প্রসেনজিৎ চৌধুরী: পরাজয় হয়েছিল যুদ্ধে ৷ তারপরেও ভারতীয় কবি (তখনও নাগরিকত্ব পরিবর্তন করেননি) কাজী নজরুল ইসলামকে সম্মান জানিয়েছিল পাকিস্তান৷ ১৯৬৫ সালের ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের পর সরকার বিরোধী আন্দোলনের চাপে নতজানু হয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান৷

সরকারি দমন নীতির প্রতিবাদ ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তখন উত্তাল হতে শুরু করেছে পূর্ব পাকিস্তান৷ সেই সময়ই নজরুল ইসলামের নামে ডাক টিকিট প্রকাশ করে পাকিস্তান সরকার৷ ১৫ ও ৫০ পয়সা দাম৷ উর্দু, বাংলা, ইংরাজিতে লেখা দেশের নাম৷ সঙ্গে বাংলায় লেখা ‘গাহি সাম্যের গান…’৷

তখন অবিভক্ত ভারত৷ ১৯৩৮ সাল৷ চলচ্চিত্র ‘গোরা’ মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায়৷ সেই চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছিল৷ সব বিতর্ক চাপা পড়ে কবিগুরু যখন নিজের গান গাইবার পূর্ণ অধিকার নজরুল ইসলামকে দিয়ে দেন৷ ছবিতে নজরুল ইসলামের সঙ্গীত পরিচালনা রবীন্দ্রনাথের গান ভিন্ন মাত্রা পায়৷

১৯৩৮ এর ভারত অবিভক্ত৷ মাত্র ন’বছরের মাথায় ১৯৪৭ সালেই ভারত দ্বিখণ্ডিত৷ তার দু’দিকে পাকিস্তান৷ কবি নজরুল ইসলাম ভারতীয় নাগরিক৷ দেশভাগের যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছেন৷ আবার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বিরুদ্ধে কলম ধরছেন৷ সীমান্তের দুই পারে সাম্যবাদী কবির গান-কবিতা গুঞ্জরিত হচ্ছে৷ নতুন তৈরি হওয়া পাকিস্তানের পূর্ব প্রান্তে বাংলাভাষীদের আধিক্য৷ সেখানে সমান জনপ্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম৷ একইসঙ্গে তাঁর লেখায় মোহিত কলকাতা-ঢাকার পাঠককুল৷ অচিরেই কবির গান পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানে৷

’৬৮ সালে খোদ পাকিস্তানে আয়ুব শাহীর পতনের দাবিতে জমাট আকার নেয় গণ আন্দোলন৷ প্রবল রাজনৈতিক উত্তাপে ফুটতে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান৷ তখন লাখো বাংলাভাষী পাকিস্তানির সরকার বিরোধী মহা মিছিলের স্লোগানে বিদ্রোহী কবির উপস্থিতি৷ তীব্র গণ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন দেশ তৈরির সংগ্রাম দৃঢ় হতে শুরু করে৷ সংগ্রামের পরবর্তী সময়টি ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামেই পরিচিত৷ রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর ভেঙে যায় পাকিস্তান৷ তৈরি হয় বাংলাদেশ৷

বিদ্রোহী কবি তখন কলকাতায় থাকেন৷ অসুস্থ৷ তাঁর কলম থেমে গিয়েছে৷ কাজী নজরুল ইসলামকে নাগরিকত্ব প্রদান করে জাতীয় কবির মর্যাদা দিতে চায় বাংলাদেশ সরকার৷ এই মর্মে ভারত সরকারে কাছে অনুরোধ জানানো হয়৷ বাংলাদেশে চলে যান কবি নজরুল৷ তাঁর সম্মানে বিভিন্ন সময়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার৷

পরে ভারত সরকারের তরফে কাজী নজরুল ইসলামের নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়৷ তিন টাকার সেই পোস্টাল স্ট্যাম্প প্রকাশের বছর ১৯৯৯ সাল লেখা রয়েছে৷ সঙ্গে হিন্দি ও ইংরাজিতে কবির নাম৷
কাজী নজরুল ইসলাম এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ হয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত থেকে৷ এমন নজির প্রায় বিরল৷ এক আশ্চর্য ইতিহাস৷ ঠিক যেন কবির লেখা নার্গিস বনের বুলবুলির মতো নীরব৷

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV