স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবার্তী জেলাগুলিতে সিটিজেনসিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল এবং এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণকে নিয়ে প্রচার জোরদার করার কৌশলকেই প্রাধান্য দিতে চাইছে বিজেপি৷ রাজ্যের বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে প্রচার শুরু করেছে৷

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ – রাজ্যে জুড়ে সভা করেছেন৷ মালদা জেলা বাদ দিলে উত্তরবঙ্গের নির্বাচনপর্ব মিটে গিয়েছে৷ বিজেপির দাবি উত্তরবঙ্গের মানুষ বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছে – কারণ তারা মোদী-শাহর থেকে এনআরসি এবং সিটিজেনসিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল নিয়ে আশ্বাসবাণী পেয়েছে৷

রাজ্য বিজেপির অভ্যন্তরীন রিপোর্ট বলছে, উত্তরবঙ্গে সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছে পার্টি৷ তবে এই সাফল্যের মূল কারণ, জনতাকে মোদী-শাহর প্রতিশ্রুতি দেওয়া সিটিজেনসিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল এবং এনআরসি৷ উত্তবঙ্গের মানুষ বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের আটকানোর পক্ষেই সওয়াল করেছেন বলে মনে করছে বিজেপি৷ উত্তবঙ্গে ভালো ফলাফল হচ্ছে তা ধরে নিয়েই দক্ষিণবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে সিটিজেনসিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল এবং এনআরসি নিয়েই আরও প্রচার জোরদার করতে চাইছে বিজেপি৷

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের অ্যাজেন্ডা নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল৷ লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের আগেই মালদার সভায় দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা করে গিয়েছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ৷ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশকারীরা আজকাল বড় ভূমিকা পালন করে, তা বোঝাতে চেয়েছিলেন অমিত৷ বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিজেপি৷ কিন্তু তৃণমূল এনআরসি নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে৷ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যখন লোকসভায় পাশ হয়েছিল, তখন সদন থেকে ওয়াকআউট করে তারা৷ নাগরিকত্ব বিল নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী চায়, তা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ জানতে চায় – দাবি অমিত শাহের৷ এরপর অবশ্য, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি বলেন, ‘‘লোকসভা নির্বাচনে বাংলার সব থেকে বড় অ্যাজেন্ডা নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল৷ প্রসঙ্গত, লোকসভায় সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব বিলকে ধ্বনি ভোটে পাশ করতে পেরেছে বিজেপি৷

কী আছে এই নাগরিত্ব বিলে? প্রথমেই বলে রাখা ভালো ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব বিলের সঙ্গে সংশোধিত বিলের বিশেষ তফাত কিছুই নেই৷ বিলে যা আছে, তা যদি ব্যাখ্যা করা যায় তবে বলতে হবে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমানরা যেমন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, অন্যদিকে ওই তিন দেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি, শিখ বা খ্রীস্টানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেন শরণার্থী৷ ভারতের সরকার, প্রতিবেশি দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেবে৷ কারণ, তাঁরা বিপদের মুখে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন৷ অন্যদিকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে রোজগার বা বাসস্থান খুঁজে পেতে, কিংবা কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁরা এদেশে এসেছে৷ তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুরা, যারা গত একবছর ভারতে রয়েছেন বা শেষ ৬ বছর ধরেই এই দেশে রয়েছেন, তারাই নাগরিকত্ব আইনের (বিল আইন হিসেবে পাশ হয়ে যাওয়ার পর) আওতায় নাগরিক হতে পারবেন৷

অসমে এবং ত্রিপুরায় কেন অশান্তি? অসমে অশান্তির কারণ মূলত ভাষা৷ অসমীয়রা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বিরোধী৷ তাঁদের কাছে বাংলাদেশিদের ধর্মীয় বিভেদ গুরুত্বহীন৷ মুসলমান বা হিন্দু – কোনও বাংলাদেশিকেই অসমে অনুপ্রবেশ করতে দিতে চায় না অসমবাসী৷ তাঁদের মতে অসমে ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশীরা৷ ত্রিপুরার একটি অংশের মানুষও এই বিলের বিরোধী৷

বিজেপি বোঝাতে সচেষ্ট, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সঙ্গা ঠিক কী, জানা প্রয়োজন৷ বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র৷ সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে৷ রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সঙ্গা অনুযায়ী তাঁদের উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় দেওয়াটাই আইন৷ কারণ, উদ্বাস্তুর সঙ্গায় বলা রয়েছে, ‘‘যে ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, নাগরিকত্ব, সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্থার জন্য অত্যাচারিত হচ্ছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় দেশ ছেড়েছেন তাঁরাই উদ্বাস্তু৷ সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক কারণে চলে আসা কাউকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সঙ্গায় উদ্বাস্তু গণ্য করা হয় না৷ কেবলমাত্র গরীব বলেই অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা এবং রোজগার করার অধিকার জন্মায় না৷

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ – সকলেই সিটিজেনসিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল এবং এনআরসি২র কথা বারবার উল্লেখ করছেন নিজের বক্তব্যে৷ তারা বলছেন, বামলাদেশের যেসব সংখ্যালঘু নাগরিক ভারতে আসতে চান, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া ভারতের কর্তব্য৷