অ-শিব যজ্ঞ
জয়ন্ত রায়

অ-শিব যজ্ঞায়োজন,- দক্ষ প্রজাপতি
সতী পিতা মর্ত্যধামে করিছেন আজি,
শিক্ষা দিতে ধূর্জটিরে,- কুটিল আক্রোশে।
ত্রিজগৎ আমন্ত্রিত; ব্রাত্য শিব-সতী।
বাজপেয়, বার্হস্পত্য – যজ্ঞ যুগপৎ;
হোতা যার ভৃগু ঋষি। রাজন্য দেবতা,
শচী সাথে দেবরাজ, গন্ধর্ব কিন্নরী,
উপবিষ্ট রত্নাসনে কৌতূহলভরে।
সূর্য সাথে পত্নী ছায়া সুস্মিত আনন,
সুযশ জামাতৃবর্গ, – ধর্ম ত্রয়োদশ,
অগ্নি সাথে পত্নী স্বাহা দম্ভে আত্মহারা।
অশ্বিনী, ভরনী আর কৃত্তিকাদি ভার্যা
সপ্তবিংশ,- পতি চন্দ্র, বৈভব মন্ডিত।
ভব, পুষা আরো শত মুনি ঋষি কন্ঠ
ঋক মন্ত্রে মুখরিত, প্রজ্বলিত হবি,-
জ্যোতিস্মান ধূম্রজাল,-সুগন্ধ শোভিত।
কৈলাসেতে শিবালয়ে বিমলা যোগিনী
আনমনা রজত অলকনন্দা তীরে,
বিল্ব-নিম্ব-হরিতকী, রুদ্রাক্ষ বাগিচা –
ধূস্তর, লোহিতজবা মেলিয়াছে শোভা।
ক্রীড়ারত পশুরাজ বৃষরাজ সনে
মত্ত,- অচল শিখরে। উপল সঙ্ঘাতে
নিনাদিত স্রোতধারা। সুখদ কৈলাস!
বীণার ঝংকার তুলি দেবর্ষি নারদ
সমাগত; দেবীপদে প্রণতি জানায়ে
দক্ষ গৃহে যজ্ঞ কথা নিবেদিল ধীরে।
হৈমবতী অপরূপা ছুটিলা সহসা
ক্ষণপ্রভা গতিসম ধ্যানমগ্ন যথা
চন্দ্রচূড় ব্রহ্মানন্দে, – নিমীলিত আঁখি;-
অমৃত গরল পানে সর্ব কামহর।
আদরিনী কন্যা সতী আমন্ত্রিত নহে
প্রজাপতি পিতৃগৃহে? প্রবোধিলা মনে –
কিবা প্রয়োজন ক্ষুদ্র প্রথা প্রকরণে!
শিথিল কবরীমূল,- বিল্বদল জবা,
রুদ্রাক্ষ মালিকা শোভে কন্ঠে, বাহুদ্বয়ে
বলয়, বল্কল দেহে; পশুরাজ পৃষ্ঠে
চলিলেন সতী দ্রুত; পশ্চাতে ছুটিছে
নন্দীকেশ্বর,- ত্রিশূল আঁকড়ি পাণিতে।
পিত্রালয়ে পশিলেন সতী; উদ্ভাসিল

চতুর্দিক, কান্তিচ্ছটা ঘোষিল বারতা।
জননী আসিলা ত্রস্তে; বক্ষেতে জড়ায়ে
আদরিনী তনয়ায় মধুর সম্ভাষে।
শক্তি মদে মত্ত পিতা জামাতা নিন্দায়
জ্বালামুখী লাভা সম বিঁধে আত্মজায়।
দাবানল জর্জরিতা, – লুটায়ে পড়িলা
সতী পিতৃ যজ্ঞাগারে – অসহ জ্বালায়।
কম্পিল কৈলাসধাম, জাগিল যোগীন্দ্র;-
শোকে ক্রোধে আত্মহৃত। সৃজিলেন জটা
হতে বীরভদ্র বীরে, – সাক্ষাৎ প্রলয়।
মাতিল তান্ডবে সে যে; যজ্ঞ নাশ করি
ছিন্নমুন্ড করিলেক দাম্ভিক যক্ষেরে।
চন্ডেশ, নন্দীকেশ্বর আদি অনুচর
মাতৃদেহ আঁকড়িয়া করে বিলাপন।
উত্তরিলা যজ্ঞেশ্বর ধরার ধুলিতে।
সযতনে বাহুডোরে চুম্বিয়া নিথরে
স্থাপিলেন নিজ স্কন্ধে শোকার্ত মহেশ।
বিশ্বময় শোক তাঁর সৃজিল সুন্দরে
পুনঃ বিষ্ণু চক্রজালে, এই ধরাধামে।

(নজরুলের লেখা –‘সতীহারা উদাসী ভৈরব কাঁদে’ গানটি আমাকে এই পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক
কবিতা লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। যদিও গানটিতে সতীর দেহত্যাগ আর শিবের মানসিক যন্ত্রণার
কথাই কয়েকটি লাইনে বলা হয়েছে। আমার কাহিনী শেষ নজরুলের শুরুতে। দেহত্যাগের পটভূমিকা
নিয়ে এই পৌরাণিক গাথাকাব্য লেখায় অমিত্রাক্ষর ছন্দকে গ্রহণ করেছি একটু দুঃসাহসী হয়েই।
আর, পুরাণ ভিত্তিক কাহিনী বলেই সংস্কৃত ঘেঁষা শব্দালংকার ব্যবহারেরও চেষ্টা করেছি। মতামত আপনাদের

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।