সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি ঝোলে আছেন, ঝালেও আছেন। কিন্তু তিনি সেদ্ধতে কি আছেন? ঝাল ঝোল ছাড়া কি আর কিছু খাবার হতে পারে না নাকি? আলবাত হতে পারে। হতে পারে বলেই সাওন দত্ত হাজির হয়েছেন গোটা সেদ্ধ’র মেট্রোনোম  নিয়ে। শেকড় ভুলতে বসা বাঙালিকে গোটা সেদ্ধ রেসিপির গানের মাধ্যমে তিনি যেন টেনে আনলেন মূলে।

মাছের ঝোল, নেট দুনিয়ায় এভাবেই ভাইরাল হয়েছিলেন ‘ মেট্রোনোম লেডি’ সাওন দত্ত। তারপর থেকে একের পর এক বাঙালি রান্নার সঙ্গে গানের সুন্দর ছন্দ আর লিরিকে নেটিজেনের মন জয় করেছেন তিনি। কিছুদিন আগেই বিরিয়ানি রান্নার মেট্রো মেট্রোনোমটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এবার সরস্বতী পুজোর আগে তিনি হাজির তাঁর নতুন খাবারের গান নিয়ে। বিষয়, গোটা সেদ্ধ। জেন ওয়াই বাঙালি গোটা সেদ্ধ’র মাহাত্ম্য জানতে লেস ইন্টারেস্টেড হতেই পারে কিন্তু বাঙালির জেন এক্সও জানে গোটা সেদ্ধ’র সেদ্ধ স্বাদের মজা। সেই স্বাদকেই নেট দুনিয়ার নেটিজেনকে জানাবার চেষ্টা করেছেন সাওন। সাওন গেয়েছেন, ‘গোটা সেদ্ধ গোটা সেদ্ধ, ইটস সরস্বতী পুজো ওয়ান্স এগেইন’।

তবে বাংলার প্রত্যেক বাড়িতে সরস্বতী পুজো সকাল থেকে ঘণ্টা ধ্বনি, কদমা, তিলে পাটালি, গোটা সেদ্ধর আয়োজনের সঙ্গে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না সাওন। তিনি বলেন, “আমাদের বাড়িতে মা দুর্গার চেয়েও বেশি গুরুত্ব মা সরস্বতীর। কারণ তিনি বিদ্যা এবং শিল্প সংস্কৃতির দেবী। মায়ের থেকে আমি পুস্পাঞ্জলির মন্ত্র শিখেছি,যা এখনও আমার মুখস্থ।” বাংলার বাইরে থাকার জন্য সব বাঙালি আচার অনুষ্ঠান চাইলেও পালন করা সম্ভব হয়ে উঠত না তাঁদের।

তাহলে গোটা সেদ্ধর সঙ্গে কানেকশন কিভাবে? তাঁর কথায়, “কোনও কানেকশনই ছিল না। তখন সম্ভবত আমার বয়স আঠেরো কিংবা উনিশ হবে আমার বাবার মাইমার বাড়ি থেকে পাঠিয়েছিল। আমরা সবাই খেয়েছিলাম। তবে আমার আর বোনের গোটা খাওয়া সেই প্রথমবার। বিষয়টা কি, জানতামও না। ওনার থেকেই জেনেছিলাম এই রেসিপির নাম আর এটাও জেনেছিলাম শুধুমাত্র সরস্বতী পুজোর সময় খাওয়া হয়। একটা অদ্ভুত রকম পদ। এখন মনে নেই গোটা গোটা সবজি দিয়ে তৈরি সেই অজানা পদ আমাদের ভালো লেগেছিল কি না। তবে এটুকু বলতে পারি মনে একটা দাগ কেটেছিল, কারন এমন না কাটা সবজি দিয়ে একটা পদ এমন কখনও চেখে দেখিনি। তাছাড়া এমন একটা পদ যেটা নাকি সারা বছরে একবারই খাওয়া হয়!”

তারপর গোটার বিষয়টা মাথা থেকে চলে গিয়েছিল। বছর দুয়েক আগে এক বসন্তের বিকালে মাথায় কড়া নাড়ে ‘গোটা’ ‘গোটা’ ‘গোটা’! কিভাবে? সাওন বলেন, “তখন আমার রান্নাঘরের বাইরে গাছে নতুন পাতা গজাচ্ছে সেটা দেখেই ফিরে আসে গোটার স্মৃতি। অনেক রিসার্চ করতে শুরু করি এটার বিষয়ে। জানতে পারি দু’ভাবে রান্না করা যায়। কেউ সব ধরনের সবজি একসঙ্গে প্রেসার কুকারে ঢেলে দিয়ে বসিয়ে দেয়। অনেকে কড়ায় আলাদা আলাদা করে একটা একটা করে সবজি সেদ্ধ করে বানায়। আমার দ্বিতীয়টাই পছন্দ হয়। কারন এই পদ্ধতিতে রান্নার সময় একটা দারুন রঙের খেলা দেখা যায় আর প্রত্যেকটা সবজি ভালো সেদ্ধ হয়। স্বাদও ভালো হয়।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “গত বছরে আমি নিজে গোটা বানানোর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করতেই অনেকে আমাকে এটা নিয়ে গান বানাতে বলে। আর তারপরেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এটা নিয়ে কাজ করব। এক বছর পর অবশেষে সেটা হয়েছে।”

আর সরস্বতী পুজোর প্রথম স্মৃতি? সাওনের কথায়, এটার সঙ্গে রয়েছে কুল কানেকশন। সেটা কেমন? তিনি বলেন, “বাবার কাজের সুত্রে আমরা তখন ইন্দোরে থাকতাম। আমাদের বাগানে একটা কুলের গাছ ছিল। শীতের শেষের দিকে সেখানে প্রচুর কুল হতো। কিন্তু মায়ের মানা ছিল ওই কুল না খাওয়ার। মা বলতেন, আগে দেবী সরস্বতীর কাছে কুল দেওয়া হবে তারপর আমরা খেতে পারব। তাই সরস্বতী পুজোর দিন পেরোলে তবেই আমাদের দুই বোনের হাতে কুল পৌঁছত।” তাছাড়া ‘Delhi School of Planning and Architecture’-এ পড়ার সময় সরস্বতী পুজোর বেশ কিছু মজার স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে।

খাপছাড়া, তবু ভারি মিষ্টি সেইসব স্মৃতি, যা ‘বং’ সাওনকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সব দিনে, যা না ঝাল না ঝোল, গোটার মতোই ‘শুদ্ধ’ এবং সেদ্ধ।