তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বর্তমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। ক্রমশ তীব্র হচ্ছে বেকারত্বের যন্ত্রণা। আর এই জটিল- কঠিন পরিস্থিতিতে একমাত্র মহর্ষি নারদই নাকি পারেন বেকার যুবক যুবতীদের সেই যন্ত্রণার খবর দেবলোকে পৌঁছে দিতে। তারপর দেবতাদের আশীর্বাদে অবশ্যই জুটবে চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ। এই বিশ্বাস থেকেই কয়েক বছর আগে থেকেই মহর্ষি নারদের আরাধনায় মেতেছেন বাঁকুড়ার কদমাঘাটি পশ্চিম রতনপুরের এক দল বেকার যুবক।

প্রতি বছর নিয়ম করে কার্তিক মাসের বিশেষ এক দিন সুসজ্জিত মণ্ডপে চলে মহর্ষি নারদ পুজো। যা দেখতে ভিড় করেন এলাকার অসংখ্য মানুষ। গ্রামের মাঠে বসে মেলাও। সেখানে নানান রকমের দোকানে চলে বিকিকিনি। সঙ্গে খাবারের দোকানে ভাজা হচ্ছে পাঁপড়, জিলিপি৷ দেদার বিক্রি হচ্ছে গরম গরম মুখরোচক ঘুগনিও।

এই পুজোর আয়োজকদের দাবি, মহর্ষি নারদ নাকি ‘আদি সাংবাদিক’। তিনি দেবলোকের সঙ্গে মর্ত্যলোকের যোগাযোগ স্থাপন করেন। একমাত্র নারদই নারায়ণের নাম গান করতে করতে ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর সর্বত্র। তিনিই পারেন বর্তমান যুব সমাজের বেকারত্বের যন্ত্রণা দেবতাদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর সেই খবর মহর্ষি নারদের মাধ্যমে দেবতাদের কাছে পৌঁছালে কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। এই ভাবনা ও বিশ্বাস থেকেই এই গ্রামে মহর্ষি নারদের পুজো শুরু হয়েছে। এলাকায় প্রথম যারা এই পুজো শুরু করেছিল তাদের কয়েকজন ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন বা অন্য কোনভাবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত৷ বাকিরাও খুব শীঘ্রই চাকরি পেয়ে যাবেন বলে আশাবাদী তাঁরা।

মহর্ষি নারদের মাধ্যমে যদি বার্তা পাঠানো যায় চাকরি বা নিদেনপক্ষে কোন ধরণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিদিন এলাকার কদমাঘাটি, মেট্যালা, কালাডাঙ্গ, মাকুড়গ্রাম, নবান্দা, ভেদুয়া সহ প্রায় গ্রামের বেকার যুবক-যুবতী থেকে তাঁদের বাবা মা হাজির হচ্ছেন এখানে। মনস্কামনা পূরণের আশায় ভক্তিভরে পুজোও দিচ্ছেন তাঁরা। পুরাণ মতে সকল জায়গায় অবাধ বিচরণের অধিকারী দেবর্ষি নারদ। অনেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার কর্তা হিসেবেই নারদকে দেখেন।

আয়োজকদের পক্ষে অমিত রাণা বলেন, ‘বিজ্ঞানের অসামান্য সাফল্যের যুগে মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা অতি সহজে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলছি। কিন্তু স্বর্গলোকের সঙ্গে মর্ত্যলোকের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ‘বার্তাবাহক’ নারদ। তাঁর মাধ্যমে দেবতাদের কাছে বেকার যুবক যুবতীদের দুঃখ-দুর্দশা পৌঁছে দেওয়ার ভাবনা থেকেই এই পুজোর আয়োজন। তাতে কাজও হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, প্রথম পুজো যারা শুরু করেছিলেন তাদের অনেকেই আজ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। ফলে ফি বছর নারদ পুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উন্মাদনা বাড়ছে। তবে ‘নিন্দুকে’রা এই পুজো নিয়ে নানান কথা বললেও তা শুনতে নারাজ বলেই তিনি স্পষ্টতই জানিয়েছেন।

কলেজ পড়ুয়া সীমা ঘোষের কথায়, গত ছ’বছর ধরে গ্রামে এই পুজো হচ্ছে। পুজো শুরুর পর থেকেই নাকি গ্রামে বেকারত্বের সংখ্যাও কমছে। ফলে আরও অনেকের মতো সে নিজেও আশাবাদী পড়াশুনা শেষে তারও খুব তাড়াতাড়ি কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলবে।

তবে এই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেনা পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। সংগঠনের জেলা সম্পাদক জয়দেব চন্দ্র বলেন, শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। ফলে একদিকে যেমন কাজ নেই অন্য দিকে তেমনি শিক্ষা- স্বাস্থের পরিকাঠামো ভেঙ্গে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে বেকার যুবক সকলের মনে হচ্ছে এর পিছনে কোন অলৌকিক শক্তি কাজ করছে। এই ভাবনার কোন যুক্তি নেই। জনজীবনের সাধারণ চাহিদা না মেটার জন্যই হতাশা তৈরি হচ্ছে। সরকারের উচিৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। এলাকার যুবকরা হতাশার থেকে এই পুজো শুরু করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা সংগঠনগতভাবে তারা পদক্ষেপ নেবেন বলে তিনি জানান।