সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : দিনটা এই ২৫ শে জানুয়ারি। জাতীয় ভোটার দিবস। এই দিনে ভোটার তালিকা তৈরি হয়। ভোট দেওয়ায় উদ্যোগী করতে কাজ কর্ম করা হয়। এই কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালে। নেতৃত্বে এক বাঙালি। তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ ভারতের প্রত্যেকটি নির্বাচন।

সালটা ১৯৫০।ভারতীয় গনতন্ত্রের এক বিশেষ দিন।গঠিত হলো ভারতের নির্বাচন কমিশন। জহরলাল নেহেরু গর্বিত কন্ঠে বললেন, “স্বাধীন ভারতে মাথা তুলে দাঁড়াবে গনতন্ত্র। মানুষ পাবে শাসক নির্বাচনের অধিকার। ঔপনিবেশিক ভারত তকমা পেতে চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম সংসদীয় গনতন্ত্রের। উপনিবেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উঠে আসার দীর্ঘ রাস্তাটা সহজ ছিলো না। কিন্তু এই গনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার রাস্তাটা আরও অনেক কঠিন।আগামী কাল কার্যকর হতে চলেছে সংবিধান। আর তার আগেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি গঠন করে ফেলতে হবে।আমরা প্রত্যয়ী আমরা পারবো।”

কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান গঠন করতে বসে নেতাদের চোখ কপালে।সব রিপোর্ট খতিয়ে দেখে গোপালাচারী বললেন, এ তো সমস্যার হিমালয়। ১৫ কোটির ওপরে ভোটার। এতো ভোটার রাশিয়া বাদ দিলে বাকি ইউরোপে নেই।রাজেন্দ্র প্রসাদ বললেন, “এতো রকম ভাষা। এতো বাধা বিঘ্ন। দুর্গম পাহাড়,জঙ্গল,দ্বীপ,মরু অঞ্চল যাদের অনেক অধিবাসীদের সঙ্গে সভ্য সমাজের কোন যোগাযোগ নেই। অনেক উপজাতীয় সম্প্রদায় আছে যারা নিজস্ব গোষ্ঠী শাসনে বিশ্বাসী। এদের কাছে পৌঁছানো,এদের গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আনা অসম্ভব প্রায়।সবচেয়ে বড় সমস্যা জনগনের ৮৫% অশিক্ষিত শুধু নয়,একেবারে নিরক্ষর।”

নেহেরুজি হতাশ কন্ঠে বললেন, এখন কী হবে? পিছিয়ে আসতে হবে প্রক্রিয়া থেকে? কিন্তু এ তো দেশের লজ্জা, ইংরেজরা কবে থেকেই বলে আসছে ভারতীয়রা স্বাধীনতা পাবার যোগ্য নয়। তবে কি সে কথা প্রমান হয়ে যাবে? মুখ পুড়বে দেশের? চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন জওহরলাল, প্যাটেল, রাজাগোপালাচারির মতো নেতারা। কাকে দেওয়া হবে এই নির্বাচনের দায়িত্ব।আলাপ আলোচনায় কাটল মাস দুই। যোগ্য লোক পাওয়া দুষ্কর। শেষে নজরে এলেন এক বাঙালি প্রশাসক। তিনি বাংলার চিফ সেক্রেটারি সুকুমার সেন। স্বাধীনতার পর থেকে দাঙ্গা,উদবাস্তু,অনাহার সমস্যায় জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব তিনি সামলাচ্ছেন দুরন্ত দক্ষতার সাথে। দেখা যাক তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে। ২৫শে মার্চ ১৯৫০ সালে দায়িত্ব নিলেন তিনি।

তিনি দায়িত্ব নিলেন, এবং নামলেন অনেকগুলি পরীক্ষা দিতে। অনেকেই তাঁর নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন,জবাব দিতে হবে তাদের।জবাব দিতে হবে ইংরেজদের তাচ্ছিল্যের।সারা বিশ্ব সাগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে ভারতীয় গনতন্ত্রের দিকে,কেমন করে সফল হয় এই অসম্ভব কাজটি। আর সবার ওপরে রয়েছেন প্রশাসকগন,যারা ভরসা রেখেছেন তাঁর ওপরে।সংকল্পে অটল তিনি। প্রথম চিহ্নিত করলেন সমস্যাগুলি।সমস্যা বহু,জানালেন কর্তৃপক্ষকে।আশ্বাস পেলেন যতদূর সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

সমস্যা প্রধান হোল নিরক্ষরতা। ঠিক হল প্রার্থীর নামের সাথে প্রতীক চিহ্নও ব্যবহার করা হবে। তিনি প্রচুর অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে দলের সঙ্গে প্রতীকের সম্পর্ক, ভোট দানের পদ্ধতি, এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে বোঝানোর কাজ শুরু করলেন।প্রত্যেক থানাকে নির্দেশ দেওয়া হোল অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ করে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের তালিকা তৈরি করার। এখানে দেখা গেলো নতুন সমস্যা।

উত্তরপ্রদেশ,বিহার,মধ্যপ্রদেশের অনেক মহিলার নাম নেই। অমুকের মা, তমুকের স্ত্রী বা কন্যা নামে তাদের পরিচয়। তাদের ভালো নাম কিছু নেই। নতুন করে তাদের নাম দেওয়া হোল।নথিবদ্ধ হলো সেই সব নাম। অনেকে জানেনা বয়স। ডাক্তারি চেক আপের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক নির্ধারণ শুরু হল।তৈরি হতে লাগলো ভোটার লিস্ট। একবছরের চেষ্টায় গঠিত হলো ভোটার লিস্ট। ১৭.৬ কোটি ভোটার। ভোটারের সংখ্যা দেখে আবার চোখ কপালে উঠলো নেতাদের। আর চশমা চোখের নিরীহ চেহারার মানুষটির চোয়াল আরও শক্ত হলো প্রতিজ্ঞায়।

পরের সমস্যা দুর্গমতা। অনেক অঞ্চল আছে যা জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। সরকারের সাহায্য চাইলেন সুকুমার সেন। সরকারের উদ্যোগে সার্ভে হলো। অজস্র রাস্তা সেতু নির্মাণ হলো। সংযোগ স্থাপিত হলো দূরবর্তী অঞ্চলে। নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা পৌঁছে গেলো গ্রামে গ্রামে। খাতা কলম নকল ব্যালট নিয়ে বোঝানো শুরু হলো। ভাষা সমস্যার জন্য স্থানীয় ভিত্তিতে নিয়োগ হলো কর্মী,উপজাতিদের বোঝানো হলো রাষ্ট্রের গুরুত্ব,নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা। দূর হতে লাগলো বাধা। প্রসারিত হতে লাগলো বৃহত্তম গনতন্ত্রের রাস্তা।

এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।বিশ্বের অনেক দেশের মিডিয়ার নজর ভারতের দিকে। ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর। হিমাচল প্রদেশের একদল বৌদ্ধ ভোটার ভোট দিয়ে শুরু করলেন ভারতীয় গনতন্ত্রের শুভ সূচনা। অক্টোবর থেকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ৪ মাস ধরে চলল নির্বাচন। সেনাপতির মতো নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সুচারুভাবে সবটা সম্পন্ন করালেন এই সুকুমার সেন।সব আশঙ্কার কালো মেঘকে দুর করে উদিত হলো ভারতীয় গনতন্ত্রের নতুন সূর্য। আর এই অসম্ভব কাজ সম্ভব করে দেখালেন বাংলা মায়ের এক হার না মানা দক্ষ প্রশাসক সুকুমার সেন।

আজ ২৫ জানুয়ারি জাতীয় ভোটার দিবস। গনতন্ত্রের বহু তত্ব কথা,জয়গান গাওয়া হবে আজ। অনেকেরই অজানা থেকে যাবে ভারতের গনতন্ত্রের সেই ভগীরথ এর কথা। তাই আজ স্মরণ করি তাকে,সেই অদম্য সন্তান সুকুমার সেনকে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশগঠনের কাজে বাঙালি কেবল পিছিয়ে পড়েছে বলে বদনাম আছে। ফুটবল ক্রিকেট থেকে প্রশাসন সর্বত্রই বাঙালির সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান।বাঙালি বড়ো লক্ষ্য,বড়ো স্বপ্নের কথা ভাবতে ভুলে যাচ্ছে। এমন অবক্ষয়ের সময় এই সুকুমার সেন এর আদর্শ প্রেরণা দিক যুবসমাজকে। বাঙালি আবার প্রস্তুত হোক বৃহত্তর দায়িত্ব নেবার জন্য। এই হোক ভোটার ডে এর কামনা।