প্রসেনজিৎ চৌধুরী: চোখ রাখছে ভারত। তীক্ষ্ণ নজর চিনের। জল মাপছে পাকিস্তান। নজর রেখেছে আন্তর্জাতিক মহল-রাষ্ট্রসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-জার্মানি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া। ছোট্ট বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের গতি প্রকৃতি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হ্যাট্রিক নাকি বিরোধীদের ক্ষমতায় আসা? এসব নিয়েই হচ্ছে আলোচনা।

মায়ানমারের সঙ্গেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকায় ‘ব্রহ্মদেশ’- জুড়ে চলছে আলোচনা। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ইস্যু ঘিরে গত বছর লাগাতার উত্তপ্ত ছিল মায়ানমার-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক। অবশেষে রাষ্ট্রসংঘে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে প্রশংসিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে নিজের দেশে আশ্রয় দিয়ে কুড়িয়েছেন সুনাম। আবার সেই ইস্যুতেই মায়ানমারের প্রধান নেত্রী তথা আউং সান সু কি সমালোচিত হয়েছেন প্রবল। তাঁর নোবেল ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে উত্তাল হয়েছে দুনিয়া। এরই পাল্টা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নোবেল সম্মান দেওয়ার দাবিও উঠতে শুরু করেছে।

এই মুহূর্তে বিশ্বের ২৬তম শক্তিধর মহিলার একজন বঙ্গবন্ধু কন্যার সামনে তাই ৩০ ডিসেম্বর দিনটা প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনেই হচ্ছে বাংলাদেশের একাদশ তম জাতীয় নির্বাচন।

সোমবার থেকেই শুরু হয়ে গেল নির্বাচনের প্রচার পর্ব। প্রার্থীরা প্রতীক চিহ্ন হাসিল করে ভোট যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করলেন। ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ বনাম বিরোধী বিএনপি ও তাদের মিলিত জাতীয় ঐক্য জোটের সম্মুখ সমরের দামামা বেজে গেল পদ্মাপারের নির্বাচনে।

নজর ফেরানো যাক ভারতের দিকে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার মতো দুই বাংলাভাষী রাজ্যের মানুষ তাঁদের ঘরের কাছের দেশ-বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী। কলকাতা, আগরতলার বিভিন্ন সংবাদপত্র, ওয়েব সংবাদ মাধ্যম, টিভি-তে রোজই থাকছে সেই সংক্রান্ত খবর। ঠিক তেমনই অসমের বরাক উপত্যকার শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জবাসীও প্রতিনিয়ত লক্ষ্য রেখে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জেলবন্দি অন্যতম বিরোধী নেত্রী তথা বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া আর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহম্মদ এরশাদের অবস্থানের দিকে।

অসমের মতোই অপর সীমান্তবর্তী রাজ্য মেঘালয়, মিজোরামেও ছড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া।

বাংলাদেশের নির্বাচনকে সুষ্ঠু দেখতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে চাইছে। সেই কারণে গত কয়েক বছর ধরে হয়েছে লাগাতার গুম-অপহরণের ঘটনা। এই বিষয়টি নিয়েও সরকার সমালোচিত হয়েছে বিশ্ব মহলে। ‘প্রকাশ্যে গুম করা’র অভিযোগের রিপোর্ট ঘিরে আলোড়িত হয়েছে দুনিয়া।

গত দশম জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশে টানা দু বারের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। আর নির্বাচনে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলে গণতন্ত্র বাঁচাও আন্দোলনে হিংসাত্মক পরিবেশ তৈরির দায় গিয়ে পড়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উপরেই। শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেই সব ঘটনায়। নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষের জেরে বারে বারে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ।

এরই পাশাপাশি জিয়া চ্যারিটেবল সোসাইটির আর্থিক দুর্নীতির মামলায় জেলে গিয়েছেন খালেদা জিয়া। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে হওয়া সবকটি জাতীয় নির্বাচনে তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রবল। মুসলিম দুনিয়ার দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া জেলে থাকার মেয়াদ দু-বছরের বেশি হওয়ায় তাঁর এবারের ভোটে অংশ নেওয়া হচ্ছে না। সেই অর্থে বেগম বিহীন নির্বাচনও বিশেষ লক্ষণীয়।

নয়াদিল্লি-বেজিংয়ের নজর:

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবেই হোক-কূটনৈতিক স্তরে এমনই বার্তা দিয়েছে ভারত ও চিন। ঢাকায় দুই দেশের দূতাবাসের তরফে তেমনই জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, চিন যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়িয়ে নিতে তৎপর ও প্রবেশ কিছুটা সফল হয়েছে তাতে ধাক্কা খেয়েছে ভারত। পাকিস্তান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা, মালদ্বীপে চিনা উপস্থিতি নিয়ে চিন্তিত দিল্লি। সর্ব শেষ ভুটানেও তার প্রভাব বাড়ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগের বার্তা দিয়ে ভারতকে বড়সড় চিন্তায় ফেলেছে চিন। যদিও ঢাকা থেকে জানানো হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে সবথেকে বড় বন্ধুর ভূমিকা নেওয়া দিল্লির সঙ্গে স্বাভাবিক মিত্রতা বজায় রাখা হবে।

সংখ্যালঘু ইস্যু:

কূটনৈতিক টানাপোড়েন মাঝেই চলছিল নির্বাচনী পর্বগুলি। তাতে বারে বারে উঠে এসেছে বিরোধী বিএনপি নেত্রীর বন্দি প্রসঙ্গ ও দেশটির সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের উপর ক্রমাগত হামলার দিকটিও। একাধিক উগ্র ইসলামি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মদতে যেভাবে আক্রান্ত হয়েছেন সংখ্যালঘুরা তাতে উদ্বিগ্ন ভারত। তবে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ ইমেজ ধরে রাখবে বলে জানিয়ে দেয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়ে দেন-ধর্ম যার যার উৎসব সবার। কোনওভাবেই উগ্র ধর্মীয় কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না।

যে উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শে আচ্ছন্ন হয়ে ঢাকার গুলশনে হোলি আর্টিজান ক্যাফে হামলা হয়েছিল তাকে দমন করে প্রশংসিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। গুলশন হামলার পরবর্তী একাধিক নাশকতা রুখে দিয়েছে তাঁর সরকার। ধংস করা হয়েছে বিভিন্ন জঙ্গি ঘাঁটি।

তবে হামলার আশংকা থাকছেই জাতীয় নির্বাচনে। ঢাকার বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবর সোমবারের পর থেকে প্রার্থীদের প্রচার ও পাল্টা বিরোধীদের প্রচারে উত্তপ্ত হতে চলেছে পরিবেশ। লন্ডনে থাকা খালেদা পুত্র তথা বিএনপির অপর সুপ্রিমো তারেক রহমান জানিয়েছেন প্রতিটি বুথে ৩০০ জন করে সমর্থক থাকবেন। তারই পাল্টা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরাও সমপরিমাণ লোক রাখতে চলেছি। বুথ ভিত্তিক এই জমায়েত ভোট ঘিরে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরি করবে এমনই আশঙ্কা থাকছে বেশি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবথেকে বড় সাফল্য মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট পাঠানো এবং সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থের তৈরি হতে চলা এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ পদ্মা সেতু প্রকল্প। বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেয়েছে এই দুই উদ্যোগ।

তবে স্বনির্ভরতার দিকে ক্রমাগত এগিয়ে চলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নির্বাচনে বড়সড় কাঁটা হয়ে থাকল-তিস্তার জল বণ্টন। কূটনৈতিক উপায়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে আরও সময় দরকার শেখ হাসিনার। নির্বাচনের ফলাফল বলে দেবে বাংলাদেশবাসী বঙ্গবন্ধু কন্যাকে সেই সময় দিতে চাইছেন কিনা।

2 COMMENTS

Comments are closed.