কলকাতা: প্ল্যানচেট নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। এর সত্যাসত্য যাচাই হোক বা না হোক লোড শেডিং-এর সন্ধেয় বাঙালির ভূতের গল্পের আড্ডায় একটা প্ল্যানচেটের ঘটনা উঠে আসবেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্ল্যানচেট চর্চার পরিধিও ছিল বিরাট।

এমনকী তিনি মিডিয়াম নিয়ে বসে একবার নাকি সুকুমার রায়ের দেখাও পেয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও নাকি তাঁর মৃতা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতেও উঠে এসেছে প্ল্যানচেট প্রসঙ্গ।

বাঙালির ভৌতিক চর্চা ও সাহিত্যে প্ল্যানচেট একটি বহুল আলোচিত বিষয়। আর তাই বৈঠকী আড্ডায়ও গোজামিল হলেও প্ল্যানচেটের উল্লেখ আসেই। তবে এর সত্যতা নিয়ে তর্ক তো রয়েছেই। হুতোম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রেতচর্চাকে বুজরুকি বলেছিলেন। বিশ্বাসে বস্তু মিলায় কি না তা প্রশ্নাতীত এক্ষেত্রে। তবে এই নিয়ে বাঙালির তর্ক ও আলোচনা যে অনেক দূর তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

বিদেশে খুব নিয়মমাফিক ভাবে প্রেতচর্চা হয়ে আসছে বহু প্রাচীন যুগ থেকেই। ইউরোপে এই চর্চা শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায়ও এই প্ল্যানচেট বা প্রেত-আলাপ শুরু হয়। ১৮৬৩ সালে প্রথম প্রেতচক্র অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর উদ্যোক্তা ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। স্ত্রীর মৃত্যুই তাঁর প্রেতচর্চার অন্যতম কারণ।

ঠাকুরবাড়িতেও প্ল্যানচেটের চল ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদনা করতেন একটি মাসিক bindranathTagoreaপত্রিকার। তার নাম ছিল ভারতী। কিন্তু এরই মধ্যে স্বর্ণকুমারীর স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল মারা যান। তখন পত্রিকার কাজ থেকে দূরে সরে যেতে চান স্বর্ণকুমারী। কী হবে এই পত্রিকার!

তখন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে প্রেতবৈঠক বসে। সেখানে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ডাকলেন জানকীনাথের আত্মাকে। জানা যায়, জানকীনাথ জানান, এই পত্রিকার দায়িত্ব নেবে মণিলাল ও সৌরিন্দ্রনাথ। সেই কথা পরে মিলেও যায়।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রেতচর্চা নিয়ে এমন বহু কিছু জানা যায়। রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের পৌত্রবধূ অমিতা ঠাকুর। অমিতার নাকি বেশ কয়েকবার অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একবার রাতে সন্তানকে নিয়ে শুয়েছেন। রাত তখন বারোটা। এমন সময়ে শোনেন পিছনে সিঁড়ি দিয়ে কে নামছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর স্বামী। পরে জানতে পারেন তাঁর ধারণা ভুল।

এর পরেও সেই সিঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েকবার ভারী পায়ের ওঠানামার শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দ খুব ভয় পেতেন। তার পরে আর কখনও চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করেননি। ওই শব্দ নাকি আরও অনেকেই শুনেছিলেন। অনেকে মনে করেন দ্বিজেন্দ্রনাথের ছোট ছেলে নীতিন্দ্রনাথ আসতেন। লম্বা চওড়া এই পুরুষের অল্প বয়সে মৃত্যু হয়। তাই অনেকে মনে করতেন তিনি আসতেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেতচর্চা ও প্ল্যানচেট সর্বজনবিদিত। ১৯৪৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরে তাঁর আত্মার সঙ্গেও এক সময়ে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল ভট্টাচার্য। অর্থাৎ বোঝাই যায় যে বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য, চর্চার মধ্যে প্রেতচর্চা ও প্ল্যানচেট অন্যতম।

সপ্তম পর্বের দশভূজা লুভা নাহিদ চৌধুরী।