপে ধরবেন৷ কেন করেছ, ন্যায়-অন্যায় বোঝবার পুলিশ কে হে? জনগণ যাঁকে নির্বাচিত করেছেন, তিনিই তো প্রভু৷ তিনি সব বোঝেন৷ তিনি জানেন কাকে ধরতে হবে, কাকে ছাড়তে হবে৷ তেনাদের একটা ফোনে যখন বিবেক টিবেক কৌটোয় পুরে রেখে পুলিশকে ক্রীতদাসের মতো কাজ করে যেতে হয়, তখন কোথায় থাকে এই ‘শেম অন’ বুলি? ‘রুটিন বদলি’ বলে একটা ব্যাপার চালু আছে৷ আসলে তো কথার কথা৷ কেউটের গর্তে হাত রেখেছ কি রাখনি, ঘেঁটি ধরে সরিয়ে দেবে পাণ্ডববর্জিত জায়গায়৷ সেখানে আমার ছেলেটা ভাল স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে না৷ পরিবারের পাঁচজনকে নূন্যতম সুখটুকুও দেওয়ার সুযোগ থাকবে না৷ সিনেমাতে তো এসব আকছার দেখে মানুষ, আর মুখে চুকচুক করে, উইকএন্ডে ঢুকঢুক মেরে মান ও হুঁশ সম্বলিত জানোয়ারের ধর্ম পালন করে৷ আসলে সুখেই থাকে৷ আর সব অশান্তি ভোগের দায় একা পুলিশের? তাও ভাল কাজ করলে৷ আরে আমাকে প্রতিনিয়ত মাথা নুইয়ে থাকতে হবে,আমার নিজস্ব লাইফ বলে কিছু থাকবে না, আর একটা ছাপোষা লোক নিজের মতো করে দিব্যি জীবন কাটাবে? আমাকে রোজরোজ বড়বাবুদের মুখঝামটা সহ্য করতে হবে, এর একটা লোক দিব্যি কৈফিয়তহীন বাতাসে নিশ্বাস নিয়ে একই পৃথিবীতে বাস করবে? আমাকে প্রতিদিন রগড়ানির জ্বালা সইতে হবে, আর আমি একটু এই দুনিয়াকে রগড়াতে পারব না? তা রগড়াব কাকে? ধোপদুরস্ত জীবনে যারা এ অন্যের বউয়ের সঙ্গে সোহাগ করে, দরকারে খুন করে টাকা দিয়ে আইনের মুখ বন্ধ করে দেয়, তাদের তো চাইলেও ছোঁয়া যায় না৷ যারা আমাদের বিবেককে রাস্তার কুকুরের সামনে খাবার করে তুলে দিয়েছে, আর করাপশনের কুকুর যখন তা চেটেপুটে তারিয়ে খেয়েছে, তখন তা দেখে হেসে খলখল করে করতালি দিয়েছে, তাদের তো ইচ্ছে করলেও ছাল ছাড়িয়ে নুন দেওয়া যায় না৷ অতএব যাদের ছোঁয়া যায়, রগড়ানিটা তাদেরই সইতে হবেই৷ এটাই দস্তুর৷ এই বুড়োটা সেই দলেই পড়ে গিয়েছে৷ টাইপরাইটারে লাথি পড়তে ওর হাতদুটো জড়ো হল কেন? জড়ো হওয়ার তো কথা ছিল না৷ কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস মানুষকে এইই শিখিয়েছে৷ সবলের কাছে হাতজোড় করতে হয়৷ প্রভাবশালীর কাছে নতিস্বীকার করতে হয়৷ আমরা আমাদের থেকেও প্রভাবশালীর চরণধূলায় মাথা নত করে থাকি৷ ইনি আমার কাছে হাতজোড় করছেন৷ আজ যারা সভ্যতার বড়াই করে,  এই তো মাত্র কয়েকশ বছর আগেও তারাই মানুষের উপর জানোয়ারের মতো অত্যাচার করেছে৷ তাহলে আর শুধু পুলিশ পুলিশ কেন বাপু! দুর্বলের প্রতি সবলের গায়ের ঝাল ঝাড়ার কথা কি ইতিহাসে লেখা নেই! ভুরি ভুরি আছে৷ ইতিহাস থাক, এখনও কি তার কোনও ব্যতিক্রম হয়েছে৷ আয়লান মৃতদেহ দেখে গোটা দুনিয়া কেঁদেছে, কই তাতে কিছু বদলেছে? থেমেছে যুদ্ধ?থিতু হয়েছে মানুষ? জঙ্গিরা কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে মানুষের মুন্ডু কাটছে, আর মানুষ সে সব কাটামুন্ডুর ভিডিও শেয়ার করে মানবিকতা ফলাচ্ছে৷ এমন মানবিকতা থাকা আর না থাকয় কীইবা ফারাক! বরং মানবিকতা শব্দটিরই গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসা উচিত৷


যারা আমাদের বিবেককে রাস্তার কুকুরের সামনে খাবার করে তুলে দিয়েছে, আর করাপশনের কুকুর যখন তা চেটেপুটে তারিয়ে খেয়েছে, তখন তা দেখে হেসে খলখল করে করতালি দিয়েছে, তাদের তো ইচ্ছে করলেও ছাল ছাড়িয়ে নুন দেওয়া যায় না৷ অতএব যাদের ছোঁয়া যায়, রগড়ানিটা তাদেরই সইতে হবেই৷ এটাই দস্তুর৷ এই বুড়োটা সেই দলেই পড়ে গিয়েছে৷


অনেকেই ছবি দেখে বলছেন, নরাধমের দৃষ্টিতে কোনও অনুতাপ নেই৷ থাকার কী কথা ছিল? কেউ কোনওদিন পুলিশকে রেয়াত করেছে? কেউ কোনওদিন তার বিবেকযন্ত্রণার খোঁজ নিয়েছে? ন্যাকা ন্যাকা কিছু সিনেমা বানিয়েছে এই যা৷ বাকি তো অষ্টপ্রহর বংশ তুলে গালিগালাজ করছে৷ চাইলে আমার নাতিও যেন বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মায় এমন কামনা করছে৷ কেননা পুলিশকে অপ্রিয় হলেও তার দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ এত অভিশাপ নিয়েও তো স্বাধীন নয়৷ সবার হাতে কাঠপুতুল হয়ে যে পুলিশকে থাকতে হবে, উপরতলার দাঁত কিড়মিড় আর নেতাদের দাবড়ানি সওয়াই যার নিয়তি, সে কী করে সইবে একটা বৃদ্ধের এমন স্বাধীন, সরল, কৌফিয়তহীন জীবন?police

এই সাফাইয়ের কোনও মানে নেই৷ জানি, শুয়োর কিংবা তারও অধম কোনও জীবের সন্তান হিসেবে আমাকে গালিগালাজা এতক্ষণে শুরু করে দিয়েছেন বিবেকবাণ জনগণ৷ তবু আমার লাথিতে টাইপরাইটারটা ভাঙল বলেই বহুদিন পর মানবিকতা শব্দটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে বসল ওই বাবুর দল, তণ্বী রূপসী নায়িকা, বিজ্ঞ অভিনেতা৷ ব্যক্তিসুখের গেলাসে আরও এক পেগ ঢালার আগে এই যারা আমার বুটপরা পা নিজেদের দামী স্মার্টফোনে দেখে থমকে গেলেন, এই যারা হঠাৎ জাগ্রত বিবেকে আমাকে খিস্তি দিতে শুরু করলেন, তাঁরা অন্তত এটুকু তো মানবেন, টাইপরাইটারটি ভাঙল বলেই আবার নতুন করে লেখা হল মানবিকতা শব্দটি৷ আত্মকেন্দ্রিকতার স্বচ্ছ নীল আলোয় যা ভেসে গিয়েছিল, বিলাশ ব্যসনের ফেনিল উচ্ছ্বাসে যা ভ্যানিস হয়েছিল, করাপশনের খনির বিষবাষ্পে যার অপমৃত্যু হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত,  সে তো আবার ফিরে এল৷ ভাঙা টাইপরাইটারই তো আবার নতুন করে লিখছে মানবিকতা শব্দটি, তবে মানবিকতা কেন পারল না ভাঙাচরা এই পৃথিবীটাকে মানুষের দুনিয়া করে তুলতে?

আমার লাথি আমি ফিরিয়ে নিতে পারব না, তবে হাঁটুগেড়ে বসে ওই বৃদ্ধের কাছে ক্ষমা চাইব, মাথা পেতে নেব সব শাস্তি, শুধু আপনারা কি পারবেন, আপনাদের তথাকথিত মানবিকতার জোরে এ সমাজের প্রভাবশালীদের হাতগুলো ভেঙে দিতে?  আপনাদের মানবিকতা কি পারবে, আমাদের পচে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে? নেতাদের বাগানবাড়িতে ফুঁসলে নিয়ে যাওয়া আমাদের বিবেককে নষ্টচরিত্র হওয়া থেকে পারবে কি বাঁচাতে? দেখবেন, আপনাদের শিষ্ট মানবিকতা ‘ফেল’ করে যেন আবার ‘পুলিশগিরি’ শুরু না করে৷