দেবময় ঘোষ: NRC বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। অসমে ১৯ লক্ষ মানুষ NRC তালিকায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই, পশ্চিমবঙ্গবাসীরাও কিছুটা চিন্তায় রয়েছেন। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এই দুই রাজ্য অনুপ্রবেশের সমস্যায় জর্জরিত। অসমে অনুপ্রবেশ পরিস্থিতি মাত্রাছাড়া। অনুপ্রবেশ, উদ্বাস্তু এবং NRC বিষয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেল, অসম পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিশেষ এন আর সি বা ‘Special NRC’ চালু করতে হয়েছে। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গ ও অসম পরিস্থিতি এক নয়। পশ্চিমবঙ্গে যদি এন আর সি হয়, তবে তা কীভাবে হবে কিংবা তাঁর বিষয় বা ভিত্তি কি হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার এই রাজ্যে NRC ঘোষণা করেনি। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসী অযথা আতঙ্কিত হচ্ছেন। কিন্তু, বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আতঙ্ক বৃথা। কারণ, অসমের NRC এর কথা ভেবে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। ১৯৮৫ সালের অসম চুক্তি মাথায় রেখেই অসমে NRC চালু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নেহরু-লিয়াকত চুক্তি বা পরবর্তী ক্ষেত্রে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি প্রাধান্য পাবে। তবে সবটাই আলোচনা মাত্র। কেন্দ্রীয় সরকার কিছুই জানায়নি।

রাজনীতি

লোকসভা নির্বাচনের মুখেই রাজ্যের ভোটারদের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীকরণ বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (NRC) নিয়ে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস বিভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে৷ লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়ে গিয়েছে। রাজ্যে ১৮টি আসন পেয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বিজেপি৷ লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ বলে এসেছেন – পশ্চিমবঙ্গে সব থেকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু NRC৷ কারণ, ২০২১ সালে বিজেপি ক্ষমতায় এলে অসমের মতো এরাজ্যেও NRC জারি করা হবে৷ বিজেপি কিছু নেতা-মন্ত্রীরাও পশ্চিমবঙ্গে NRC এর কথা জানিয়েছেন। অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, “NRC হতে দেব না।” বিষয়টি বিজেপি এবং তৃনমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক তরজার দিকেই এগোচ্ছে।

নাগরিকত্ব আইন বা সিটিজেনশিপ আমেন্ডমেন্ট বিল (CAB)

একটি বিষয় শুরু থেকেই বুঝে নিতে হবে যে, এনআরসি হল একটি সরকারি পদ্ধতি৷ কিন্তু সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব বিল একটি আইনি প্রক্রিয়া৷ এই বিল আইন হিসাবে পাশ এখনও হয়নি৷ মোদী সরকার এই বিলকে আইন বানিয়েই দেশ থেকে অনুপ্রবেশকারিদের তাড়াতে চাইছে৷ অর্থাৎ এনআরসি হল চিহ্নিতকরণ৷ নাগরিকত্ব বিল, যা পরবর্তীকালে আইন হিসাবে আসতে চলেছে, তা হল একটি আইনি প্রক্রিয়া৷

কী আছে এই নাগরিকত্ব বিলে?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো ১৯৫৫ সালে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব বিলের সঙ্গে সংশোধিত বিলের বিশেষ তফাত কিছুই নেই৷ বিলে যা আছে, তা ব্যাখ্যা করলে বলতে হবে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমানরা যেমন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, অন্যদিকে ওই তিন দেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি, শিখ বা খ্রিস্টানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেন শরণার্থী৷

বিলে রয়েছে, ভারতের সরকার, প্রতিবেশি দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেবে৷ কারণ, তাঁরা বিপদের মুখে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন৷ অন্যদিকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে রোজগার বা বাসস্থান খুঁজে পেতে, কিংবা কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁরা এদেশে এসেছে৷ তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুরা, যারা গত একবছর ভারতে রয়েছেন বা শেষ ৬ বছর ধরেই এই দেশে রয়েছেন, তারাই নাগরিকত্ব আইনের (বিল আইন হিসেবে পাশ হয়ে যাওয়ার পর) আওতায় নাগরিক হতে পারবেন৷ অন্যদিকে, ওভারসিজ সিটিজেন কার্ডহোল্ডারা (ওসিসি) কোনও অনৈতিক কাজ করলে তাঁদের নথীভুক্তিকরণ বাতিল হতে পারে৷ NRC নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে৷ অনেকেই এই বিষয়গুলি জানতে চাইছেন,

NRC-এর ফলে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম থেকে বিতাড়িত হতে হবে?

না৷ ২০১৪ সালে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল উদ্বাস্তু হিন্দুদের আশ্রয়স্থল ভারত এবং ক্ষমতায় এসে তিনি সে ব্যবস্থাই করবেন৷ কথামতো কাজও করেছেন তিনি৷ পাসপোর্ট আইন, বিদেশি আইন বা ফরেনার্স অ্যাক্ট-এর সংশোধন করা হয়েছে৷ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ – এর মধ্যে যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে এসেছেন তারা এই দেশে আইনি বসবাসের অধিকারি হয়েছেন৷

বাংলাদেশী মুসলমানরা ভারতে কেন উদ্বাস্তু স্বীকৃতি পাবেন না?

মোদী সরকারের বক্তব্য, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা জানতে হবে৷ বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র৷ সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরারা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে৷ রাষ্ট্রসঙ্ঘে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা অনুযায়ী তাঁদের উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় দেওয়াটাই আইনসঙ্গত৷ কারণ, উদ্বাস্তুর সংজ্ঞায় বলা রয়েছে, ‘‘যে ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, নাগরিকত্ব, সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্থার জন্য অত্যাচারিত হচ্ছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় দেশ ছেড়েছেন তাঁরাই উদ্বাস্তু৷ সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক কারণে চলে আসা কাউকে রাষ্ট্রসংঘের সংজ্ঞায় উদ্বাস্তু গণ্য করা হয় না৷ কেবলমাত্র গরীব বলেই অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা এবং রোজগার করার অধিকার জন্মায় না৷

ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গে কেন NRC চাইছে? পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কী?

১৯৯০ সালের ৬ মে, দেশের কমিউনিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত (সিপিআই দলের) লোকসভায় বলেছিলেন, ভারতে ১ কোটি বাংলাদেশী আছে৷ ১১ অক্টোবর ১৯৯২ সালে গণশক্তি পত্রিকায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিএসএফ ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন বাংলাদেশীকে তাড়িয়ে দিয়েছে৷ এরপর, ১৪ জুলাই ২০০৪ সালে কংগ্রেসের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ জয়সোয়াল লোকসভায় জানান, ভারতে মোট ১কোটি ২০ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৫০জন বাংলাদেশী রয়েছে৷ বিজেপির দাবি, আবার, ২০০৫ সালে লোকসভাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে লোকসভায় অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন৷ সুতরাং, অনুপ্রবেশ যে ভয়ানক সমস্যা তা জ্যোতি বসু থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাই জানতেন৷ জ্যোতি বসুরা বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ভোটের খেলা খেলেছেন৷ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় ইসলামীয় পরম্পরা নিয়ে এসেছেন ভোটব্যাংকের জন্যই৷ রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তাড়িয়ে যে আদর্শ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হয়েছিল, তা ফিরিয়ে আনতে হবে৷

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলছে, বিজেপি সংসদে নাগরিত্ব বিল পাশ করে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে NRC চালু করতে বদ্ধপরিকর৷ তা না হলে রাজ্য দিনে দিনে পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে৷ যদিও, মুসলমান আটকালেও কোনও হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান উদ্বাস্তু বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না৷ কারণ ২০১৫ সালে পাসপোর্ট ও বিদেশী আইন সংশোধন করা হয়ে গিয়েছে৷ বিজেপির নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশি মুসলমানদের চিহ্নিত করুন৷ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য NRC নয়৷ ভারতীয় মুসলমানরা আমার-আপনার ভাই৷ আমাদের প্রিয় ভারতবাসী৷

তবে বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতামত, তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দলগুলি এবং কংগ্রেস বাংলায় NRC এর বিরোধীতাকে দিল্লি পর্যন্ত টেনে নিতে চায়। এক্ষেত্রে NRC বিরোধীরা ভবিষ্যতে একজোট হওয়ার পথে।