শেখর দুবে, কলকাতা: হিন্দুবাড়ির ছেলে-মেয়েরা ছোট থেকে মা, ঠাকুমাদের দেখেছেন সব পুজো-পার্বণে৷ সেখানে কোথাও কোন হিংসার লেশমাত্র নেই৷ সবই প্রেমের, মিলনের উৎসব৷ তাই রামনবমীর এই অস্ত্র মিছিল অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না৷ অনেকে এর সঠিক মূল্যায়নই করেছেন, এটি আসলেই রাজনৈতিক, এর সাথে ধর্ম বা ভক্তির কোন যোগাযোগ নেই৷

এই প্রসঙ্গে মঙ্গল পান্ডের কথা বলা দরকার৷ সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্যারাকপুরে যাঁকে প্রথম ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল ইংরেজরা৷ সিপাহী বিদ্রোহের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও যে প্রধান কারণে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তা হল কেউ বা কারা প্রচার করেছিল, এনফিল্ড রাইফেলের টোটাতে গরু ও শুকরের চর্বি মেশানো আছে৷ ব্যস এই একটি কারণে সেদিন ভারতমাতার জন্য রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হতে পেরেছিলেন হিন্দু ও মুসলিমরা৷ আজকের বাংলায় জামাতি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার একটি উপায় হল রামনবমী৷ ভারত একটা এমন দেশ যেখানে সব কিছু রাজনীতির অংশ৷ পড়াশুনো, খাওয়াদাওয়া, কবিতা, গান, উপন্যাস, পুরস্কার, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, অধ্যাপনা৷ সবগুলোতেই কোন না কোন রং লেগে থাকে৷

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ঘুরে আসুন, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের ভাষণে শুনবেন, ‘সংখ্যালঘু ভোট’, ‘মুসলিম ভোট’, ‘খ্রীষ্টান ভোট’, ‘আদিবাসী ভোট’,‘দলিত ভোট’ কিন্তু কোনদিন শুনবেন না এরা ‘হিন্দু ভোট’ নিয়ে কথা বলছেন৷ কারণ? হিন্দুরা কোনদিনই রাজনৈতিকভাবে একত্রিত নয়৷ আর তার ফলও ভুগছে বিশ্বের অন্যতম পুরনো জাতটা৷ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের বাজেটে পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে আলাদা আলাদা বরাদ্দ থাকলেও হিন্দুদের নিয়ে কোন বরাদ্দ নেই৷ অথচ দেখুন সেই হজ্জাজ, মহম্মদ বিন কাশিমের সময় থেকে হিন্দুরা লাঞ্ছিত, শোষিত৷ কখনো হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে, কখনো নিজের দেশে মন্দিরে গিয়ে সামান্য প্রার্থনাটুকু করার জন্য হিন্দুদের দিতে হয়েছে ‘জিজিয়া কর’৷

সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি হিন্দুদের উৎসবগুলো কি ভীষণ নিরীহ৷ শিবরাত্রির দিন বাড়ির মা, বোন, বৌদি, দিদিরা উপোস থেকে শিবের মাথায় জল ঢালতেন৷ ব্যস এটুকুও সহ্য হল না শিক্ষিত মহিষাসুর সমাজের৷ শ্রেণীহীন সমাজ, বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারীরা শিবলিঙ্গের মাথায় কন্ডোম পরিয়ে প্রমাণ করে দিলেন এতদিন ধরে পুজো করে আসা শিবলিঙ্গ আসলে তাদের পুরুষাঙ্গ৷ ওটাতে জল নয়, কন্ডোম পরাতে হবে৷ তবে এখানেই থেমে থাকলেন না শিক্ষিত মহিষাসুরের দল৷ মা দূর্গার অশ্লীল ছবি আঁকা হল বাংলার এক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে৷ এভাবেই যেন প্রকাশ করলেন নিজেদের বঞ্চিত ঘৃণ্য প্রলেতারিয়াত কাম৷ বলতে পারেন এসব কেন? শিবলিঙ্গে জল ঢাললে তো কারও কোন অনিষ্ট হত না! নিজের দেশে, নিজের মত করে একটু পুজো করার অধিকারও কি হিন্দু বাড়ির মা বোনেদের নেই?

কিন্তু দেখুন সেই স্বাধীনতার আগে থেকে যাদের উৎসব গরু ছাগলের রক্তে স্নাত হয়ে আসছে, যাদের শোভাযাত্রায় শিশু থেকে বৃদ্ধের হাতে ঝলসে ওঠে চকচকে তলোয়ার তাঁদের নিয়ে আপনারা কিংবা সবরকমের রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, আধারাজনৈতিক দল কি ভীষণ চুপ! এরও দুটো কারণ রয়েছে

১- ওদের হাতের অস্ত্রকে ভয় পেয়ে আপনারা ওদের সম্মান করেন৷

২- ওরা সংঘবদ্ধ, তাই ভয় ‘পাছে ভোট নষ্ট হয়’!

আপনারাই ঠারে ঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোন পথে হাঁটলে, কিভাবে হাঁটলে আপনারা হিন্দুদের সম্মান করবেন৷ ব্যস বাংলার হিন্দুদের একটা অংশ এখন ওটাই ফলো করছে৷ আর আজ যে এই দিকে দিকে লম্বা লম্বা রামনবমীর মিছিল দেখছেন, সেটা বাড়বে৷ যত হিন্দুদের অপমান করবেন, পায়ে ফেলে পিষে মারতে চাইবেন তত মিছিল বাড়বে৷ সেই মিছিলে, বিজেপি, আরএসএস, তৃনমূল, কংগ্রেস, সিপিএম বলে কিছু থাকবে না৷ থাকবে শুধু ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাঞ্ছিত হতে থাকা ভারতের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী “হিন্দু”৷ হিন্দুরা রাজনৈতিক ভাবে সংঘবদ্ধ হচ্ছে, হচ্ছেই৷ হয়ত এরপর আপনাদের মুখেও শুনতে পাওয়া যাবে ‘হিন্দু ভোট’ নামক শব্দটি৷

রাম তো এক শান্ত সৌম্য ভারতীয় ছেলে৷ যে বাবার সম্মান রক্ষায় এক মুহূর্ত না ভেবে অয্যোধ্যার রাজ ঐশ্বর্য ছেড়ে বনচারী তপস্বী হয়েছিলেন৷ নিজের স্ত্রী ও ভাইয়ের সাথে পর্ণকুটিরে সংসার বেঁধেছিলেন৷ একদম নন্দীগ্রাম, নেতাই, মরিচঝাঁপি, ধূলাগড়, কালিয়াচকের সাধারণ আমার আপনার মতো৷ তাকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য করেছিল রাবণসহ অসুরকূল৷ রাবণনাশের পর তিনি আবার শান্ত সৌম্য অবস্থায় ফিরে গেছিলেন৷ এই রামনবমীর মিছিলের লোকগুলোও তেমনই স্যার, এরা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, ভয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে মিছিলে এসেছে৷ আসলে এরা সবাই ঘর পোড়া গরু তাই সিঁদুরে মেঘ এদের ভয়ের কারণ৷ দেখবেন এই সিঁদুরে মেঘ সরে গেলে মিছিলে আবার সবার হাতে খোল করতাল ফিরে এসেছে, ফিরে এসেছে ভক্তি, ফিরে এসেছে, “হরে কৃষ্ণ হরে রাম”৷

# মতামত লেখকের নিজস্ব।