সৌমেন শীল, কলকাতা: শহর এখন বাংলা মিডিয়াম বিমুখ। বাংলা মিডিয়ামে পড়লেও সরকারি স্কুলের পথে যেতে হারিয়েছে আগ্রহ। পড়ুয়া সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বাংলা মিডিয়াম স্কুলে। নিজেদের জীবনের ভুলের পুনরাবৃত্তি সন্তানদের জীবনে ফের না নিয়ে আসতে বাংলা মিডিয়াম সরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের পাঠাতে নারাজ অভিভাবকেরা।

মূলত এই কারণেই শহরের সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে তলানিতে এসে ঠেকেছে পড়ুয়াদের সংখ্যা। রাজ্যের জেলাগুলিতেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। সরকারি স্কুলে ক্রমশ কমছে পড়ুয়াদের সংখ্যা। অন্যদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি স্কুলের বাড়ছে রমরমা। আকাশ ছোঁয়া খরচ হলেও সরকারি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়েছে মধ্যবিত্ত বাঙালি।

এই অবস্থায় কার্যত নতুন দিশা দেখাচ্ছে যাদবপুরের কাটজুনগর স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠ। সৌজন্যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজি মাসুম আখতার। পড়ুয়া টানতে স্কুল এবং স্কুলের পরিবেশকে আকর্ষনীয় করে গড়তে একগুচ্ছ প্রয়াস নিয়েছেন তিনি। স্কুলের মধ্যে আয়োজন করেছেন হট্টমেলার। তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসুত অপর একটি পরিকল্পনা হচ্ছে স্কুলের মধ্যে পড়ুয়াদের জন্য জিম।

কাজি মাসুম আখতার শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রবান্ধিক এবং সমাজসেবী। তিন তালাক বিল সহ নানাবিধ সামাজিক ইস্যু নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। তিন তালাক বন্ধের দাবিতে দিল্লিতে গিয়েও আন্দোলন করেছেন। সরকারি স্কুলে পড়ুয়া টেনে শিক্ষকতা পেশার ক্ষেত্রেও গড়েছেন বিশেষ নজির। যা নজর এড়িয়ে যায়নি রাজ্য সরকারের। ২০১৭ সালে কাজি মাসুম আখতারকে শিক্ষারত্ন সম্মান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

পুরষ্কার পেয়ে যেন কাজের উদ্যম আরও বেড়ে গিয়েছে কাটজুনগর স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক কাজি মাসুম আখতারের। পড়ুয়াদের শিক্ষার মানের উন্নতিতে নিয়ে চলেছেন একের পর নতুন প্রয়াস। স্কুলে পড়ুয়া টানতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রান্তিক গ্রামে চলে গিয়েছিলেন তিনি। যার সুফল পেয়ছে কাটজুনগর স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠ।

ডেঙ্গু সচেতনতার অনুষ্ঠান। ফাইল ছবি

শুধু পড়ুয়া এলেই তো হবে না, তাদের ধরে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে বজায় রাখতে হবে স্কুলে পড়ুয়া আসার ধারাবাহিকতা। সেই কারণেই স্কুলের পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের নিয়ে আয়োজন করতে শুরু করলেন ‘হট্টমেলা’। স্কুলের মধ্যেই বসে মেলা। খোলা হয় নানাবিধ খাবারের স্টল। সামিল করা হয় অভিভাবক এবং স্কুল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের। পড়ুয়াদের সৃজনশীলতা ফুটিয়ে তোলা হয় মেলার বিভিন্ন স্টলে। মেলায় কুপনের মাধ্যমে খাওয়া, লটারি ও খেলাধূলার আয়োজন করা হয়। ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষার পরে এই মেলায় পড়ুয়াদের অংশগ্রহণ থাকে নজরকাড়ার মতো। ২০১৭ সাল থেকে এই মেলা চালু হয়েছে। এই বছরে মেলার প্রধান অতিথি ছিলেন স্কুল পরিদর্শক শ্রীমতি লাছমি গঙ্গোপাধ্যায়।

এই বিষয়ে প্রধান শিক্ষক কাজি মাসুম আখতার জানিয়েছেন যে শুধু বই পড়লে আর বেশি নম্বর পেলেই ভালো পড়ুয়া বা ভালো মানুষ হওয়া যায় না। ভালো মানুষ হওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ প্রয়োজন হয়। তাঁর কথায়, “জ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে থাকে না। আর বইয়ের জ্ঞান যাতে পড়ুয়ারা আনন্দ করে গ্রহণ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই আমি মাঝে মাঝে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি।”

ডেঙ্গু সচেতনতার অনুষ্ঠান। ফাইল ছবি

তাই বলে স্কুলের মধ্যে জিম! এই বিষয়ে কাজই মাসুম আখতার বলেছেন, “শরীরচর্চা তো শিক্ষার একটা অঙ্গ। স্কুলে জিম থাকলে সমস্যা কোথায়?” জিম চালুর জন্য স্কুলে আলাদা ঘর করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় খুব শীঘ্রই অন্যান্য সরঞ্জাম চলে আসবে বলে জানিয়েছেন কাটজুনগর স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক। জিমে স্বল্প খরচে পড়ুয়া, অভিভাবক এবং স্কুল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা শরীরচর্চা করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই সব কিছুই যে পড়ুয়া টানার কৌশল তা একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন কাজি মাসুম আখতার। তাঁর মতে, “পড়ুয়া টানতে স্কুলের পরিবেশ এবং পঠনপাঠনের ধরনে বদল নিয়ে আসা দরকার। জোর করে নিয়ে আসা নয়, খুশি মনে যাতে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে আসে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”

সরকারি স্কুলে পড়ুয়া টানতে মিড-ডে-মিলের ব্যবস্থা করেছে সরকার। সেই উদ্যোগ কি কার্যকর হচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাবে কাজি মাসুম আখতার বলেছেন, “মিড-ডে-মিল খাওয়ার জন্য গ্রামের দিকে অনেকেই স্কুলে যায়। তবে কলকাতা বা সংলগ্ন এলাকায় এই প্রকল্প কার্যকর হয়নি।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, “মিড-ডে-মিলের প্রতি শহুরে লোকেদের কোনও আকর্ষণ নেই। শহরের গরিব ঘরের পড়ুয়াদেরও মিড-ডে-মিলের প্রতি অনীহা রয়েছে।”

বাংলা ভাষা বা বাংলা মিডিয়াম স্কুলের প্রতি বাঙালির অনীহা থেকে কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার লিখেছিলেন ‘বাংলাটা ঠিক আসেনা’ কবিতা। যা নিয়ে চর্চা হয় বিভিন্ন সময়ে। কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার পেশায় শিক্ষক ছিলেন। বাংলা মিডিয়াম এবং বাঙালিকে কটাক্ষ করে কবিতা লিখলেও পরিস্থিতি বদলের জন্য অন্য কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি তাঁকে। সেখানে বাংলা মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষকতার জগতে এক নয়া দৃষ্টান্ত কাজি মাসুম আখতার।