খানিক আগে সকলকে পোশাক খুলে ফেলতে বলা হয়েছে, মায় অন্তর্বাসটি পর্যন্ত। সমুদ্রের মাঝে নিশ্ছিদ্র কারাগারের একটি প্রকোষ্ঠে, দেওয়ালের সামনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা। বাইরে বয়ে যাওয়া বরফ শীতল বাতাসে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা নাকি কারাগারের শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছেন। তাঁদের শিক্ষা দেওয়ার জন্যই এই শাস্তিবিধান। এই সব দণ্ডিত যুবকদের অপরাধ ছিল একটাই।

সাংবাদিক- গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

তাঁরা জানিয়ে দিয়েছিলেন সারা দেশে যে বর্ণবিদ্বেষী সরকার চলছে তার আইন তাঁরা মানেন না। দণ্ডিত অপরাধীদের মধ্যে ৪৬৬ তম অপরাধী নিজর দেশের মানুষের কাছে পরিচিত মাডিবা নামে। তবে আমাদের কাছে তাঁর পরিচয়, নেলসন ম্যান্ডেলা।

রিভোনিয়া মামলায় ম্যান্ডেলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হওয়ার পর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রবেন দ্বীপে। আগে পিছে সবশুদ্ধ তাঁর কারাবাসের মেয়াদ সাতাশ বছর। সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ এবং পরিণামে তাঁর ওপর নেমে আসা শাস্তির খাঁড়ার কথা আমরা অনেকেই জানি। এই অবসরে একবার মনে করার চেষ্টা করি রিভোনিয়া মামলা চলাকালীন কী বলেছিলেন ম্যান্ডেলা এবং কী অবস্থান নিয়েছিলেন।

নেলসন ম্যান্ডেলাকে জিজ্ঞাসা করলেন বিচারক, তাঁর বিরুদ্ধে আনা দেশদ্রোহিতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁর কিছু বলার আছে কিনা। ম্যান্ডেলা বললেন: আমাকে নয় সরকারকে কাঠগড়ায় তোলা উচিত কারণ অন্যায়টা তারাই করছে। তিনি আর যা যা বলে ছিলেন সেদিন তা শুনে বর্ণবৈষম্যদুষ্ট দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার প্রমাদ গণেছিল। তিনি বলেছিলেন: আমার জীবন আমি আফ্রিকার মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি।

তিনি বললেন: আমি শ্বেতাঙ্গদের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, আমি কৃষ্ণাঙ্গদের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমি এমন একটা গণতান্ত্রিক এবং মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা চেয়েছি যেখানে সমস্ত মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে বাস করতে পারবে যেখানে প্রতিটি মানুষের থাকবে সমান অধিকার। প্রয়োজনে এই আদর্শের জন্য আমি প্রাণ দিতেও পিছপা নই। আর একটি বিষয় তিনি সেদিনের দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি যেহেতু মনে করেন না, তিনি অন্যায় কাজ করছেন অতএব তিনি আদালতে শাস্তি মকুবের আবেদন জানাবেন না। শেষ পর্যন্ত আবেদন জানাননি। শাস্তি ভোগ করেছেন। জেলখানায় মাঝে মাঝে ম্যান্ডেলা এবং তাঁদের সঙ্গীদের গোপন আলোচনায় প্রসঙ্গত উঠে আসত আর একজনের নাম। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।

জেলখানার অভ্যন্তরে সাদাদের আধিপত্য আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে গান্ধীর পথে একাধিকবার অনশন চালিয়েছেন ম্যান্ডেলা এবং তাঁর পরামর্শে অন্য কয়েদিরা। একটি এবং একটি মাত্র মূল দাবি ছিল মাডিবার। চাই গণতান্ত্রিক সরকার যারা এক অবাধ সমাজের প্রবর্তন করবে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এ কথাই বলে গিয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক সরকার গঠনপর্বে যা বললেন তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: আমি জানি অত্যাচারিতের সঙ্গে অত্যাচারীরও মুক্তির প্রয়োজন আছে। যে মানুষ অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেয় সে নিজেও ঘৃণার হাতে বন্দি।

আত্মজীবনীতে লিখেছেন: he is locked behind the bars of prejudice and narrow mindedness. গান্ধীও তো এই কথাই বলেছিলেন। বর্ণবৈষম্যের পরিবর্তে তিনি বলেছিলেন জাতিবিদ্বেষের কথা। উভয়েই অন্তরের ঘৃণার দাসত্বের হাত থেকে মুক্তির কথা বলেছিলেন। সেখানে বর্ণবিদ্বেষী সরকারের পরিবর্তন হয়েছে যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যে একদিন দাসপ্রথার অবসান হয়েছিল। তবু ঘৃণার সাম্রাজ্য শেষ হয়নি। সারা বিশ্বে বিভিন্ন আকারে তা ফিরে ফিরে এসেছে বারবার।

আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু সে কথাই আমাদের ফের মনে পড়াল। আজ এই দুর্দিনে ট্রাম্প সাহেবের কি মনে পড়ছে যে তাঁর দেশে এই ঘৃণার অন্যতম সঙ্গী দাসপ্রথার উচ্ছেদ করতে গিয়ে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন এক প্রেসিডেন্ট? আর এই সঙ্গে কি আমাদের মোদী সরকারের এ কথা মনে পড়ল যে ভারত নামের শান্তি এবং সুললিত বাণীর এক দেশ গড়ার সময় কোনও এক প্রধানমন্ত্রী দেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার শপথ করেছিলেন, এবং তাঁর নির্দেশিত পথে হেঁটেই ভারত সারা বিশ্বে দেখিয়েছিল পাকিস্তানের থেকে আমাদের পথ পৃথক বলেই আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকার অর্জন করেছিলাম? সম্ভবত না।

কেউই কোনও কথা মনে রাখে না। মনে রাখেনি। এই দুই আপাত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই এখন বিদ্বেষের বিষবাষ্পে জর্জরিত। শ্বেতাঙ্গই হোক বা হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিদ্বেষের যে মন্ত্র তারা দিবারাত্র জপে চলেছে তা মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চালিত করবে না। মৃত্যুর পথে নিয়ে যাবে। ট্রাম্প সাহেব টের পাচ্ছেন: শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর। এবার হিন্দুত্ববাদী সরকারকে বুঝতে হবে: বোঝা তোর ভারী হলেই ডুববে তরীখান।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

Tree-bute: রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও