প্রবল রাজপুত আবেগ আছে এই রানিকে ঘিরে৷ মরু দেশের রানি কাহিনিতে কখন যেন মিশে গিয়েছে জল জঙ্গলের মগ মুলুক৷ তবে সেখানকার রক্তাক্ত রোহিঙ্গা জনজীবনে তাঁকে নিয়ে উন্মত্ত তাণ্ডব হয় না৷ তিনি গল্পের নায়িকা৷ কবির কল্পনায় থাকা অলীক রূপবতী৷

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: কোথায় মগ মুলুক আর কোথায় মরু দেশ ! শত শত যোজন দূরে থাকা দুই বিপরীত ভূখণ্ডে ছড়িয়ে আছেন রানি পদ্মাবতী৷ অথচ তাঁকে নিয়ে গল্পটা প্রায় এক৷ এই কাহিনি যত না রাজস্থানের ততোটাই আরাকানের৷ আবার বাংলারও৷ অবাক লাগলেও এটাই ঐতিহাসিক সত্যি৷

কোন সে দূর এক স্বপ্নপুরী৷ সেখানে সময় থমকে যায় বটের ছায়ায়৷ সন্ধ্যাদীপ জ্বালে তারার টিপ৷ এমনই দেশের কবি ছিলেন আলাওল৷ তাঁর জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের মাদারিপুরে৷ আলাওলের কলমে মধ্যযুগের বাংলায় এসেছিল রোমান্টিক বিপ্লব৷ কবি কল্পনায়, সেই কাজল রাঙা রানির চোখ হার মানায় খঞ্জনা পাখিকে৷ এমনই সৌন্দর্য পদ্মাবতীর৷

আরাকান অর্থাৎ মগ মুলুক৷ আরও পরিষ্কার করলে বলা ভালো মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ৷ জাতিগত রক্তাক্ত সংঘর্ষে এখান থেকে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা৷ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে এই এলাকা৷ রাখাইন জনজীবনেই মিশে আছে পদ্মাবতী গাথা ও রচয়িতা কবি আলাওল৷

আরাকান রাজসভার কবি আলাওল বাংলা ছাড়া আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত৷ শুধু কবিতা লেখা ? জনশ্রুতি, এই কবির কলম যেমন রোমান্টিক তেমনই নিপুণ তাঁর তলোয়ার বিদ্যা৷ সবমিলে গল্প-মিথ সত্যি ঘটনার মিশেলে এক অদ্বিতীয় চরিত্র৷ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছড়িয়ে তাঁর কীর্তি৷ ১৬৪৮ সাল নাগাদ তিনি রচনা করেন অমর গাথা-পদ্মাবতী৷ কেমন সেই রূপ ? কবি লিখেছেন ‘…ভুরুর ভঙ্গিমা হেরি ভুজঙ্গ সকল/ ভাবিয়া চিন্তিয়া মনে গেল রসাতল ৷৷ কাননে কুরঙ্গ জলে সফরী লুকিত/ খঞ্জন-গঞ্জন নেত্র অঞ্জন রঞ্জিত …‘

আলাওল রচিত কল্পিত পদ্মাবতী কাহিনীর প্রধান চরিত্র সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতী৷ চিতোরের রাজা রত্ন সেন৷ অন্তত তিনশো বছর আগে কাব্যে মরু রাজ্য চিতোর ও আরাকান মিশে গিয়েছে৷ আলাওল লিখেছেন, চিতোরের রাজার রত্ন সেনের স্ত্রী ছিলেন সিংহলী পদ্মাবতী৷ ঘটনাচক্রে তার সৌন্দর্যের কথা জানতে পারে দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি৷ বস্তুত কাব্য জুড়ে তিনিই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব৷

ফুলের গন্ধে যেমন মৌমাছি উড়ে আসে৷ তেমনি পদ্মাবতীর রূপে আকৃষ্ট হলেন দিল্লির সম্রাট৷ তিনি আক্রমণ করলেন চিতোর গড়৷ যুদ্ধ করে দুর্গে প্রবেশ অসাধ্য জেনে সন্ধির প্রস্তাব পাঠালেন আলাউদ্দিন৷ একবার রানিকে দূর থেকে দেখার অভিপ্রায় জানালেন সম্রাট৷ তাই ঠিক হল৷ বিশাল আরশিতে ধার দিলেন পদ্মাবতী৷ মুগ্ধ আলাউদ্দিন খিলজি৷ মনে ফন্দি যে করেই হোক চিতোর রাজাকে বন্দি করার৷ সেই মতো দুর্গের বাইরে এসে অতর্কিতে রত্ন সেনকে বন্দি করা হল৷ প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হলেন রানি পদ্মাবতী৷ দিল্লির সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার বার্তা পাঠালেন৷ ষোলশো পাল্কি চড়ে আসবেন রানি৷ সঙ্গে থাকবেন তাঁর সহচরীরা৷ এই ছিল শর্ত৷ গোপনে সেই পাল্কিতে থাকল বাছাই করা সেনা৷ বাদশাহের সামনে আসার আগে শেষবারের জন্য স্বামী রত্ন সেনার সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দিলেন রানি পদ্মাবতী৷ অনুমতি মিলতেই বন্দিশালায় পোঁছে গেল একটি পাল্কি৷ সেখানেই মুক্ত করা হল রাজাকে৷ তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল রাজপুতরা৷ সবশুনে রানির চাতুর্য বুঝলের আলাউদ্দিন৷ শুরু হল চিতোর দখল অভিযান৷ যুদ্ধে আহত হয়ে রত্ন সেনের মৃত্যু হয়৷ প্রথা মাফিক তাঁর সঙ্গে চিতায় উঠে সহমরণে যান পদ্মাবতী৷

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনীতেও ধরা আছে রানি পদ্মাবতীর কথা৷ সেখানে তিনি ‘পদ্মিনী’৷ আলাউদ্দিন খিলজির সেনার কাছে চিতোরের পরাজয়ের পর রানি আগুনে পুড়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন৷

আলাওলের রচিত কাহিনী ও অবন ঠাকুরের গল্পের সমাপ্তি মুহূর্ত আলাদা৷ দুটি কাহিনি বর্ণনা করেছে বিয়োগান্ত প্রেম কথা৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েছে, বালির রাজ্যে জীবন কথায়, মেঠো সুরে ছড়িয়ে আছেন পদ্মাবতী৷ জীবনকে নিয়ে তৈরি হয় গল্প৷ আর সব গল্পে জীবন প্রজন্ম ধরা থাকে না৷ পদ্মাবতী সেই অর্থে জীবন্ত৷