সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: জামাই হিসেবে ফিরোজ গান্ধীকে কখনই তেমন পছন্দ করতেন না জহরলাল নেহরু৷ তেমনই আবার জামাইকে দেখা যেত নানা সময়ে শ্বশুর অথবা তাঁর সরকারের কাজের ত্রুটি বিচ্যুতির সমালোচনা করতে৷ এটা ঘটনা, স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বহু দেশিয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠী ক্রমশ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে থাকে ৷ বাণিজ্যের সঙ্গে রাজনীতির এই যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে আর্থিক অনিময় মাথাচাড়া দিতে থাকে৷ আর একজন সাংসদ তথা ন্যাশনাল হেরাল্ডের মতো কাগজের দায়িত্বে থাকায় সুবাদে ফিরোজ গান্ধীও সেই সব আর্থিক অনিয়মই তুলে ধরতে সক্রিয় হন৷

জামাইয়ের এহেন আচরণের ফলে শ্বশুর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর বিড়ম্বনা বাড়তে থাকে৷ সেই সময় দুর্নীতি বিরোধিতায় প্রায়শই সংসদে সবর হতে দেখা যেত ফিরোজ গান্ধীকে ৷ বিশেষত,সরকার নিয়ন্ত্রিত জীবন বিমা সংস্থা (এলআইসি) ঘিরে হরিদাস মু্ন্দ্রার কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এনে গোটা দেশ তোলপাড় করেছিলেন তিনি৷ কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ফাটকাবাজ হরিদাস মুন্দ্রার সেদিনের কাণ্ডকারখানাই স্বাধীন ভারতের প্রথম আর্থিক কেলেঙ্কারি৷ যার ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু সরকারের ভাবমূর্তি চরম ভাবে ধাক্কা খায়৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে সেই সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী টি টি কৃষ্ণমাচারি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷

১৯৩৩ সালে ফিরোজ প্রথম ইন্দিরাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তখন ইন্দিরা মাত্র ১৬ বছরের৷ অত কম বয়েস হওয়ায় ইন্দিরা এবং তাঁর মা কমলা নেহরু ওই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে করেননি৷ যদিও নেহরু পরিবারের সঙ্গে যথেষ্ঠ ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই পার্সী যুবক৷ বিশেষত কমলা নেহরু টিবি-তে আক্রান্ত হলে সেই সময় তাঁর চিকিৎসার জন্য স্যানেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার সময় পাশেই থাকতেন ফিরোজ৷ ইউরোপে তাঁর চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি উদ্যোগী হয়ে সব ব্যবস্থা করে দেন৷ ১৯৩৬ সালে কমলা নেহরু মারা যান৷ এরপর ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ইন্দিরা এবং ফিরোজ ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হন এবং ১৯৪২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়৷ তবে বিয়ে মেনে নিতে পারেননি জহরলাল৷ ফিরোজ এবং ইন্দিরার বিয়ে ভাঙার জন্যে খোদ মহাত্মা গান্ধীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি বলে শোনা যায়৷ দেশ স্বাধীন হলে নেহরু হন প্রধানমন্ত্রী অন্যদিকে ফিরোজ-ইন্দিরা তাঁদের দুই সন্তান রাজীব ও সঞ্জয়কে নিয়ে প্রথমে এলাহাবাদে সংসার শুরু করেন৷ তখন নেহরু প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল হেরাল্ড কাগজের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফিরোজকে৷ ১৯৫২ সালে উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলি থেকে সাংসদ হন ফিরোজ গান্ধী৷ সাংসদ হওয়ার পর থেকেই ফিরোজ সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে থাকেন৷

১৯৫৫ সালে ফিরোজ গান্ধী প্রকাশ করেন একটি ব্যাংক এবং একটি বিমা সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে রামকৃষ্ণ ডালমিয়া কেমন করে ওই সব সংস্থার তহবিলকে বেআইনি পথে তাঁর ব্যক্তিগত কাজে লাগানো হয়েছে ৷ এরই জেরে ডালমিয়ার দু’বছরের জেল হয়৷ তাঁকে তিহার জেলে পাঠান হলেও তিনি অবশ্য ওই সময়ের বেশির ভাগটাই অসুস্থতার দোহাই দিয়ে হাসপাতালেই কাটান৷ পাশাপাশি সেই সময় ফিরোজকে সক্রিয় হতে দেখা যায় বেশ কিছু সংস্থাকেই রাষ্ট্রায়ত্ত করার জন্য৷ যার ফলে গড়ে উঠল রাষ্টায়ত্ত জীবন বিমা নিগম৷ সেই সময় তিনি টাটা গোষ্ঠীর টেলকো-কে রাষ্ট্রায়ত্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি লক্ষ্য করেছিলেন টাটারা জাপানি ইঞ্জিনের দ্বিগুণ দাম চার্জ করছিল৷ এই নিয়ে পার্সী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা গোল বাধে৷ ফিরোজের মতো টাটারাও তো পার্সী ছিলেন৷

১৯৫২ সালের মতোই ফের ১৯৫৭ সালেও রায়বেরিলি থেকে ফের জিতে সংসদে আসেন ফিরোজ গান্ধী৷ তারপরে তাঁর নজরে আসে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ফাটকাবাজ হরিদাস মুন্দ্রা কেমন ভাবে জীবন বিমা নিগমে তার প্রভাব খাটাচ্ছেন৷ ফলে একেবারে মু্ন্দ্রার কাজকর্ম নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলেন তিনি৷ ট্রেজারি বেঞ্চে বসেই তিনি সরকারের কাছে জানতে চান- নতুন করে গড়ে ওঠা জীবন বিমা নিগম আদৌ কি তাদের সাড়ে পাঁচ কোটি পলিসি হোল্ডারকে জানিয়ে বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে শেয়ার কিনেছে ? তাঁর অভিযোগ ছিল, এই সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ করেন কুখ্যাত ফাটকাবাজ হরিদাস মু্ন্দ্রা৷

ফলে এমন জটিল পরিস্থিতিতে সংসদে একেবারে জামাইয়ে মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী নেহরু৷ ক্ষুব্ধ স্বয়ং অর্থমন্ত্রী কৃষ্ণমাচারি, যিনি নিজে একজন শিল্পপতি ৷ তিনি প্রথমে ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে চাইলেও পরে স্বীকার করে নেন তেমন ঘটনা ঘটেছে৷ এই দুর্নীতি জানাজানি হওয়ার পর সরকার বাধ্য হয় তদন্ত কমিটি গড়তে৷ বম্বে হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম সি চাগলাকে নিয়ে এক সদস্যে তদন্ত কমিটি গড়া হয়৷

২৪ দিন ধরে শুনানির সময় বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেছিলেন৷ এই ভাবে শেয়ার কেনার মাধ্যমে বাজারে চাঙ্গা হবে বলে অর্থমন্ত্রক থেকে দাবি করা হলেও বহু বিখ্যাত স্টক ব্রোকার যারা জীবন বিমার ইনভেস্ট কমিটিতে ছিলেন, তারা জানিয়ে দেয় তা আদৌ ঠিক নয়৷ তাছাড়া জীবনবিমা তার ইনভেস্টমেন্ট কমিটির কাছ পরামর্শ নিতে গেলে তখন তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুন্দ্রার শেয়ার নিয়ে জালিয়াতি করার ব্যাপারে৷ যারা এই বিষয়ে প্রমাণ দাখিল করেছিলেন,তাদের মধ্যে ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (অধুনা আইসিআইসিআই)-র ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এইচ টি পারেখ৷ তিনি আবার ছিলেন জীবন বিমার ইনভেস্টমেন্ট কমিটির সদস্য৷ তারপরে বিচারপতি চাগলাদার নির্ধারণ করেন অর্থ সচিব হরিভাই এম প্যাটেল এবং জীবনবিমার দুই আধিকারিকের আঁতাতে যে পেমেন্ট হয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার৷ পরবর্তীকালে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ভিবিয়ান বোসের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি দুজন সিভিল সার্ভেন্টকে অব্যাহতি দিলেও ‘মিথ্যা’ বলার জন্য অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন৷

পুরো বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী টিটি কৃষ্ণমাচারিকে চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছিল৷ আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি নিজেকে আদৌ এলআইসি-র এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করে, তা অর্থসচিব নিয়েছে বলে চালাতে চান৷ যদিও বিচারপতি চাগলাদার সংবিধান অনুসারে মন্ত্রীকেও দায়ী করেন৷ এর জেরে কৃষ্ণমাচারি বাধ্য হন পদত্যাগ করতে৷ ফলে বলাই বাহুল্য পুরো ঘটনায় নেহরু সরকারে মর্যাদা নষ্ট হয়েছিল৷ ওদিকে দিল্লির বিলাসবহুল হোটেল থেকে হরিদাস মুন্দ্রাকে গ্রেফতার করা হয়৷