নন্দিতা আচার্য

পরিচালনায় ইন্দ্রাশিস আচার্য।
গল্প এবং স্ক্রিপ্ট রচনা- ইন্দ্রাশিস আচার্য।
অভিনয়ে শাশ্বত, ঋতুপর্ণা, শ্রীলা মজুমদার। মিউজিক জয় সরকার।

প্রতিটা জীবনের ভেতর থাকে এক গহীন জীবন। তার আলো আঁধারির আকেবাঁকে রয়ে যায় কিছু টুকরো জীবন; স্নেহ প্রেম হিংসা অবদমন। আর সেগুলোই যখন রঙিন মোড়কের উন্মোচন ছিন্ন করে বাইরের জগতে উঁকি মারে; আমরা তখন হয়তো বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় ঘুরে মরি।

ইন্দ্রাশিস গল্প শুরু করেছে, জন্মদিন সেলিব্রেশন এবং তাতে সারপ্রাইজড গিফট হিসেবে এক পার্সেল আসা নিয়ে। আর এই পার্সেলের পাকে পাকেই আবর্তিত হতে থাকে গল্প। ২৫তম চলচ্চিত্র উৎসবের ষষ্ঠ দিনে, নন্দন টু-তে দেখানো হল এ ছবি। হলের ভেতরে থিকথিকে ভিড়। মেঝেতেও পা রাখার জায়গা নেই। আর তার তিনগুণ ভিড় বাইরে। বাংলা ছবি দেখার জন্য এরকম মারকাটারি জনস্রোত শুধু আনন্দই দেয় না, বিস্মিতও করে। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়কেও দেখা গেল মাটিতে পা গুটিয়ে বসে সিনেমা দেখতে।

পর্দায় সৌভিক এবং নন্দিনী, শাশ্বত ও ঋতুপর্ণা দু’জনেই ডাক্তার। সৌভিক অতি ব্যস্ত। সারাদিনই কাটে হসপিটাল, আইসিইউ, চেম্বারে। নন্দিনীকে কিন্তু দেখা যায় ঘরে থাকতে। গল্প এগোলে বুঝতে পারি, মেডিক্যাল ইন্সিওরেন্স পার করে দিয়ে অনেক খরচ করিয়ে দেওয়া চিকিৎসা, তার পরেও রোগীর মৃত্যু। এসব ঘটনার টানাপোড়েনে নন্দিনী সাময়িক ভাবে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে সেই পার্সেল, আসতে থাকে বারবার! কিন্তু প্রেরকের হদিশ মেলে না কোনও সময়ই। জমে ওঠে রহস্য। দর্শকেরও স্নায়ু টানটান।

আরও পড়ুন – KIFF: উৎসবের নবমী নিশি, মন ভার সিনেমাপ্রেমীদের

অন্যদিকে সৌভিকের ফোনে আসা অদৃশ্য নারী কণ্ঠ, বেশ বোঝা যায় ঘনিষ্ঠতা রয়েছে দু’জনের। পার্সেল নিয়ে বিব্রত নন্দিনী। সৌভিকও এ ক্ষেত্রে কোথাও একটা সন্দেহের ভ্রূকুটি রেখে দেয়। গিল্টি ফিল করে নন্দিনী। এদিকে পার্সেল এসেই চলে নন্দিনীর কাছে। তার নানা সময়ের ছবি। কলেজ জীবন থেকে দু’দিন আগের জীবন– কিছুই বাদ যায় না। সময় যত এগোয়, তত সে মরিয়া হয়ে ওঠে। যখন তার ছোট্ট মেয়ের কাছেও পার্সেল আসে। তখন সে আর ঠিক থাকতে পারে না। নিজেই নেমে পড়ে অন্তরালে থাকা সেই কালপ্রিটকে খুঁজে বার করতে, যে তাকে অদ্ভুত ভাবে পীড়ন করে চলেছে। সে নক করতে থাকে তার পুরনো সময়ের মাইলস্টোনগুলোকে। একদা ঘনিষ্ঠ প্রেমিক, স্কুল লাইফের প্রিয় বান্ধবী; অবিশ্বাসের ধুলোঝড়ে তার দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে চিকিৎসক, রোগী এবং হসপিটাল– পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস, অবদমন। যা আমাদের আধুনিক সময়ের নিত্যদিনের ঘটনা। টানটান এক গল্প এগিয়ে চলে সুখ-দুঃখ, রাগ-অভিমান, ভালবাসা-কৌতূহল… সমস্ত চেনা অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়েছেনে। দর্শক একাত্ম বোধ করে চলমান দৃশ্য, ঘটনা, চরিত্রের সঙ্গে। আর এখানেই হল বড় পরিচালকের মুন্সিয়ানা।

দুর্দান্ত অভিনয় ঋতুপর্ণা ও শাশ্বতর। নন্দিনীর হতাশা, অজানা পার্সেলকে ঘিরে তার ভেতর খুঁড়ে বেরিয়ে আসা ভয়, সন্দেহ, রুক্ষতা; অন্যদিকে সন্তানের জন্য ভাবনা… সবগুলোই ফুটে উঠেছে অসম্ভব স্বতঃস্ফূর্ততায়। অন্যদিকে একজন বড় ডাক্তারের ব্যস্ততা, লুকনো প্রেম, ঘ্যানঘ্যানে প্রেমিকা এবং মারমুখী পেশেন্ট পার্টিকে হ্যান্ডেল করা, সন্তানের সঙ্গে সখ্য। সবই কী চমৎকার, জীবন্ত।

ছবির লোকেশন কখনও ঘর, কখনও বাহির। ঘটনা এবং চরিত্র অনুযায়ী সবগুলোই সমান সাযুজ্য রেখে এগিয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ভায়োলিনের সুর বড় মনোরম লাগে। আসলে ইন্দ্রাশিস চলমান পর্দায় বলে গেছেন চরম বাস্তবের চিত্রসহ প্রায় ফ্ললেস এক রহস্য গল্প। যার সমাধানের ভার রেখেছেন দর্শকের ওপরেই। আর সেখানেই যেন গল্পও এক সময় হয়ে উঠেছে কবিতা! এ সিনেমা বাস্তবিকই গল্প, দৃশ্য, অভিনয়; সমস্ত কিছু নিয়ে, অনুরণন রেখে যাবে দর্শকের মনের গভীরে।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও