দেবময় ঘোষ, কলকাতা: জাতির জনক কে? ভারতের আম জনতার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে যে ব্যক্তির নাম উঠে আসে তিনি হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ৷ জাতির জনক হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হিসেবে কেউ কখনও প্রশ্ন ওঠায়নি ৷ কিন্তু গান্ধীর মৃত্যুর ৭০ বছর পর এই প্রশ্ন উঠেছে খাস কলকাতায়৷ কলকাতা হাইকোর্টে ৷

বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা হয়েছে ৷ মামলায় বলা হয়েছে, মহত্মা গান্ধী জাতির জনক নন ৷ ভারতীয় সংবিধানে কোনও ব্যক্তিকেই এই উপাধি দেওয়া যাবে না ৷ কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে জাতির জনকের উপাধি দিচ্ছে ৷ যা উচিত নয় ৷

হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কক্ষে মামলা দাখিল করা হয়েছে ৷ শুক্রবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হবে ৷ কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অনিন্দ্যসুন্দর দাস বলেন, ‘‘জনস্বার্থ মামলাটি করেছেন সমাজসেবী কল্যাণ কুমার চক্রবর্তী ৷

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও একজন ব্যক্তিকে কীভাবে জাতির জনক বলা যেতে পারে ৷ ভারতীয় সংবিধানের সেকশন-১ এর ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ভারতীয় নাগরিককে উপাধি দেওয়া যাবে না ৷ সংবিধান তার অনুমতি দেয় না৷ কিন্তু, স্কুলে শিশুদের শেখানো হচ্ছে, মহত্মা গান্ধী জাতির জনক৷! কে বলল?’’

অনিন্দ্যবাবুর বক্তব্য, ‘‘মহত্মা গান্ধীর জন্মদিনে বিভিন্ন সংবাদপত্রে রাজ্য সরকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে ৷ সেখানে তাঁকে জাতির জনক হিসেবে ফল্লেখ করা হয়েছে ৷ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও সেটিই শিখছে ৷ কিন্তু এটি সংবিধান সম্মত নয় ৷’’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর দফতরও কিছুদিন আগে অভ্যন্তরীন তদন্তে পেয়েছে, মহত্মা গান্ধীকে জাতির জনক উপাধি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনও সরকারি কাগজপত্র বা দলিল নেই ৷ দেশের জাতীয় সংরক্ষণারার তথাপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রও পিএমও-কে জানিয়ে দেয়, গান্ধী যে জাতির জনক সে ব্যাপারে কোনও সরকারি তথ্য তাদের কাছে নেই৷

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে লক্ষ্ণৌয়ের এক ছোট্ট মেয়ে ঐশ্বর্যা পরাশর কেন্দ্রে কাছে আরটিআই (তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত আইনের বলে) করে জানতে চায়, মহত্মা গান্ধীকে কে এবং কবে জাতির জনক উপাধি দিয়েছিলেন? ওই একরত্তির প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পিএমও জানতে পারে – এমন কোনও সরকারি কাগজপত্র বা দলিল নেই যা সরকারিস্তরে প্রমাণ মহত্মা গান্ধী জাতির জনক ৷ এরপর পিএমও ওই ছোট্ট মেয়েটিকে জানিয়ে দেয় – শিক্ষা এবং সামরিক ক্ষেত্র ছাড়া ভারতে কাউকে উপাধি দেওয়া সংবিধানসম্মত নয়৷ কাজেই মহত্মা গান্ধীকে সরকারি ভাবে ‘আপাতত’জাতিরজনক উপাধি দেওয়া যাবে না ৷

প্রশ্ন উঠে আসে, তাহলে মহত্মা গান্ধী জাতীর জনক হলেন কী ভেবে ? নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৪৪ সালের ৬ জুলাই সিঙ্গাপুর রেডিও থেকে দেওয়া একটি ভাষণে গান্ধীজীকে – ‘জাতির জনক’হিসাবে উল্লেখ করেন ৷ এর তিন বছর পর, ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল সরোজিনি নাইড়ু গান্ধীকে ‘জাতির জনক’হলেন ৷ তারপর থেকেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হয়ে ওঠেন ‘জাতির জনক ৷’

বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে যে মামলা দাখিল করা হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই জাতিকে সঠিক তথ্য সম্পর্কে অবহিত করা ৷ কেউ ভালোবেশে বা সম্মান জানিয়ে গান্ধীকে জাতির জনক বলতেই পারেন ৷ তাতে কারও কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়৷ কিন্তু রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের সরকারিস্তরে সেই কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত ৷ কল্যাণ কুমার চক্রবর্তীর আইনজীবী অন্তত সেকথাই বলছেন ৷