বাসুদেব ঘোষ, জয়দেব: অজয় নদের তীরে জয়দেব মেলা উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে ছুটে এসেছেন৷মকর সংক্রান্তিতে এই মেলার গুরুত্ব যতটা ঐতিহ্যের বিচারে, ঠিক ততটাই গুরুত্ব ধার্মিকতার আঙ্গিকেও।

মকর সংক্রান্তিতে রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে। মকর সংক্রান্তির সেই ভোরে মানুষের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় মেলা কমিটি থেকে প্রশাসন সকলকেই। উপচে পড়া ভিড় মকর সংক্রান্তির আগের সন্ধ্যা থেকেই চোখে পড়ে অজয়ের তীরে।

আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বাউল আখড়া, হরিনাম কীর্তনে মুখরিত হয়ে ওঠে অজয়ের ঘাট৷ মকর সংক্রান্তিতে জয়দেবে মানুষ ভিড় জমান পুণ্য স্নানের জন্য৷ যদিও এই মেলা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কেন্দ্র করেই এবং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে অবলম্বন করেই অনুষ্ঠিত হয়, তবুও বাউল আখড়ার মিশ্রণে এই মেলা মিলন ক্ষেত্রের রূপ নেয়৷ কোথাও এটি জয়দেব মেলা, কারোর কারোর কাছে আবার বাউল মেলা নামেও পরিচিত।

মঙ্গলবার সকালে মকর স্নান থেকেই মেলা শুরু৷ তিনদিন চলবে মেলা, আজ থেকে মহা মিলন উৎসব জয়দেব ধামে। দূর দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা চারদিন আশ্রমে আশ্রমে কাটান, এছাড়া বাউল, লোকগীতি, হরিনাম কীর্তন গান তো থাকেই। সব মিলিয়ে তিন দিন তিন রাত জমজমাট হয়ে উঠে মেলা।

এই মেলায় পূণ্যার্থীদের ভিড়ের সাথে সাথে থাকে অজস্র ভিক্ষুকদের ভিড়ও দেখা যায়৷ তারাও আসেন কিছু রোজকারের আশায়। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে জয়দেব কেন্দুলি মেলাকে নির্মল মেলাতে পরিণত করতে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে অস্থায়ী শৌচাগার বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ মেলাকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রচুর সাদা পোষাকের পুলিশ সহ সিভিক ভলেনটিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে৷

অপ্রীতিকর ঘটনার সামাল দিতে রাখা হয়েছে বিশেষ উদ্ধারকারী দলও৷ বসানো হয়েছে একাধিক ওয়াচ টাওয়ার, খোলা হয়েছে একাধিক পুলিশ কন্ট্রোল রুম।

ইতিহাস বলে, প্রতি মকর সংক্রান্তিতে পুণ্যস্নানের জন্য কাটোয়ার গঙ্গায় যেতেন কবি জয়দেব৷ কিন্তু একবার মকর সংক্রান্তিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি৷ অসুস্থতা এতটাই বেশি ছিল যে সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাটোয়ায় যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তখন তিনি রাতে স্বপ্ন দেখেন তাঁর জন্য মা গঙ্গা উজান বেয়ে অজয় নদে এসে মিলিত হবেন। তাই অজয় নদে স্নান করলেই গঙ্গাস্নানের ফল পান কবি জয়দেব। সেই থেকেই মকর সংক্রান্তিতে কেন্দুলির মেলাকে কবি জয়দেবের স্মৃতি জড়িয়ে রেখেছে৷

বীরভূম ও বর্ধমান জেলার মধ্যবর্তী বরাবর বয়ে চলেছে অজয় নদ, তার ধারে কেন্দুলি গ্রাম। কথিত আছে, রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি জয়দেবের বাড়ি ছিল এখানেই। যদিও অনেকের মতে জয়দেবের আদি নিবাস ছিল ওড়িশায়। রাধাবিনোদ মন্দির সহ কেন্দুলিতে জয়দেবের স্মৃতিধন্য বহু দ্রষ্টব্য থাকলেও কেন্দুলির বড় পরিচয় পৌষ সংক্রান্তির মেলা, যাকে কেন্দ্র করে কেন্দুলির কথা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে।

প্রাচীনত্ব ও জনপ্রিয়তার নিরিখে দেখলে এই জয়দেব মেলা আজও দেশের অন্যতম প্রধান মেলা হিসেবে পরিগণিত হয়। কেন্দুলির জয়দেবের মেলার গুরুত্ব এখানেই যে, এই মেলাই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র মেলা, যেখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের এক বিচিত্র সমাবেশ ঘটে। বিশেষত সমাজের বিদ্বজ্জনের উপস্থিতি এখানে লক্ষ্য করার মতো।

মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয় অসংখ্যা পত্রপত্রিকা, কবিতা পাঠ, সাহিত্য আলোচনার সভাও থাকে চোখে পড়ার মত। পাশাপাশি কীর্তন ও বাউল গানের আকর্ষণে ছুটে আসা হাজার হাজার মানুষ সারা রাত জেগে কাটান আখড়ায় আখড়ায়। সব মিলিয়ে শীতের সকালে জমজমাট বীরভূমের জয়দেব কেন্দুলির মেলা৷