সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : নেতাজী থেকে রানী রাসমণি, সন্ধ্যা হলেই এদের নিয়ে ভুলে ভরা তথ্য ইতিহাস গিলে খাচ্ছে বাঙালি। সোম থেকে শুক্র এখন এটাই হয়ে উঠেছে বাঙালি পরিবারের ঠাকুমা মাসিমা, জেঠু, জেঠিমা, দাদুদের অভ্যাস। অভিযোগ উঠছে ইতিহাসকে বিকৃত করার। অভিযোগ উঠছে ইতিহাস বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে মহামানব, মানবীদের পরিবার থেকে। অভিযোগ প্রত্যেকটি পদে পদে এমন কিছু ঘটনা দেখানো হচ্ছে যেগুলো ইতিহাসের সন তারিখ সমস্ত ঘেঁটে দিচ্ছে।

সিরিয়ালের গল্পের গরু দেখে কেউ ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন সত্যিই কি এমন হয়েছিল? কেউবা সিরিয়ালের দেখানো ঘটনাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিচ্ছেন। প্রথম প্রশ্ন তুলেছেন রানী রাসমণির পরিবারের সদস্য চন্দ্রিমা দাস। তিনি সোশ্যাল মাধ্যমে লিখেছেন, “রানী রাসমণির জীবন নিয়ে টিভি সিরিয়ালের টিআরপি বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। কেন একটা পরিবারের ২০০ বছরের পুরনো ইতিহাসকে এভাবে দেখানো হচ্ছে বুঝছি না। স্বমহিমায় আলোকিত রানী মা’কে আরও বড় করে দেখানোর জন্য পরিবারের অন্য ব্যক্তিত্বদের ছোট করা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং কুরুচিকর।”

একইসঙ্গে তিনি লিখেছেন , “সিরিয়ালটিতে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বলে কিছু নেই।” উদাহরণ স্বরূপ তিনি দেখিয়েছেন রামকৃষ্ণদেবের লীলা খেলা এবং বাবু রাজচন্দ্রের মৃত্যু সময়কাল। সিরিয়ালে এই ঘটনা দুটি প্রায় একই সময়ে দেখানো হয়েছে। অথচ ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী ১৮৩০ সালে বাবু রাজচন্দ্রের মৃত্যু হয়, রানীর তৎকালীন বয়স চল্লিশের আশেপাশে। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জন্ম তার ৬ বছর পড়ে অর্থাৎ ১৮৩৬ সালে। এই ছয় বছরের ইতিহাস এক জায়গায় এনে মারাত্মক ভুল তথ্য বাঙালিকে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন চন্দ্রিমা দাস।

রাজকুমার রায়চৌধুরী সদ্য একটি পর্বের ভুল তথ্য বলে দাবি করেছেন। সেই ঘটনা রাজচন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজচন্দ্রের সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের কলহের এবং সেখানে বিদ্যাসাগরের উপস্থিতি বিদ্যাসাগর হিসাবেই। রাজকুমার রায়চৌধুরি বলেছেন, “সন্দিহান হতে হয় বাবু রাজচন্দ্র, রানী রাসমনি ও বিদ্যাসগরের মধ্যে পাতানো পিসি ভাইপো সম্পর্ক দেখে। ইতিহাসে সত্যই কি এরকম কিছু ঘটেছিল? আসুন দেখি একটু ইতিহাস ঘাঁটি। রানী রাসমনির জন্ম হয়েছিল ১৭৯৩ সালে। মাত্র ১১ বছর বয়সে কলকাতার জমিদার বাবু রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। সাল হিসাবে দেখতে গেলে ১৮০৪ সাল। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্রের জন্ম হয় ১৮২০ সালে। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি কলকাতা পাড়ি দেন। সাল যদি ধরি তবে হবে ১৮২৯। এবার একটা চমক দি। ১৮৩০ সালে বাবু রাজচন্দ্র দাস মারা যান। অর্থাৎ রানী রাসমণির জীবনে বৈধব্য নেমে আসে। হিসাব বলছে ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স তখন ১০। আমার প্রশ্ন মাত্র ৯ বছর বয়সে ঈশ্বর এসেই সমাজসংস্কারক হয়ে গেলেন? ১০ বছর বয়সেই তর্কালঙ্কার মহাশয়ের সাথে হিন্দুশাস্ত্র নিয়ে তর্ক জুড়ে দিলেন? তবে তিনি পড়াশুনা করলেনই বা কবে আর বিদ্যাসাগর উপাধি অর্জন করলেনই বা কবে? একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না!”

নেতাজি সিরিয়াল শুরু হওয়ার প্রথম পর্ব থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। গানের ব্যাবহারের সময়কাল দেখানো নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’ গানটি রচনাকাল ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ। নেতাজী গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন ১৯০৫ এর প্রেক্ষাপটে এই গানটি স্বদেশীরা গাইছেন এটা কিভাবে দেখানো হল? শরৎ বসু এবং তার স্ত্রী বিভাবতী দেবীর বিবাহের অতিনাটকীয়তা বহু দর্শকের মনেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সিরিয়ালের এক নিয়মিত দর্শক জানিয়েছেন , “আজ জি বাংলায় নেতাজি সিরিয়াল দেখার সময় শরৎ চন্দ্র বসুর ও বিভা দিদির ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, জি বাংলা এই সব ঘটনা কোথা থেকে সংগ্রহ করল। শরৎ চন্দ্র বসুও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তাঁকে নিয়ে অসত্য দৃশ্য না দেখালে কি ভালো হত না।” প্রশ্ন উঠেছে দু’জনের বিবাহে বালক সুভাষের মিডিয়েটর হিসাবে কাজের ঘটনা এবং তাঁদের বিবাহ নিয়ে বিভাবতী দেবী ও তাঁর মায়ের ঝগড়া। মাঝে এক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যিনি আবার বিভাবতী দেবীর পছন্দের। শরৎ বসুকে নাপসন্দ হবার কারণ তাঁর স্বদেশী আন্দোলন।

এদিকে এই দুই অতি জনপ্রিয় সিরিয়ালের গল্পকার শাশ্বতী ঘোষ। যখন নেতাজী সিরিয়াল শুরু হয়েছিল তার আগে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তাঁদের লক্ষ্য বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐহিত্য ও অতীত গৌরবকে দর্শকের সামনে তুলে ধরা। নেতাজি শুধু বাঙালির গর্ব নন, তিনি সারা দেশের গর্ব। তিনি একজন জাতীয় নায়ক। নেতাজি সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের প্রতীক। তাঁর জীবন চিরকাল মানুষ অনুপ্রেরণা জুগিয়ে এসেছে। তাই তাঁরা নেতাজির জীবন নিয়ে এগিয়েছে। এই বিষয়ে বসু পরিবার এবং নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর সাহায্য নিয়েছেন তাঁরা।

ধারাবাহিকের রিসার্চার শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন , মূলত এই ধারাবাহিকের কাহিনী অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর ‘উদ্যত খড়্গ’-এর উপর আধারিত। গল্পের প্রয়োজনে সুভাষচন্দ্রের নিজের লেখা ‘তরুণের স্বপ্ন’ ও ‘ভারত পথিক’ বই থেকেও সাহায্য নেওয়া হয়েছে। নেতাজির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি তুলে ধরার সঙ্গে ধারাবাহিকের গল্প মসৃণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু কল্পকাহিনী শিল্পীর স্বাধীনতায় তুলে ধরা হবে সেটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। রানী রাসমণি ধারাবাহিকের ক্ষেত্রেও একই বক্তব্য ছিল প্রোডাকশনের। গবেষক থেকে বিখ্যাত বরণীয় ব্যক্তিত্বের পরিবারের একাংশের প্রশ্ন এখানেই। তথ্য দিয়ে তাঁরা জানতে চাইছেন ঠিক কিভাবে এমন ভুল তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে? কল্পকাহিনী খাতিরে কিছু অংশ মেনে নেওয়া গেলেও সাল তারিখ সময়কাল ওলটপালট করে দেওয়া তাঁদের যথেষ্ট বিব্রত করেছে।

এই সিরিয়ালের লেখিকা হলেন শাশ্বতী ঘোষ, যিনি বেহুলা, এস মা লক্ষ্মী সিরিয়াল গুলো লিখেছিলেন আর যাঁর গবেষণায় এই জনপ্রিয় সিরিয়ালটি গড়ে উঠেছে তিনি অতি জনপ্রিয় সাংবাদিক শিবাশিষ বন্দোপাধ্যায়।