শেখর দুবে, কলকাতা: সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র গড় বাংলাতেই বিজেপির বাড়বাড়ন্তের কথা বলছ দেশের নামী সংবাদ সংস্থাগুলির প্রি ভোট সমীক্ষা৷ সেখানে দাঁড়িয়ে শুধু রাজ্যে বিয়াল্লিশে বিয়াল্লিশ নয় দেশের মসনদে বসার স্বপ্ন দেখছে তৃণমূল৷ বুধবার প্রকাশিত তৃণমূলের নির্বাচনী ইস্তেহার এমনই স্বপ্ন বিলি করছে বাংলার মানুষের কাছে৷

‘‘অপশক্তিকে পরাজিত করে নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকায় হাজির থেকেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস৷ আর আগামীতে দেশের উন্নয়নকে পথ দেখাতে পারে আমাদের গর্বের পশ্চিমবঙ্গ৷ আমাদের সাফল্যই প্রমাণ করে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের যোগ্যত৷ আমাদের ভাষণের ঢক্কানিনাদ প্রয়োজন নেই কাজই আমাদের হয়ে কথা বলে৷’’ ঠিক এই কথাগুলিই লেখে হয়েছে তৃণমূলের সদ্য প্রকাশিত ইস্তেহারের ১৬ নং পৃষ্ঠায়৷ কিন্তু অবাকভাবেই সম্প্রতি দলের নতুন লোগো প্রকাশ করে নিজেদের ‘বাংলার দল’ হিসেবে তুলে ধরেছিল তৃণমূল৷

অটলবিহারী পরবর্তী জমানায়, ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে কল্কে পাওয়ার চেষ্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে সেই চেষ্টা কিছুটা সাফল্যের মুখ দেখেছিল৷ বিশেষ করে ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেড মঞ্চে৷ এম কে স্টালিন, এইচ ডি দেবেগৌড়া, এই ডি কুমারস্বামী, শরদ যাদব, অজিত সিং, ফারুখ আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লা, অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরীবাল, অর্জুন খাড়গে,তেজস্বী যাদবের মতো নেতাদের পাশে নিয়ে মোদী সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন মমতা৷ এরকম দৃশ্য শেষ চার দশকে বাংলার রাজনীতি দেখেনি।

১৯ জানুয়ারি তৃণমূলের ব্রিগেড সমাবেশের পর অনেকেই ভেবেছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে এবার নির্ণায়ক ভূমিকা নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ কিন্তু এরপরই বিভিন্ন ইস্যূতে সহমত হতে পারেননি মোদী বিরোধীরা৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত ‘মহাজোট’ও রয়ে গিয়েছে খাতা কলমে৷ এমনকি মোদীর সামনে নিজেদের মধ্যে কাউকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবেও তুলে ধরতে পারেননি বিরোধীরা৷ কিন্তু এসবের পরও দিল্লি চলোর লক্ষ্যেই নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেছে তৃণমূল৷ এমনটাই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের৷

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক অরিজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘ ২০১১ থেকে ২০১৯ অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে তৃণমূলের৷ এখন একটি আঞ্চলিক দল থেকে জাতীয় দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে আগ্রহী টিএমসি৷ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ইস্তেহার সেই রাজনৈতিক ইচ্ছারই প্রকাশ৷ খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ইস্তেহারে শুধু বাংলার মানুষকে উদ্দেশ্য না করে পুরো ভারতের জনগনের কাছে একটা বার্তা দিতে চেয়েছে তৃণমূল৷ এটি একেবারেই লোকসভা নির্বাচনের ব্যপ্তির কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে৷’’

নোটবন্দির, বিজেপির দেওয়ার অচ্ছেদিনের প্রতিশ্রুতি, জিএসটি, পেট্রোল ডিজেলের দাম, কর্মসংস্থান, ধর্ম নিরপেক্ষতা, নাগরিকত্ব বিল, মেক ইন ইন্ডিয়ার মতো বিষয়গুলিতে পাঁচ বছরে কতটা ব্যর্থ বিজেপি সরকার, তৃণমূলের ৬৭ পাতার নির্বাচনী ইস্তেহারে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে৷ পাশাপাশি তৃণমূলের হাতে দেশ শাসনের বাগডোর আসলে কীভাবে সমস্যাগুলির সমধান করা হবে তার ছবিও ভারতের জনগনের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছে টিএমসির ইস্তেহার৷ ‘মোদী সরকারের পাঁচ বছরের ব্যর্থতা ও অপশাসনের দলিল’’ এই শীর্ষকে মোদী-সরকারের সমালোচনার জন্য দশটি পৃষ্ঠা ব্যয় করা হয়েছে ইস্তেহারে৷ পাশাপাশি মমতা সরকার বাংলার মানুষের জন্য কতটা সফলভাবে কাজ করেছে তা ইস্তেহারে তুলে ধরা হয়েছে ‘‘দিল্লীতে আজ দরকার জনগনের সরকার’’ শীর্ষকে৷ স্বভাবতই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরদের একাংশের মতে, এই ইস্তেহার দিল্লীর মসনদকে লক্ষ্য করেই লেখা৷