দেবযানী সরকার, কলকাতা: শহরের ব্যস্ততম রাস্তা৷যানজট এখানকার বারোমাস্যা৷ সবকিছুকে পিছনে ফেলে দাপটের সঙ্গে স্টিয়ারিং ধরে নিত্যদিন শ’য়ে শ’য়ে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি৷ তিনি প্রতিমা পোদ্দার৷ মহানগরের একমাত্র মহিলা বাস ড্রাইভার৷ এই প্রতিমাদেবীই এবছর নৰ্থ ত্রিধারা সার্বজনীন দুর্গোৎসবের মুখ।

জীবন-যুদ্ধে লড়াইয়ের অপর নাম হতে পারে প্রতিমা পোদ্দার৷ বিছানায় শয্যাশায়ী স্বামী৷ বাড়িতে অসুস্থ শাশুড়ি ও দুই নাবালিকা কন্যা৷ এহেন অবস্থায় প্রতিবেশী বা নিকটজনদের কাছে হাত পাতা নয়, মাথা উঁচু করে সপরিবারে বাঁচতে বাস চালক স্বামীর স্টিয়ারিংকেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন আটপৌরে বধূ৷যে কাহিনীর কাছে রূপকথাও হার মানতে বাধ্য৷

হাওড়া-বেলঘরিয়া রুটে একটু নজর রাখলেই চোখে পড়বে এই মহিলা ‘ড্রাইভার’কে৷ এই ছাপোষা বধূ যাত্রীবাহী বাসের স্টিয়ারিং হাতে জনবহুল রাস্তার মধ্যে দিয়ে যাত্রীদের সুরক্ষিতভাবে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। বারো বছরের এই পেশায় প্রতিমাদেবী সফল। আর তার এই সাফল্যই তুলে ধরা হচ্ছে মণ্ডপ জুড়ে।

প্রতিমা পোদ্দারকে সামনে রেখেই যখন থিমভাবনা, তখন মণ্ডপের আদল মিনিবাসের মতো বলাই বাহুল্য। মণ্ডপের দেওয়াল জুড়ে বাসের সরঞ্জাম সাজানো থাকছে। পুজোমণ্ডপে ঢুকতে একদম সামনেই থাকবে প্রতিমা পোদ্দারের সিলিকনের মূর্তি। পুজোর পর সেই মূর্তি আবার স্থান পাবে মাদার ওয়্যাক্স মিউজিয়ামে।

শিল্পী সম্রাট ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাধা পেরিয়ে আসা প্রতিমার জীবনকাহিনি ফুটিয়ে তোলা হবে মণ্ডপজুড়ে। আর্ট ইনস্টলেশন এবং স্লাইড শোয়ের মাধ্যমে বর্ণিত হবে প্রতিমার জীবন। দেবী মুর্তিতেও থাকছে অভিনবত্ব। স্টিয়ারিংয়ের মধ্যে অস্ত্রহীন দুর্গা তৈরি করছেন শিল্পী নবকুমার পাল।

কিন্ত হটাৎ বাস চালিকা প্রতিমা পোদ্দারকেই থিম হিসেবে ভাবা হল কেন? পুজো উদ্যোক্তাদের কথায়, “যখন কোনও মহিলা বিমানসেবিকা, নার্স বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকেন তখন সমাজে তাঁদের কদর বেড়ে যায়। কিন্তু একজন মহিলা বাস চালাবে সেটা সমাজের কাছে একটা নাক সিটকানো ব্যাপার। কিন্তু কোনও কাজই ছোট নয়। একজন মহিলা হিসেবে তিনি যেভাবে যাত্রীবাহী বাস চালান তা অত্যন্ত গর্বের। ওনাকে সম্মান জানাতেই আমরা এই থিমের কথা ভেবেছি।”

যাঁকে নিয়ে এতো কিছু সেই প্রতিমা দেবী এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তাঁকে নিয়ে দুর্গাপুজোর থিম হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি একজন অতি সাধারণ। ওনারা আমাকে যে সম্মান দিলেন তার জন্য সারাজীবন আমি কৃতজ্ঞ থাকব।প্রতিমাদেবীর শিক্ষাগুরু স্বয়ং তাঁর স্বামী শিবেশ্বর পোদ্দার৷ বাসচালিকা বললেন, “যিনি আমাকে হাতে ধরে গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন তিনি সবথেকে বেশি খুশি হয়েছেন।”

দ্বিতীয়াতে প্রতিমা দেবীর হাতেই মণ্ডপের উদ্বোধন হবে। পুজোর কটাদিন স্বামী, সন্তানদের নিয়ে নর্থ ত্রিধারাতেই কাটাবেন তিনি।