স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: এসএসকেএম হাসপাতালের ‘অসুখ’ সারাতে গিয়ে খোদ নিজেই বদলি হয়ে গেলেন সেখানকার এমএসভিপি (মেডিকেল সুপারিনটেন্ডেন্ট কাম ভাইস প্রিন্সিপ্যাল) মানস সরকার৷ এমনই অভিযোগ এবং দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলের তরফে৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, ওই ‘অসুখ’ সারানোর প্রচেষ্টায় ‘শামিল থাকা’র জেরে, আগামী দিনে রাজ্যের ‘সেরা’ এই সরকারি হাসপাতাল তথা কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট  গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমইআর)-এর ডিরেক্টর মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে৷

মন্ত্রী-নেতাদের সুপারিশ অনুযায়ী এসএসকেএম হাসপাতালের কোনও না কোনও ওয়ার্ডের বেড কোনও না কোনও সময় বুক করে রাখা হয়৷ শুধুমাত্র সাধারণ কোনও ওয়ার্ড-ও নয়৷ ২০১৩-য় রাজ্যের ‘সেরা’ এই সরকারি হাসপাতালের গভর্নিং বডি এবং রোগী কল্যাণ সমিতির যৌথ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং তৎকালীন মন্ত্রী মদন মিত্র যদি ফোনে হাipgmer.kolkata.02সপাতালের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বলে দেন, তা হলে সেখানকার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের কোনও বেড বুক করে রাখা যাবে৷ এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা অথবা রোগ নির্ণয়ের জন্যেও এ ভাবে মন্ত্রী-নেতাদের সুপারশি পাওয়া ‘ক্যাচ পেশেন্ট’দের বিশেষ খাতির-যত্নও করা হয়৷ মন্ত্রী-নেতাদের সুপারিশ অনুযায়ী এই বেড বুক করে রাখার বিষয়টি এসএসকেএম হাসপাতালের এক ‘অসুখ’৷ কারণ, এই ‘অসুখে’র জন্যই বিভিন্ন সময় মুমূর্ষু রোগীকেও ‘বেড নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের ‘সেরা’ এই সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে৷

শুধুমাত্র আবার এসএসকেএম হাসপাতালও নয়৷ কলকাতা সহ রাজ্যের অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও মন্ত্রী-নেতাদের সুপারিশ অনুযায়ী কোনও না কোনও ওয়ার্ডের বেড বুক করে রাখার প্রচেষ্টা জারি রয়েছে৷ একই সঙ্গে, এসএসকেএম হাসপাতাল সহ কলকাতার অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও  সক্রিয় রয়েছে দালাল চক্র৷ এবং, এই চক্রের মাধ্যমেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে কোনও রোগীর জন্য বেডের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাঁর পরিজনদের৷ পথ দুর্ঘটনায় জখম এক রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব হচ্ছে৷ এমনই অভিযোগে গত বুধবার ওই রোগীর পরিজনদের কাছে নিগ্রহের শিকার হন এসএসকেএম হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কর্তব্যরত এক জুনিয়র ডাক্তার৷ এই ঘটনার জেরে, নিরাপত্তা সহ চিকিৎসা পরিষেবার যথাযথ উন্নয়নে পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণের জন্য আট দফা দাবির ভিত্তিতে আন্দোলনে শামিল হয় এসএসকেএম হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ৷ আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বৃহস্পতিবার প্রায় নয় ঘন্টা ঘেরাও করে-ও রাখেন৷

ওই আট দফা দাবির মধ্যে ছিল, এসএসকেএম হাসপাতালে যেভাবে বিভিন্ন সময় কোনও না কোনও ওয়ার্ডের জন্য মন্ত্রী-নেতাদের সুপারিশের ভিত্তিতে বেড বুক করে রাখা হয়, তা বাতিল করতে হবে৷ কারণ, এ ভাবে বেড বুক করে রাখার জেরে বিভিন্ন সময় মুমূর্ষু রোগীকেও হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া যায় না৷ সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার এসএসকেএম হাসপাতালের ডিরেক্টর, এমএসভিপিরা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন, বেড বুক করে রাখা যাবে না৷ ipgmer.kolkata.03কোনও কারণে ওই বৈঠক ছেড়ে চলে যান ডিরেক্টর৷ তবে, বেড বুক করে রাখা যাবে না, এই নির্দেশে ডিরেক্টরের হয়ে সই করেন এমএসভিপি৷ হাসপাতালের এক ডাক্তারের কথায়, ‘‘ডিরেক্টরের সম্মতি না নিয়ে নিশ্চয় এই নির্দেশে সই করেননি এমএসভিপি? অথচ, এই নির্দেশের জেরেই শুক্রবার এমএসভিপিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন ডিরেক্টর৷’’ শেষ পর্যন্ত শুক্রবারই এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপিকে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপি পদে বদলি করে দেওয়া হয়েছে৷ এবং, এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপি পদে বসানো হচ্ছে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যানাটমি বিভাগের করবী বড়ালকে৷ অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপিকে বসানো হচ্ছে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপি পদে৷ এবং, নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপিকে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যানাটমি বিভাগে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷

কলকাতার আইপিজিএমইআর-এর এআইডিএসও-র ইউনিট সম্পাদক, ডাক্তার কবিউল হক বলেন, ‘‘জুনিয়র ডাক্তার নিগ্রহের প্রতিবাদে এবং রোগীদের স্বার্থে চিকিৎসা পরিষেবার যথাযথ উন্নতিতে জন্য পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণের জন্য আমাদের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল, মন্ত্রী-নেতাদের নামে হাসপাতালে কোনও বেড বুক করে রাখা যাবে না৷ ওই বেডে মুমূর্ষু রোগীকে ভর্তি করতে হবে৷ অনেকেই জানেন, মন্ত্রী-নেতাদের মাধ্যমে বেড বুক করে রাখার জন্য বহু মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন না৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের আন্দোলনের চাপে পড়ে কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, বেড বুক করে রাখা যাবে না৷ এই বিষয়ে নির্দেশও জারি হয়৷ কিন্তু, এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে এমএসভিপিকে শো কজ করেন ডিরেক্টর৷ এমনকী, এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে এমএসভিপিকে বদলিও করে দেওয়া হল৷ আমরা মনে করছি, রাজনৈতিক কারণেই এ ভাবে এমএসভিপিকে বদলি করা হল৷ আমরা যদি দেখি, বেড বুক করে না রাখার জন্য নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, তা হলে, রোগীদের স্বার্থে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাব৷’’ খোদ এসএসকেএম হাসপাতাল সহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজ এবং স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন আধিকারিকরাও মনে করছেন, রাজনৈতিক কারণেই এ ভাবে এমএসভিপিকে বদলি করে দেওয়া হল৷

যদিও, এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপির বদলির সঙ্গে সেখানকার বেড বুক করে রাখা যাবে না নির্দেশের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই বলেই দাবি করেছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনি বলেন, ‘‘এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপিকে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ১৫ দিন আগে৷ কোনও কোনও মহল থেকে রটানো হচ্ছে, বেড বুক করে রাখা যাবে না নির্দেশ দেওয়ার জন্য এমএসভিপিকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে৷ এটা রুটিন বদলির বিষয়৷’’ এই প্রসঙ্গে এমএসভিপি মানস সরকার এবং ডিরেক্টর মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য জানার জন্য ফোন করা হয়৷ তবে, ফোন না ধরায় তাঁদের বক্তব্য জানা যায়নি৷ যদিও, স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার এই ধরনের দাবি মানতে চাইছে না পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ডাক্তারদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম৷ এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপিকে যেভাবে বদলি করা হল, তার বিরুদ্ধে রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তাকে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে সরকারি ডাক্তারদের এই সংগঠন৷ ওই প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে, এসএসকেএম হাসপাতালের এমএসভিপিকে বদলির নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে৷ হাসপাতালে রোগী ভর্তির সময় ‘মিডলম্যান’-এর বিষয়টি বিলোপ করতে হবে৷ পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণ করে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবায় যথাযথ মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে৷

_________________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) সরকারি নির্দেশেই অকেজো মাল্টি-সুপার হাসপাতাল
(০২) ভালোবাসার অধিকার প্রাপ্তির জন্য আর্জি প্রধানমন্ত্রীকে
(০৩) হাসপাতালে বেড না মিললে পৌঁছে যেতে হবে কালীঘাটে!
(০৪) শাসকের দেউলিয়া রাজনীতিতে ডাক্তার-হাসপাতাল!
(০৫) সন্তানের পরিচয় জানাতে প্রথমেই আসুক মায়ের নাম!
(০৬) দলবদলের সঙ্গেই বাতিল করতে হবে জনপ্রতিনিধি-পদ
(০৭) ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না যৌনপল্লির ১৬% বাসিন্দা
(০৮) ৪.৫ কোটি ভুক্তভোগীতেও চাপা পড়ে যাবে সারদাকাণ্ড!
(০৯) যৌনকর্মী-সন্তানদের পড়াবেন উচ্চমাধ্যমিক-কৃতী ছাত্রী
(১০) ভারতের প্রথম ডানা-য় ফ্র্যানচাইজি খুঁজছে বাংলা-দুর্বার
(১১) কলকাতায় এ বার উবের ক্যাব চালাবেন যৌনকর্মীরা
(১২) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’
(১৩) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(১৪) সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

_________________________________________________________________