জয়ন্ত ঘোষাল: এবারে ভোটের ঠিক একদিন আগে যখন নন্দীগ্রাম গেলাম তখন নন্দীগ্রাম ঢোকার মুখে বাসস্ট্যান্ডে একটা ঝুপড়ির মতো চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেতে চাইলাম। তখন সূর্য ডুবছে। এই সন্ধ্যের মুখটায় ওরা খুব ভালো পকোড়া বানায়। মাটির দাওয়া, সেখানে আলুর পকোড়া তৈরি হচ্ছে, পেঁয়াজিও তৈরি হচ্ছে। ভদ্রমহিলা বেসন দিয়ে খুব যত্ন করে পকোড়া ভাজছেন এবং তাঁর কর্তা পরিবেশন করছেন। সেখানে বসবার জন্য বেশ কয়েকটা বেঞ্চি পাতা আাছে। কিছু বাসের কন্ডাক্টর, স্থানীয় যুবক সব চা আর পকোড়া সহযোগে সন্ধ্যাবেলার আড্ডায় ব্যস্ত। এমন একটা সময় নন্দীগ্রামে আমার প্রবেশ।

স্বভাব যায় না মলে, আমি প্রথমেই চা আর পকোড়া খেতে খেতে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বুঝছেন, শুভেন্দু জিতবে, না মমতা জিতবে? মানে, লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি?’ ভদ্রমহিলা প্রথমে ওঁর স্বামীকে বললেন, তুমি ওঁকে পকোড়াটা খবরের কাগজের টুকরোয় কেন দিয়েছ? আমি এখানে ছোট স্টিলের প্লেট বা বাটিগুলো কেন রেখেছি? তুমি ওঁকে কোনও স্টিলের প্লেট বা বাটিতে করে পকোড়াগুলো দাও। খবরের কাগজ পিস পিস করে কেটে রেখেছেন। যারা এসে পকোড়া চাইছেন, দশ টাকায় একশো গ্রাম পকোড়া ওর মধ্যে দিচ্ছেন। কেউ নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ ওখানে বসেও খাচ্ছেন। আমাকে দেখে হয়তো ভদ্রলোকের মনে হয়েছে যে, কলকাতার বাবু, গাড়ি-টাড়িতে করে এসেছি। তাই আমাকে কাগজে না দিয়ে স্টিলের থালায় করে দেওয়া ভালো! সে না হয় স্টিলের বাটিতে পকোড়া পেলাম! কিন্তু উত্তরটা কী? জবাবটা কেন পাচ্ছি না? তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম, মাসিমা, এবারের ভোটে কি হবে?

এইবার ভদ্রমহিলা আমার দিকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, দেখুন, আপনি নিজেই তো প্রশ্নটা করছেন, কে জিতবে? শুভেন্দু, না মমতা? আরে বাবা, মমতা এতো বড় একজন নেত্রী, তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দশ বছর ধরে এখানে মুখ্যমন্ত্রী আছেন। এই নন্দীগ্রাম তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই জায়গা! কোথায় আপনি জিজ্ঞেস করবেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটের মার্জিন কী হবে? কত মার্জিনে জিতবেন? আপনি সেই প্রশ্ন না করে, আপনি প্রশ্ন করছেন, শুভেন্দু জিতবে, না মমতা জিতবে? তার মানে, প্রশ্নের মধ্যেই কিন্তু উত্তরটা রয়েছে, এবারের ভোটে একতরফা ব্যাপারটা নয়, প্রশ্ন আছে, সম্ভাবনা আছে। তবেই না আপনি এই প্রশ্ন করছেন! আমি একদম চমকে গেলাম!

আরও পড়ুন: সিঙ্গুরকে রবীনবাবু তাঁর বাঞ্ছারামের বাগান ভাবছেন, আর দিনহাটায় উড়ান দেওয়ার লড়াই

আমি যখনই পশ্চিমবঙ্গে যাই, সেখানকার বিভিন্ন গ্রামে যাই। ঠিক এইরকমই একবার ২০১৯ সালে ডায়মন্ড হারবারে একটি খাবারের দোকানের ভদ্রমহিলা আমাকে এই রকমই বিস্তর উপলব্ধি দান করেছিলেন।
এখন সবসময় ভাবি, আমরাই যে সবকিছু জানি, আমরাই যে সবজান্তা, আসলে তা নয়। গ্রামের এইসমস্ত মানুষ, তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা, তাদের বোধ-বুদ্ধি আমাদের চেয়ে কিছু কম তো নয়, বরং হয়তো অনেক বেশি! আসলে ভদ্রমহিলা যেটা বলতে চেয়েছিলেন এবং যখন ভদ্রমহিলা কথাগুলো বলছেন , ভদ্রলোকের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, তিনি তাঁর হাতটা গামছায় মুছতে মুছতে তাঁর স্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি নীরব সমর্থন জানিয়ে নিজে বেশ গৌরবান্বিত বোধ করছেন তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায়। আমার এখন মনে হচ্ছে যে, নন্দীগ্রামের ব্যাপারে বোঝার জন্য এখনও এগজিট পোল হোক, ছাই না হোক, এই বক্তব্যটার মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, লড়াইটা কিন্তু এবারে একতরফা নয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও পরবর্তীকালে তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নন্দীগ্রামে কিন্তু বিজেপি রিগিং করার চেষ্টা করেছে এবং বেশ কিছু বুথে রিগিংও হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুপুরের পরে বেরিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বুথে বসে রইলেন। এটা এইজন্যই তিনি করতে বাধ্য হয়েছেন যে, না হলে ওই বুথ ক্যাপচারিং হত। এটা কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচন কেন্দ্রে বুথ ক্যাপচারিংয়ের চেষ্টা এবং বুথ দখলের চেষ্টা। এটা চাট্টিখানি কথা! তাহলে এটা কেন হচ্ছে? আসলে নন্দীগ্রামের যে লড়াই, সে লড়াইটা আমার এখন মনে হয় যে, ঠিক মমতা বনাম বিজেপির লড়াই যতটা, তার থেকে বেশি হচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস বনাম তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস বনাম শুভেন্দুর তৃণমূল কংগ্রেস। এই যে নন্দীগ্রামের মানুষজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম, সেখানে কিন্তু আমি দেখলাম, নন্দীগ্রামে দুটো ব্লক আছে। একটা ব্লক হিন্দু প্রধান এবং আর একটা ব্লক মুসলমান প্রধান। হিন্দু প্রধান ব্লকে শুভেন্দু অধিকারীর নিয়ন্ত্রণ বেশি এবং তিনি জেনে গেছেন যে, মুসলমান ভোট তিনি পাবেব না। যদি সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফন্ট ওখানে একটা প্রার্থী দিত তাহলে কী হত, তা জানি না। যদিও শুভেন্দু অধিকারী সেটা চেয়েছিলেন। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সিদ্দিকী সেটা করেননি। সিপিএম মীনাক্ষীকে প্রার্থী করলেও তিনি কিন্তু হিন্দু এবং মহিলা প্রার্থী। মুসলমান প্রার্থী দিলে মমতার জন্য সেটা মুসলমান ভোটে থাবা বসানোর একটা চেষ্টার সম্ভাবনা ছিল। তা কিন্তু হল না। এখন এই পরিস্থিতিতে সিপিএম কেন মুসলমান প্রার্থী দিল না? সিদ্দিকী কেন মুসলমান প্রার্থী দিল না? এসব প্রশ্ন থেকে যাবে। পরে এগুলো হয়তো কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছ থেকে আমরা জানতে পারবো। আপাতত এইটুকু বলা যেতে পারে, সিদ্দিকী প্রার্থী না দেওয়াতে কিন্তু অসুবিধে হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর।

আরও পড়ুন: উনিশে এপ্রিলে ‘রগড়ে দেওয়া’র পাল্টা ‘ঘোষ এন্ড কোম্পানি’র এপিসোড দিতেন ঋতুপর্ণ

মুসলমান ভোটটা এককাট্টা হয়ে মমতার দিকে যদি যায় তাহলে হিন্দু ভোটটা যাতে শুভেন্দু পায়, তার জন্যেই কিন্তু শুভেন্দু মমতাকে বেগম, বেগম বলে প্রচার শুরু করেন এবং তারই পাল্টা করার জন্য মমতা তাঁর নিজের গোত্র থেকে শুরু করে তাঁর হিন্দু আইডেনটিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্যও পাল্টা চেষ্টা করেন। এই ধরনের ভোট তো আমি এর আগে কখনও দেখিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গোত্র বলছেন এবং তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ, একথা তিনি জানাচ্ছেন! পরিস্থিতি এমনই হয়ে গেছে! এটাকেই তো বলা হয় মেরুকরণের রাজনীতি। এই মেরুকরণের রাজনীতি বিজেপি সবসময়ই করতে চায়। এখন যেটা পশ্চিমবঙ্গে হচ্ছে, আগে গোটা দেশেই বিজেপি তা করেছে। বিজেপি চায়, যাতে হিন্দু ভোটটা কনস্যুলেটড হয়ে তাদের দিকে যায়। আর মুসলিম তোষনের কথা বলে একদা কংগ্রেসকে বিদ্ধ করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সেই একই জিনিস মমতার বিরুদ্ধে করছে। যেসব জায়গায় মুসলমান সংখ্যা বেশি, যেমন পশ্চিমবঙ্গে প্রায় শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ মুসলমান। এইসব জায়গায় বিজেপি মনে করে, তাদের বৃদ্ধির সম্ভাবনাটা বেশি। সেই কারণে নন্দীগ্রামে তাদের লড়াইটা এতো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে প্রার্থী করে দিয়ে বিজেপি কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জ যেমন নিয়েছে তেমন একটা ঝুঁকিও নিয়েছে। আর ঝুঁকি না নিলে রাজনীতিতে লাভ করা যায় না। এটা অমিত শাহের রাজনৈতিক রণকৌশলের সবথেকে প্রথম সূত্র। সেই সূত্র অনুসারে তিনি শুভেন্দু অধিকারীকে দাঁড় করিয়েছেন।

এখন এই পরিস্থিতিতে মমতা কিন্তু যখন প্রথমে নন্দীগ্রামে গেছেন এবং ওখানে ওঁর পার্টি অফিস তৈরি করা হয়েছিল। যেখানে উনি থাকবেন, সেটা তৈরি করা হয়েছিল মুসলিম প্রধান এলাকায়। খুবই বড়সড় একটা বাড়ি। মমতা কিন্তু সেটা নাকচ করে দেন এবং তিনি হিন্দু প্রধান এলাকাতেই থাকেন। মুসলমান ধর্ম এবং তাঁদের আচার তিনি যতটা না মেনেছেন, তার চেয়ে বেশি তিনি মন্দিরে গেছেন, তিনি কীর্ত্তনের আয়োজন করেছেন এবং দোলের দিন কীর্ত্তনীয়া গায়িকা, ওঁর দলেরই প্রার্থী অদিতি মুন্সীকে ডেকে নিয়ে এসেছেন নন্দীগ্রামে। এই সবই হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রণকৌশল। সুতরাং, এইভাবে নন্দীগ্রামে বাজিমাত করাটা হল মমতার একটা রাজনৈতিক ঝুঁকি, যা তিনি নিয়েছেন। আর মমতাই প্রথম ঘোষণা করেছেন যে, তিনি নিজেই লড়বেন। সেইটা মাস্টার স্ট্রোক হয়েছিল কি না, তা জানা যাবে ২রা মে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.