সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ভারতের সংবিধানের সৌন্দর্য বেড়েছে তাঁরই হাতের আঁকায়। সম্মানিত হয়েছেন পদ্মবিভূষণে। কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। তাঁর আকর্ষণ ছিল শুধুমাত্র চিত্রশিল্প ঘিরে। সেই পড়াশোনায় অনাগ্রহী ,অমনোযোগী ছাত্রের হাতেই সেজে উঠেছিল স্বাধীন ভারতের সংবিধান। তিনি নন্দলাল বসু।

ছেলেবেলা থেকেই নন্দলাল কোনওরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই দেবদেবীর মূর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুতুল তৈরি করতেন। আকর্ষণ শুধুই আঁকা এবং শিল্পকে ঘিরে। অমনোযোগিতার কারণে এফ.এ পরীক্ষায় পর পর দুবার ফেল করেছিলেন। বাবা পূর্ণচন্দ্র বসু ও মা ক্ষেত্রমণি দেবী ছেলের পড়াশোনায় এমন অনীহা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

শেষে পরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহায্যে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। সেই শুরু তাঁর জয় যাত্রা। ভারতীয় শিল্পের ধারাটাই বদলে দিলেন তিনি। পড়াশোনায় চূড়ান্ত অমনোযোগী ফেল করা ছাত্রই শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধক্ষ্য হন। তাঁকেই ভারতের সংবিধানের বইয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির দায়িত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।

প্রধানমন্ত্রীকে আশাহত করেননি শিল্পী। ভারত তখন সদ্য স্বাধীনতা পেয়েছে। বাবা সাহেব আম্বেদকর রচনা করে ফেলেছেন ভারতের সংবিধান। কিন্তু শুধু লেখাই কি থাকবে বিশাল বই জুড়ে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একটু অন্যকিছু করার ভাবনাচিন্তা করছিলেন। তিনি নন্দলাল বসুকে বলেন সংবিধানের বইয়ের জন্য কিছু ছবি এঁকে দিতে। চাচা নেহরুর ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন শিল্পী। নন্দলাল বসু মোট বাইশটি ছবি আঁকেন ভারতের সংবিধানের পাতায়। এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেন কলাভবনেরই কয়েকজন ছাত্র।

নন্দলালের অনবদ্য চিত্রশৈলীতে সংবিধানের পৃষ্ঠাগুলিতে ফুটে উঠেছে মহেঞ্জোদারোর সিলমোহর, রামায়ণ, মহাভারত, গুরুকূল শিক্ষা, বুদ্ধের জীবন ও সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম-প্রচার, মহাবীরের কথা, গুপ্তযুগ, বিক্রমাদিত্যের সভা, সম্রাট আকবর ও মুঘল স্থাপত্য, শিবাজি, গুরুগোবিন্দ সিং, রানি লক্ষ্মীবাই, টিপু সুলতান, গান্ধিজির আন্দোলন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই সহ ভারতের পাহাড়, সমুদ্র ও মরুভূমির বিচিত্র সৌন্দর্যের রূপ। সংবিধানের বিষয় ও অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ছবিগুলি একেছিলেন তিনি। বর্তমানে এই অমূল্য সংবিধানটি রাখা আছে ভারতের সংসদের গ্রন্থাগারে বিশেষ একটি হিলিয়ামগ‍্যাস ভরা বাক্সে। এই মূল সংবিধানটিই পরবর্তীকালে ফোটো-লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে অত‍্যন্ত যত্ন করে অল্পকিছু কপি ছাপা হয় দেরাদুনের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে।

সংবিধানের নিয়ে অনেকেই চর্চা করেন। সংবিধানের ভুল-ত্রুটি নিয়ে কাটাছেঁড়াও করেন অনেকে। কিন্তু এই বিষয়টি অনেকেরই অজানা। ভারতের সংবিধানের মূল-কপিটি আসলে একটি হাতেলেখা ও আঁকা বই। ঠিক যেমন করে অতীতের পুথিগুলি তৈরি করা হত এটিও সেভাবেই রচিত। ভারতের সংবিধানটি আগাগোড়া হাতে লিখেছিলেন সুদক্ষ লিপিকর প্রেমবিহারী নারায়ণ রায়জাদা। সংবিধানের প্রত‍্যেকটি পাতার নীচে বাঁদিকে তাঁর স্বাক্ষর করা আছে।