স্টাফ রিপোর্টার, মেদিনীপুর: মা-বাবার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে বিয়ের সমস্ত প্রথার সঙ্গে এক সমাজসেবার কাজও করল শালবনির মধুপুর গ্রামের সমীর দেবসিংহ। এমনিতে কুড়মী সমাজে বিয়ের দিন আগে আমগাছ ও মহুল গাছের সঙ্গে বিয়ে দিতে হয় ছেলে-মেয়েদের। তারপর তাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে নতুন বধূকে বাড়িতে নিয়ে এলেন বছর পঁচিশের যুবক সমীর দেব সিংহ।

এলাকাবাসীর থেকে জানা গিয়েছে, মধুপুর ও মেমুল গ্রামের মধ্যবর্তী প্রায় ৫০০ মিটার মতো অংশটুকুতে রাস্তার দু’পাশে প্রায় দু’শোর মতো গাছ লাগানো হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে কেন এই বৃক্ষরোপণ উৎসব? সেই উত্তরে সমীর বলেন, ‘‘আমি নিছক বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ স্ফুর্তি করতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম কিছু না কিছু সামাজিক কাজ করতে। রক্তদান শিবির করারও ইচ্ছে ছিল৷ বিভিন্ন কারণে যদিও সেটা সম্ভব হয়নি। আসলে আমি চাই, আমরা জঙ্গল মহলের মানুষ, জঙ্গলের গাছ আমাদের অন্নদাতা৷ তারাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে৷ আর এই জঙ্গল কে বড়ো করে বাঁচিয়ে রাখাও একটা সামাজিক কাজ৷ এই কাজের মধ্যেই আমার বাবা-মা বেঁচে থাক। সব কাজ আমার বাবা-মায়ের স্মৃতির উদ্দেশেই নিবেদন করেছি আমি৷’’

এই প্রসঙ্গে গ্রামবাসী পলাশ দেব সিংহ জানান, সমীরের বাবা স্বপন দেব সিংহ জঙ্গল মহলের অশান্ত পরিস্থিতিতে মাওবাদীদের হাতে খুন হন। সমীর তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। পরের বছর তার মা অণিমাকেও অপহরণ করে মাওবাদীরা। অণিমাকে আর পাওয়াও যায়নি। পরবর্তীকালে সমীর দক্ষিণ-পূর্ব রেলে চাকরি পান। সমীর বলেন, ‘‘এই গাছগুলোর মধ্যেই আমার বাবা-মা বেঁচে থাকুক।’’

ঝাড়গ্রামের বাঁকশোল থেকে সদ্য বধূ হয়ে আসা বছর উনিশের দীপিকা বলেন, ‘‘আমাদের বিয়েটা সুন্দর একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় আমার বেশ ভালো লাগছে।” সমীরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান গ্রামবাসী ও নিমন্ত্রিতেরাও। গ্রামবাসীরা জানান, তাঁরাই এই গাছগুলোর দেখ ভাল করবেন। আজকের এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমীর নতুন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এ ভাবে সবাই এগিয়ে এলে পরিবেশও বাঁচবে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের বিশিষ্ট পরিবেশ কর্মী রাকেশ সিংহ দেব বলেন, ‘‘মানুষ আজ সচেতন হয়েছে। উৎসব অনুষ্ঠানে থার্মোকল, প্লাস্টিক বর্জন করছে। এটা খুব আনন্দের। সমীরবাবুর এই মহৎ প্রচেষ্টা সবাই অনুসরণ করলে পরিবেশের পক্ষে তা অত্যন্ত হিতকর হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে বড়ো উপহার আর কী-ই বা হতে পারে!’’