দুর্গাপুজোকে সার্বজনীন উৎসব বলা হয়। অর্থাৎ এই পুজো সকলের জন্য। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই পুজোকে সকলেই নিজের পুজো মনে করে। ছোটবেলায় আমার বেশ কিছু বছর কেটেছে গ্রামে। তাই গ্রামের পুজোর কথাই স্মৃতিতে প্রখর। আমদের গ্রামটা ছিল বেশ সম্পন্ন গ্রাম। গ্রামে মুসলিম পরিবারও ছিল। এই পুজোয় সব ধর্মের মানুষই সমান উপভোগ করত। মুখে বলা হত দুর্গা হিন্দুদের দেবী।

মীরাতুন নাহার, অধ্যাপক

পুজোর কয়েক দিন সবাই মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে যেত। হরেক রকম খাওয়াদাওয়া করত। এখন দশমী তিন-চারদিন ধরে হয়। আগে কিন্তু শুধুমাত্র একদিনেই ভাসান হত। আমাদের গ্রাম ছিল ইছামতীর একেবারে পাশে। ইছামতী নদীতে ভাসান দেখা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। নানা রকম মানুষ আসত। সেইসব মানুষের মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে থাকত। জনসমাগমে কোনও রকম বিভাজন ছিল না।

নদীর ধারে উঁচু বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে অনেকে ভাসান দেখত। এক জ্যাঠামশাইয়ের কথা মনে পড়ছে। তাঁকে আমরা অনাথবন্ধু জ্যাঠামশাই বলতাম। যখন খুব ছোট ছিলাম ওই জ্যেঠুর বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ইছামতীর ভাসান দেখতাম। ছোটরা খুব উদগ্রীব হয়ে থাকত, কবে পুজো আসবে! পুজো এলেই কত রকম খাওয়াদাওয়া হবে! কটকটি ভাজা, তেলেভাজা ইত্যাদি আরও সব মুখরোচক খাওয়াদাওয়া চলত দুর্গাপুজোকে ঘিরে।

পুজো উপলক্ষে কত কত দরিদ্র মানুষ হরেক রকমের দোকান দিত। পুজোর কয়েকটা দিন তাদের আয়-রোজগার হত। পুজোর ঘিরে হিন্দু কি মুসলমান সবাই আনন্দ উপভোগ করত। সত্যি কথা বলতে ইসলাম ধর্মে এত বড় উদযাপন মূলক উৎসব নেই। ইসলামের উৎসবগুলো সব নীরবে, গম্ভীরভাবে উদযাপিত হয়।

হিন্দু ধর্মের উৎসবগুলোর মধ্যে উদযাপনের বিশেষ ভঙ্গিমা থাকে। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা দুর্গা মূর্তিকে বিশেষ করে বিশ্লেষণ করে দেখত। মানে, মূর্তিটা কীভাবে গড়া হয়েছে, তার হাতগুলো কীভাবে সজ্জিত, মূর্তির সঙ্গে আর কী কী আছে– সেগুলো অত্যন্ত দৃষ্টিমূলক ভাবে দেখত। বিশেষ করে প্রতিমার ভাস্কর্য তাদের কাছে পরীক্ষা নিরীক্ষার বিষয় ছিল।

এর পরে বড় হলাম। আমার নিজের পরিবার হল। আমার স্বামী শখের ভাস্কর। উনি ছোটবেলা থেকেই মূর্তি গড়েছেন। তাই দুর্গা মূর্তিগুলো তিনি খুব খুতিয়ে দেখেন। এই দেখার মধ্যে একটা আবিষ্কারের আনন্দ খুঁজে পেতেন। আমার মেয়ের মধ্যেও এই নেশা ঢুকে পড়ে। মেয়ের মণ্ডপে যাওয়ার উদ্দেশ্যই হল মূর্তিটাকে ভাল করে দেখা। এতে ধর্মের ভিন্নত্ব ঘুচে যায়। আনন্দ পেতে কার না ভাল লাগে। সবাই আনন্দ পেতে চায়।

দুর্গাপুজোয় ধর্মের ভিন্নত্ব ভুলে সকলেই সামাজিক হয়ে ওঠে। মিলনের ক্ষেত্রভূমি দুর্গাপুজো। সবাই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি মতো দুর্গা প্রতিমাকে দেখে। এই উৎসব মানুষকে খুশি করে। মূর্তি গড়া থেকে শুরু করে প্রদর্শন, বিসর্জন, উৎসবের দিনগুলোতে কত ধরনের আয়-রোজগারের ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়। অনেকে হয়ত পুজোর আয় দিয়েই সারা বছর ধরে জীবন নির্বাহ করে। সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই ধরনের ব্যাপারগুলো মাথায় রেখেই উৎসব তৈরি করেছিল বিশেষজ্ঞ মানুষেরা। যার সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ভিন্নত্ব ভুলে যাওয়া, বিভেদ ভুলে যাওয়া, বহুত্বকে রূপ দেওয়া– সব কিছুই জড়িয়ে আছে।

তবে সত্যি কথা বলতে দুর্গাপুজোর সঙ্গে এখন আমার আর কোনও সংযোগ নেই। এখন আমরা শহরবাসী। শহরের কোলাহল আমার ভাল লাগে না। এই হুজুগেপনা, হুল্লোরপনা আর এক ধরনের কৃত্রিমতাও রয়েছে। কৃত্রিমতাকে আমি এখনও ভালবাসতে পারিনি। গ্রামে যতদিন থেকেছি ততদিন খুব ভাল লাগত। শহরজীবনে যবে থেকে এসেছি, পুজোকে ঘিরে, মূর্তিকে ঘিরে এত রেষারেষি যে আমার মনে হয় পালাই দূরে কোথাও!

একটা বিশুদ্ধ আনন্দের উৎস হতে যে উৎসব এসেছে তাকে বোধ হয় আমরা নষ্ট করে ফেলছি। বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, দলীয় এবং ধর্মীয় ইত্যাদি সংকীর্ণ স্বার্থে আমরা সকলের মনের আনন্দকে বিসর্জন দিচ্ছি। তাই আমি এখন এই উৎসব থেকে দূরে সরে থাকি।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.