ফাইল ছবি

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : চন্দ্রযান-২ উৎক্ষেপণ করা যায়নি। ইসরোর তরফে বলা হয়েছে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণেই এই সিদ্ধান্ত। ঘটনা হল, চন্দ্রযান-১ ও পুরোপুরি সফল নয়। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে উৎক্ষেপণ করার পর মনে করা হয়েছিল, এটি বছর দুই সচল থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। ২০০৯ এর ২৯ আগস্ট, মহাকাশযানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ইসরোর। তারপর ১০ বছর ধরে সেটি অকেজো হয়ে ঘোরাফেরা করছিল চাঁদের চারিদিকে।

অগস্টের ২৯ তারিখের আগে নিয়মিত সঠিকভাবেই তথ্য পাঠিয়েছিল চাঁদ থেকে। মূল্যবান তথ্যের জন্যই এই প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যায়নি। ২০০৯ সালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও, চন্দ্রযান-১ ২০১৭ সালের মার্চে নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল)-এর গবেষকদের রাডারে ধরা পড়ে এটি। তখনও চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিল যানটি। জেপিএল-এর বিজ্ঞানীরা একটি আন্তঃগ্রহ রাডার তৈরি করেছিলেন মহাশূন্যে বিকল হয়ে পড়া মহাকাশযান বা মহাকাশ বর্জ্য চিহ্নিত করত। অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দিয়ে এ কাজটি করা বেশ কঠিন।

বিশেষত চাঁদের আশেপাশে এই কাজ করা আরও কঠিন, কারণ চাঁদ থেকে আসা উজ্জ্বল আলোর কারণে এই ছোটখাটো বস্তুগুলোকে চিহ্নিত করাই দুষ্কর। সে প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই রাডারটির উদ্ভাবন। এ রাডারটির ক্ষমতা দেখার জন্যেই চন্দ্রযান-১ কে চিহ্নিত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। একবার কল্পনা করুন, আট বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি বস্তুকে মহাকাশে খুঁজে বের করা কী দুষ্কর কাজ! তার উপর এটি ছিল বেশ ক্ষুদ্র একটি মহাকাশযান। তবে নাসার বিজ্ঞানীরা তা করতে সক্ষম হয়েছিল। পৃথিবী থেকে তিন লক্ষ আশি হাজার কিলোমিটার দূরে ঘুরতে থাকা চন্দ্রযান-এক কে খুঁজে বের করেন তাঁরা।

এই মিশনে ভারতের ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৮০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল ইন্ডিয়ান ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (আইএসডিএন) তৈরি করতে।

২০০৮ সালের ৮ই নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে যাত্রা শুরু করে চন্দ্রযান-১। শ্রী-হরিকোটায় অবস্থিত সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় মহাকাশযানটিকে। উৎক্ষেপণের জন্যে ব্যবহৃত হয় ইসরোর বিখ্যাত পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (পিএসএলভি)-এর কিছুটা পরিবর্তিত সংস্করণের একটি রকেট। নভেম্বরের আট তারিখে মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছায়। ১৪ই নভেম্বর চন্দ্রযান থেকে মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব (এমআইপি) নামের অংশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিকল্পনামতো সেটি আছড়ে পড়েছিল চাঁদের বুকে।

এমআইপি নামের ৩৪ কেজি ভরের এ প্রযুক্তিটি চাঁদের ভূমিতে পৌঁছানো প্রথম ভারতীয় প্রযুক্তি। এর চারপাশে অঙ্কিত ভারতের পতাকা চাঁদে পৌঁছে দেয় তাদের দেশকেও। এর থেকে পাঠানো তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করাই ছিল একে চাঁদে ফেলার উদ্দেশ্য। এতে তিনটি প্রযুক্তি ছিল, ভিডিও ইমেজিং সিস্টেম, রাডার অ্যাল্টিমিটার ও মাস স্পেক্ট্রোমিটার। মাস স্পেকট্রোমিটারটি ব্যবহৃত হয়েছিল চাঁদের বায়ুমণ্ডল পর্যালোচনার জন্যে।

এমআইপি সহ সর্বমোট ১১টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি (পে-লোড) বহন করে নিয়ে গিয়েছিল চন্দ্রযান-১। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতে তৈরি। তিনটি ছিল ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি থেকে নেওয়া, যার মধ্যে একটি ইসরোর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি। আর বাকি তিনটি ছিল নাসার তৈরি ইন্সট্রুমেন্ট, এর মধ্যে একটি ছিল বিখ্যাত ‘মুন মিনারোলজি ম্যাপার’ (এম-থ্রি)। এ অভিযানের এ দিকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলার সম্মিলনের এক চমৎকার নিদর্শন প্রকাশ করে।

সব মিলিয়ে প্রায় ১৩৮০ কেজি ভরের এ মহাকাশযানটি দেখতে অনেকটা ঘনকাকৃতির ছিল। একপাশ দিয়ে বেরিয়ে ছিল এর সোলার প্যানেল। যেটি সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতো যন্ত্রগুলোয়। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে চার্জ ধরে রাখার জন্য।

চন্দ্রযান-১ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল চাঁদে জলের (ওয়াটার আইস) অস্তিত্ব নির্ণয় করতে সাহায্য করা। চন্দ্রযানে করে পাঠানো নাসার এম-থ্রি এর পাঠানো তথ্য থেকে চাঁদের ভূমিতে হাইড্রোজেন-অক্সিজেন বন্ধনের প্রমাণ পাওয়া যায় (যা হাইড্রোক্সিল বা জল নির্দেশ করে)। আরো দুটি অভিযান থেকে পাওয়া তথ্যের সাথে মিলিয়ে নাসা সিদ্ধান্তে আসে যে, চাঁদে আসলেই জলজ বরফের অস্তিত্ব আছে।

যেহেতু এম-থ্রি ভূমির খুব বেশি গভীরে অনুসন্ধান চালাতে পারে না, তাই জলের অবস্থান চাঁদের পৃষ্ঠের কাছাকাছি বলেই ধরে নেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া মেরুর দিকে জলের ঘনত্ব বেশি বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। জলের অবস্থান নির্ণয়ের এ তথ্য নাসা প্রকাশ করে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তাদের ঘোষণার পর ইসরো জানায় তাদের এমআইপি থেকে পাঠানো তথ্যেও চাঁদে জলের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। এর আগ পর্যন্ত চাঁদে জল থাকার বিষয়ে শক্ত কোনও প্রমাণ ছিল না।

অ্যাপোলোর নভোচারীরা ফিরে আসার সময় চাঁদ থেকে কিছু পাথর নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো বিশ্লেষণ করে খুবই স্বল্প পরিমাণ জলের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, এগুলো চাঁদের জল নয় বরং পৃথিবীতে আসার পর সংযোজিত হয়েছে। চাঁদ এবং পৃথিবীতে থাকা অক্সিজেনের আইসোটোপ একই হওয়ায়, চাঁদের জল ও পৃথিবীর জলের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন ছিল। ইসরোর চন্দ্রযান-১, এই পার্থক্যকে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।

ভারতের চন্দ্র-অভিযানের সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ১৪ জুলাই গভীর রাতে চন্দ্রযান-২ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এবারের মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে কোনো ক্ষতি এড়িয়ে মহাকাশযান ল্যান্ড করা ও চাঁদের মাটিতে একটি রোবোটিক রোভার পরিচালনা করা। আর গবেষণার দিক থেকে এর উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের টপোগ্রাফি, খনিজ পদার্থ, বিভিন্ন পদার্থের প্রাচুর্যতা, বায়ুমণ্ডল এবং জল ও হাইড্রক্সিলের নিদর্শন পর্যালোচনা করা। যান্ত্রিক গোলযোগের জেরে সে সমস্ত পরিকল্পনা এবারের মতো অসফল।