দেবময় ঘোষ: ভারতের সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্নে দেশ আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যাচ্ছে৷ প্রতিরক্ষার বিষয়গুলি কী আদৌ লোকসভা নির্বাচনের ইস্যু হতে পারে? মহাগুরুত্বপূর্ণ এবং ততোধিক গোপনীয় দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের ইস্যু বানিয়েছে মোদী সরকার৷ পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালিয়ে জঙ্গি নিকেশ করেছিল ভারতীয় সেনার বিশেষ দল৷ একই রকম স্ট্রাইক চালানো হয়েছে মায়ানমারেও৷

এরপর বালাকোটে বায়ুসেনার সার্জিকাল স্ট্রাইক৷ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সাফল্য এসেছে মহাকাশেও৷ ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এ-স্ট্যাস ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে কম গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট গুড়িয়ে দিয়ে সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে৷ কিন্তু প্রতিরক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলিকেই আবার মোদীকে ক্ষমতায় ফেরাবার অস্ত্র বানিয়েছে বিজেপি৷ অন্যদিকে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনাবেচা নিয়ে মোদী সরকারকে ‘চোর’ বলে ডাকছেন রাহুল গান্ধী৷ গোপনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি সারা বিশ্বের সামনে আনতে চাইছেন কংগ্রেস সভাপতি৷ আদালতে লড়াই না করে রাফাল যুদ্ধবিমান ইস্যুকে সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয় করে তুলে মোদীর মতো চৌকিদারকে তিনি চোর বলেছেন৷ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা কী ভোট রাজনীতির থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ? সমদোষে দুষ্ট মোদী-রাহুল৷

দেশের দুই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী – পি ভি নরসিমা রাও এবং অটলবিহারি বাজপেয়ীর কর্মপদ্ধতির নিরিখে নরেন্দ্র মোদীকে বিচার করার সময় এসেছে৷ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসিমা রাও৷ ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান মুখ ‘পিভিএনআর’দেশকে পরমানু শক্তিশালী করেছিলেন৷ কিন্তু দেশে সাধারণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে পরমাণু পরীক্ষা করেননি৷ ১৯৯৬ সালের মে মাসে পরমাণু পরীক্ষার পরিকল্পনা না করে দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়টি ভোট রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে চাননি নরসিমা৷ তবে আমেরিকার চোখরাঙানি এবং আন্তর্জাতিক চাপের বিষয়টিও মুখ্য হয়ে দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু নির্বাচনের আগে পাকিস্তানকে ভারতের সফল পরমাণু পরীক্ষার খবর উপহার দিলে তাঁর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীত্বের পথ সুগম হত৷ বাস্তব এই যে, ভোটে জিতে ফিরে আসেননি নরসিমা৷

পরমাণু পরীক্ষা করে দেশের জনতার কাছে যেমন ‘নায়ক’হওয়ার চেষ্টা করেননি নরসিমা, তেমনই সন্তর্পনে দায়িত্বটি সঁপে দিয়েছিলেন তাঁর উত্তরসুরি অটলবিহারি বাজপেয়ীর হাতে৷ তবে মনে রাখতে হবে তিনিও বাজপেয়ী … দেশের সেরা প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে একজন৷ অটল তাঁর সততা৷ পার্টি, ভোট রাজনীতিকে দেশের স্বার্থ থেকে শত যোজন দূরে রেখেছিলেন তিনি৷ ১৯৯৮ সালের ১১ মে পোখরান – ২ দেশের দ্বিতীয় পরমাণু পরীক্ষা হয় অটল সরকারের নেতৃত্বে৷ কিন্তু কৃতিত্ব নিতে অস্বীকার করেন অটল৷ সাফ জানান, কৃতিত্ব প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের৷ সারা বিশ্বের নজর এড়িয়ে তিনি শুধু সফল পরমাণু পরীক্ষা করেছেন মাত্র৷

প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারির মুখ থেকে এই শব্দগুলি বেরিয়েছিল সেই সময় যখন তার সরকারকে ১৩ দিনের মধ্যেই ক্ষমতা থেকে সরে আসতে হয়েছিল৷ সংসদ দেখিয়েছিল অনাস্থা৷ ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ – দেশ দুইজন প্রধানমন্ত্রী এবং দুটি সাধারণ নির্বাচন দেখেছে৷ ১৯৯৮ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা পায় অটল সরকার৷ ওই বছরেরই ১১ এবং ১৩ মে ভারত ৬টি পরমাণু বোমা পরীক্ষা করে চমকে দেয় সার বিশ্বকে৷ ১৯৭৪ সালে পোখরানে প্রথম পরমাণু পরীক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সারা দেশকে ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’উপহার দিয়েছিলেন৷ ২৪ বছর পর পরমাণু পরীক্ষা করে অটল উরহার দিলেন ‘বুদ্ধ স্মাইলস্ এগেন৷’

নরসিমা রাওয়ের জীবনী ‘হাফ লায়ন’ লিখেছেন বিনয় সেনাপতি৷ ওই বইতে একটি পরিচ্ছদ রয়েছে – ‘‘গোয়িং নিউক্লিয়ার৷’’সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-এ নিজের লেখা নিবন্ধে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনার এম শ্রীধর আচারিউলু বিনয় সেনাপতির লেখা ‘হাফ লায়ন’বইটির ওই বিশেষ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছেন৷ ৭৪-এ ইন্দিরা ‘নিউক্লিয়ার ফিসন ডিভাইসে’র সফল পরীক্ষা করেন, কিন্তু তা ভারতের পরমাণু ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ করতে পারেনি৷ কারণ পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করার ক্ষেপণাস্ত্র বা‘নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ক্যারিং মিসাইল’এবং যুদ্ধবিমান ভারতের হাতে ছিল না৷

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছিল, পাকিস্তান চিনের সাহায্যে ১০টি পারমানবিক বোমা বানাচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে চাপ বাড়তে থাকে ভারত সরকারের উপর৷ চাপ দ্বিগুন হয় যখন আমেরিকা সহ বিশ্বের তৎকালীন শক্তিশালীদেশগুলি ভারতকে নন-প্রলিফিরেশন-ট্রিটি বা পরমাণু অস্ত্র বিরোধী চুক্তি সাক্ষর করতে চাপ দিতে থাকে৷ অস্ত্র পরীক্ষা করলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ত, সেই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন নরসিমা৷ বিরোধী বিজেপি তাঁকে বারবার অস্ত্র পরীক্ষা করতে চাপ দিতে থাকে – কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে বিস্তর আলোচনা করেও পরমাণু পরীক্ষার পথে হাঁটেননি নরসিমা৷ যদি হাঁটতেন তবে নির্বাচনে জয় তাঁর নিশ্চিত ছিল৷

তাঁর জীবনীতে বিনয় সেনাপতি লিখেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীকে ভয়ঙ্কর এবং সান্তনাদায়ক হতে হবে৷ তাঁকে অর্ধ সিংহের (হাফ লায়ন) মতো হতে হবে৷’’ ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত পৃথ্বী-১ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে৷ কূটনীতিবিদ রণেন সেন নিজের লেখায় লিখেছিলেন, ওইদিনই ভারত পরমাণুক্ষমতা সম্পন্ন হয়েছিল৷ ওই মিসাইল ইসলামাবাদ সহ পাকিস্তানের প্রতিটি শহরকে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতে ক্ষমতাসম্পন্ন৷ ১৯৯৪ সালে ভারত অগ্নী মিসাইলের সফল উৎক্ষেপন করে৷ যা চিনের বিস্তীর্ণ অংশে আঘাত হানতে প্রস্তুত৷ ১৯৯৪ সালেই ফরাসী মিরাজ-২০০০ বিমান পায় ভারত৷ এই মিরাজ বিমানই কামাল দেখিয়েছে বালাকোটের এয়ারস্ট্রাইকে৷ নরসিমা কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই বিষয়গুলিকে ভোটে জেতার জন্য প্রচারের মুখ করতে চাননি৷ রাজনীতির স্বার্থে দেশের নিরাপত্তাকে ভোটের ইস্যু বানাতে চাননি৷ পাশে পেয়েছিলেন অটলবিহারিকেও৷ নরেন্দ্র মোদী-রাহুল গান্ধী কী শুনছেন?