স্টাফ রিপোর্টার, তমলুক: কাশীজোড়া পরগনার অধীন যে কয়েকটি পুরানো মন্দির রয়েছে তার মধ্যে চাকদহ গোপীনাথ জিউর মন্দির অন্যতম৷ মন্দিরটির কোন লিখিত ইতিহাস না থাকলেও পারিপার্শ্বিক মানুষজন এর কাছ থেকে যেটুকু জানা যায় যে মন্দিরটির আনুমানিক বয়স ৩৫০ বছর৷ তৎকালীন সময়ে শ্রীধাম বৃন্দাবন থেকে বাবাজি মধুকরি করতে এসে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন৷

মন্দিরের রীতিনীতি গোপীবলভপুরের সুবর্ণ রেখা নদী ধরে যে দুখীকৃষ্ণ দাসের স্মৃতি ধন্য রাধাগোবিন্দ মন্দির রয়েছে তারই অনুগামী এই মন্দিরটি৷ এই মন্দিরটিকে গোপীবল্লভপুরের শ্রীপাঠ রাধা গোবিন্দ মন্দিরের ‘গাদি’ বলা হয়৷ প্রথম বাবাজি ছিলেন কালিনিমাই চরণ দাস বাবাজি৷ উনি খুব স্বাধীন পুরুষ ছিলেন৷ তার সম্পর্কে অনেক লোক কথা শোনা যায়৷

এক বার এক সাধু কচুমন দাস বাবাজির সঙ্গে দেখা করতে গোপীবল্লভ পুর থেকে গুরুদেব ও রাজাবাবু আস্তে দেরি হচ্ছে৷ এই দেখে মাটির বাড়ির দেওয়াল যাকে কাথ বলে, সেই কাথ এর উপর চড়ে কালিনিমাই গোসাঁই রাজা বাবুদের আনতে গিয়েছিলেন৷ মানুষের বিশ্বাস তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন৷ ওনার পরে বাবাজি হন রাধা রমন গোসাঁই বাবাজি৷ তাঁর সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি৷

এরপর বাবাজি হন মধুসূদন দাস বাবাজি৷ তিনি দাসপুর এর জগন্নাথপুরের বাসিন্দা৷ তিনি দীর্ঘদিন এই মন্দিরের বাবাজি ছিলেন৷ এখানে দেহান্তরিত হন মধুসূদন দাস বাবাজি৷ এককালে জগন্নাথ পুরে এই গোপীনাথ জিউয়ের সম্পত্তি প্রচুর ছিল৷ তা পরবর্তীকালে বিভিন্নভাবে দখল হয়ে যায়৷

এরপরে গ্রামেরই মানুষ বংশীধর বাবাজি হন৷ তাঁর পূর্ব নাম বিপিন বিহারি জানা৷ ভূষণ সামন্ত ভাজনানান্দ দাস বাবাজি নামে নিয়ে তার আমৃত্যু মন্দিরের সেবাইত ও শিষ্য মহল পরিচালনা করেন৷ পরে ১৯ বছরের যুবক পাঁশকুড়ার চন্ডিপুর গ্রামের কালিপদ আচার্যকে আনেন এবং ২১ বছর বয়েসে দীক্ষা দিয়ে কুঞ্জ দাস বাবাজি নাম দিয়ে মন্দিরের সেবাইত করলেন৷

কুঞ্জ বাবু দীর্ঘদিন সেবাইত ছিলেন৷ তার আমলে ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে পুরানো বিগ্রহটি চুরি হয়ে যায়৷ পরে তিনি নতুন বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ শালগ্রাম শিলাটি আজও বর্তমান৷ সেটিকে নৃসিংহ রুপী শালগ্রাম শিলা রূপে পুজো করা হয়৷ এখানকার বাবাজি হতে গেলে চিরকুমার সংসার ত্যাগী বৈষ্ণব হতে হবে৷ তাই কুঞ্জবাবু তার জীবন দশায় বহু চেষ্টা করেছেন নতুন বাবাজি খুঁজতে৷ কিন্তু তিনি তার উপযুক্ত মানুষ না পাওয়ার কারণে তার শিষ্যদের নিয়ে সিদ্ধান্ত করেন যে মন্দিরের স্থাবর অস্থাবর এক প্রতিষ্ঠানকে দান ও লিজ দিতে হবে৷

তার এই দুর্বলতার সুযোগে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পদ হস্তগত করলেও গোপীনাথ জিউর নিত্য নৈমিত্তিক পুজো থেকে বঞ্চিত হয়৷ ফলে ভক্ত বৃন্দ পুনরায় সিদ্ধান্ত নেয় যে এক বাবাজিকে সেবাইত করে গোপীনাথ জিউর সেবা কাজ চালাবেন৷ এই সব গণ্ডগোলের মাঝে গোপীনাথ জিউর প্রায় ২০০ ডেসিমেল জল জমি বেদখল হয়ে যায়৷ বর্তমানে প্রায় ২০০ ডেসিমেল কালাজমি ও ৭০ ডেসিমেল জল জমি ঠাকুরের অধীন রয়েছে৷ কিন্তু তা দিয়ে ৩৬৫ দিন প্রত্যহ পাঁচবার পুজো চালানো ও বছরে হোলি, রাসপূর্ণিমা, জন্মাষ্টমী, রামনবমী, অক্ষয় তৃতীয়ার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান যাক জমকে করা খুব কষ্ট কর হয়ে যাচ্ছে৷

এখানে ভগ্ন প্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে মূল মন্দিরটি৷ নয়টি চূড়া বিশিষ্ট রাসমঞ্চ ও ছয়জন বাবাজির সমাধি স্থল৷ রাসমঞ্চ ও পুরানো সমাধি স্থলের গঠন রীতিতে কিছুটা বিষ্ণুপুরী ঘরানার ছাপ থাকলেও পুরোটি যে বৈষ্ণবভাব ধারায় প্রবাহিত তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ মন্দিরটিতে চুরি হয়েছে বহুবার৷ কিছু প্রামাণ্য নথি থাকলেও তা চোরেদের হাত হতে রক্ষা পায়নি৷ মোট ৩৮ দফা ফৌজদারি মামলাও রয়েছে মন্দিরের উপর। একটি দেওয়ানি মামলা ছিল এই মন্দিরটির উপর৷

সর্বশেষ মন্দিরটি সংস্কার হয়েছে ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে৷ কিন্তু কোনরূপ সরকারি সাহায্য পায়নি৷ মন্দিরের চুন সুরকির গাঁথুনি ও মাটির দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে দৈব ভরসায়৷ যে কোনদিন ভেঙে যেতে পারে৷ বর্তমানে ১১ জনের একটি পরিচালন কমিটি থাকলেও তা নিষ্ক্রিয়৷ কেউই আগ্রহ দেখায় না৷ ঠাকুর বাড়িতে পানীয় জলের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই৷ পচা পুকুরের জল তুলে ভোগ রান্না হতে দেখা যায়৷

বর্তমান সপ্তম গোসাঁই রাধানাথ দাস অধিকারী বলেন, ‘‘গোপীনাথের কৃপায় তিন হাজার শিষ্য নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছি৷ তবে পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত৷ যদি কোন সহৃদয় বন্ধু বা সরকার মন্দিরটিকে সংস্কার করার সহযোগিতা করেন গোপীনাথ তার উপর কৃপা দান করবেন।’’