তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া : উত্তরবঙ্গ যখন প্রবল বন্যায় ভাসছে, ঠিক তখন উল্টো ছবি দক্ষিণ বঙ্গের প্রান্তিক জেলা বাঁকুড়া। জেলার উত্তর থেকে দক্ষিণ এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য হাহাকার করছেন মানুষ। জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছেও বৃষ্টির দেখা না মেলায় চরম সমস্যায় প্রায় শিল্প বিহীন, কৃষি নির্ভর এই জেলার চাষীরা।

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে বাঁকুড়া জেলার দক্ষিণাংশের বিস্তীর্ণ অংশে সেচের জলের ব্যবস্থা করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে দুর্গাপুর ডিভিসি থেকে উত্তর বাঁকুড়ার বেশ কিছু এলাকায় সেচের জল পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তা পর্যাপ্ত নয়। সব মিলিয়ে সারা বছর মূলতঃ বৃষ্টির জলের উপরেই নির্ভর করে এই জেলার কৃষিকাজ। বর্তমান সময়ে সেভাবে বৃষ্টি না হওয়ায় চলতি মরশুমে চাষের কাজ এখনো শুরু হয়নি। বীজতলা তৈরির কাজ প্রাথমিকভাবে শুরু হলেও তা সেচের জলের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় একরাশ দুশ্চিন্তা আর হতাশায় দিন কাটছে সিংহভাগ কৃষকের।

জেলা কৃষি দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র বৃষ্টিপাতের অভাবে এই জেলায় এখনো ধান রোপনের কাজ শুরু হয়নি। অন্যান্য বছর জুন মাসে যা বৃষ্টি এবছর তা অর্ধেকেরও কম হয়েছে। ফলে সেভাবে বীজতলা তৈরির কাজ করার ক্ষেত্রেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জুলাই মাসে যেখানে গড় ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় এবছর সেখানে মাত্র ১০০ মিলিলিটারের কাছাকাছি বৃষ্টি হয়েছে। অগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেও বৃষ্টি না হলে এবছর ধান চাষে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জেলা কৃষি দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই মুহূর্তে জেলার তিন মহকুমা বাঁকুড়া সদর, খাতড়া ও বিষ্ণুপুরে মোট জমির পরিমান যথাক্রমে ১ লক্ষ ৫২ হাজার ৪৭৪ হেক্টর, ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৩৩৫ হেক্টর ও ১ লক্ষ ২২ হাজার ৮৪৬ হেক্টর। যার মধ্যে বাঁকুড়া মহকুমায় খরিফ মরশুমে সেচের সুবিধা পায় ৪৮ হাজার ৭৯২ হেক্টর, খাতড়ায় ৭১ হাজার ২০০ হেক্টর ও বিষ্ণুপুরে ৯৫ হাজার ৮২০ হেক্টর।

মূলতঃ কৃষি নির্ভর এই জেলায় গত বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে ধান সহ অন্যান্য চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এবছরও সেই একই ঘটনা ঘটলে চরম সমস্যায় পড়বেন চাষীরা। বুধবার সকালে বাঁকুড়া-২ ব্লকের কদমাঘাটি এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, বীজতলা তৈরির জমিতে বিশালাকার সব ফাটল ধরেছে। জলের অভাবে ধানের চারা শুকোতে শুরু করেছে। সবজি চাষের অবস্থাও তথৈবচ। এলাকার চাষি অশোক নন্দী, অনাদী নন্দী, উজ্জ্বল নন্দীরা বলেন, বৃষ্টি না হলে চাষ হবেনা। আর চাষ না হলে সারা বছর দুঃখ দূর্দশার মধ্যে আমাদের কাটাতে হবে।

 

এই মুহূর্তে জেলার একটা বড় অংশের কৃষকের বেঁচে থাকাটাই বিশাল এক প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জানিয়ে তারা প্রশাসনিক ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। বেশ কয়েক দিন আগে সামান্য পরিমাণে বৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু জলের অভাবে সেই বীজতলা শুকোতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় এবছরও জলের অভাবে ধান চাষ না হওয়ায় চরম আর্থিক সমস্যায় পড়বেন বলে অনেক কৃষিজীবি মানুষই জানিয়েছেন।

জেলার চাষিদের বক্তব্যকে শীলমোহর দিয়েছে জেলা কৃষি দফতরকেও। জেলা কৃষি আধিকারিক সুশান্ত মহাপাত্র বলেন, এই মুহূর্তে জেলায় প্রায় ৯০ শতাংশ বীজতলা তৈরি। তবে বৃষ্টির জলের সমস্যার জন্য এখন নতুন করে কেউ যাতে বীজতলা না তৈরি করেন সেদিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমের কারণে ভূপৃষ্ট জলের সংরক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ কৃষক বন্ধুদের পাশে রয়েছে।

পড়ুন: জ্যোতি বসু সেন্টারের জন্য জমি ছাড়ল তৃণমূল সরকার

এবছর বাঁকুড়া জেলায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার হেক্টরের কাছাকাছি জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, যদি আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হয় তবেই সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। এছাড়াও কম জলে চাষ হয় চিনাবাদাম ও বিভিন্ন ধরণের ডালশস্য চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।