সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘ঘাস লাগান গরু বাঁচান’। গবাদি পশুর জন্য ভালো ঘাসের জমি কমে যাচ্ছে। খাদ্যের পরিমাণ কমছে। তাই গরু বাঁচাতে গেলে সবার আগে ঘাস বাঁচাতে হবে। কৃষির নির্ভর পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ গবাদি পশু পালন করেন। বলদের সঙ্গে অনেক কৃষকই গাভী পালন করে। দেশি গাভীর অধিকাংশের দুধ খুব একটা উন্নত মানের হয় না। অর্থাৎ তাজা গরুর দুধের পরিমাণ কম। এই দুধ বেশি উৎপাদন করতে গেলে উপায় একটাই। নেপিয়ার ঘাসের চাষ।

উচ্চ উৎপাদশীল নেপিয়ার ঘাস এই রাজ্যের সব জায়গাতেই সম্ভব বলে জানা জানাচ্ছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা বছরই গবাদির কাঁচা ঘাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম এই ঘাস। এই ঘাস দেখতে আখের মত, লম্বা ৬.৫-১৩.০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এই ঘাস দ্রুত বধর্নশীল, সহজে জন্মায়, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। একবার রোপন করলে বছর চারেক নিশ্চিন্ত। শীতে একটু সমস্যা হয় তবে বাকি সারা বছরই এর উৎপাদন অব্যাহত থাকে।

এই ঘাস যেকোনওরকম জমিতে উৎপাদন সম্ভব। তবে ডোবা, জলা এমন অঞ্চলে এই ঘাস চাষ করা যায় না। বর্ষার জল জমে থাকে না এরূপ জমি নেপিয়ার চাষের জন্য সব থেকে ভালো। অর্থাৎ জমির ঢাল ভালো হতে হবে। বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী। সাধারণতঃ বর্ষায় এই ঘাস রোপন করা ভালো। বর্ষার প্রারম্ভে এই ঘাসের চারা রোপন করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে চারা বা কাটিং লাগালে প্রথম বছরেই ৩/৪ বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যেতে পারে।

এর চাষ করতে গেলে সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করে কাটিং বা চারা লাগাতে হবে। এই ঘাস আখের কাটিং-এর মত কাটিং অর্থাৎ কান্ডের দুই মাথায় কমপক্ষে দু’টি বা তিনটি গিট রেখে কাটতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি। কাটিং ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে রোপন করা উচিত। একটি গিট মাটির নীচে, মধ্যের গিট মাটির সমানে রেখে চারা বা কাটিং অনুমানিক ৪৫০ কৌণিকভাবে লাগাতে হয়।

সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর অথবা ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে যখন বৃষ্টিপাত কম থাকে তখন নেপিয়ার ঘাস লাগানো উত্তম। অতি বৃষ্টিতে কাটিং লাগালে তা পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মোথা লাগালে অনুরূপভাবে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে গর্তের মধ্যে একটি করে চারা লাগাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি গর্তে কিছু পচা গোবর দিলে ভালো।

রাস্তা, পুকুরের বাঁধ বা পাহাড়ের ঢালু জমিতে নেপিয়ার চাষ করতে হলে প্রথমে ঢালের আগাছা কোদাল বা কাচি দ্বারা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে কোদাল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে গোবর ও সিঙ্গল সুপার ফসফেট  সার দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগিয়ে চার পাশ ভাল করে মাটি দিয়ে চেপে দিতে হবে যাতে চারার শিকড় মাটির সাথে লেগে থাকে।

রোপনের প্রায় ১০/১২ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল হয়। প্রত্যেক কাটিং-এর পর দুই সারির মাঝের জমি ভালোভাবে লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। প্রথম কাটিং ৬০-৮০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নেপিয়ারের উৎপাদন ভাল হয়। বছরের আষাঢ়-শ্রাবণ এবং মাঘ-ফাল্গুন মাসে মাটি আলগা করে দিতে হয়। গ্রীষ্মে ১০-১২ দিন অন্তর এবং এবং শীতকালে ১৫-২০ দিন অন্তর সেচ করা হলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।