সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এক অদ্ভুত শহর কলকাতা। পঁচিশে পালনে মত্ত শহর। চার্চে যীশুর উপাসনা তেমনই হয়েছে শহরে ইহুদিদের উপাসনাস্থল অর্থাৎ সিনাগগগুলিতে। কিন্তু শহরের ইহুদিদের ওই সমস্ত উপাসনাস্থল রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা।

মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি আর মুসলমানদের সম্পর্কে টানাপড়েন থাকলেও তার বিন্দুমাত্র ছাপ কোনওদিন কলকাতায় পড়েনি। আজও সেই ঐতিহ্য অটুট। এখানে সব ক’টি সিনাগগ দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন মুসলমানরা। এমনকি, তোরা অর্থাৎ ইহুদিদের উপাসনা গ্রন্থটি যে ঘরে রক্ষিত আছে সেখানেও ঢুকতে পারেন এঁরা। প্রার্থনার সময় ইহুদিরা টুপির মতো যে আবরণ দিয়ে মাথা ঢাকেন সেই কিপা নিজেরা তো পড়েনই, যাঁরা সিনাগগগুলি দেখতে আসেন তাঁরা মাথায় রেখেছেন কি না সে দিকেও কড়া নজর থাকে এঁদের। জুয়িশ গার্লস স্কুলেও মুসলিম মেয়েরাই পড়ে এখন। একসময় পাঁচ হাজারেরও বেশি ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। এখন সংখ্যাটা মেরেকেটে ২০

যে ক’জন এখনও এই শহরে, এই শহরটাকে ভালবেসে রয়ে গিয়েছেন তাঁরা কিন্তু শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, ভালবাসা। এই উদ্দেশ্যেই সময়ের ছাপ পড়ে যাওয়া মাগেন ডেভিড সিনাগগ এবং বেথেল এল-এর সংস্কার শুরু করা হয়। প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সিনাগগ দু’টি খুলে দেওয়া হয়েছে।
ইহুদি নিয়মে প্রার্থনা করার জন্য কমপক্ষে দশ জন পুরুষ দরকার, যাকে হিব্রুতে মিনইয়ান বলা হয়। লোকের অভাবে তাই বহু দিন বন্ধ হয়ে গিয়েছে নিয়মিত প্রার্থনা। কিন্তু আজও কেউ কেউ নিয়মিত সিনাগগে আসেন। প্রথমত, শুক্রবার এসে জলে ভাসমান মোম জ্বালিয়ে যান। শনিবার প্রার্থনায় বসেন। এখন এই শহর ওঁদেরই। কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে চান না এঁরা। যত দিন বেঁচে আছেন এই শহরেই নিজেদের মতো করে ভক্তি আর প্রেম উৎসর্গ করেন ঈশ্বরকে।

ব্রিটিশ শাসনকালে কলকাতা যখন বাণিজ্যনগরী হিসেবে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল সেই সময় বাগদাদি ইহুদিরা এ দেশে আসেন। বলা হয় সিরিয়ার আলেপ্পা থেকে ১৭৯৮-এ শালোম ওয়াদিয়া কোহেন নামে এক ইহুদি সুরাত হয়ে প্রথম কলকাতায় পা রাখেন। সেই শুরু।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ বহু ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। তবে শুধু এসেছিলেন বলাটা বোধহয় ভুল হবে। এঁরা এসেছিলেন এবং জয় করেছিলেন। রিয়াল এস্টেট, চলচ্চিত্র আর গ্ল্যামারের দুনিয়া ঝলমলে হয়ে ওঠে এঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে। শিক্ষা বা নারীদের প্রগতিশীলতাতেও এঁদের অবদান কম ছিল না। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের নামী অভিনেত্রী আরতি দেবী আসলে ছিলেন ইহুদি। তাঁর নাম ছিল রাচেল সোফাইয়ার।

এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম, যিনি প্রমীলা নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম ‘মিস ইন্ডিয়া’ ছিলেন। ১৯৬৭-তে তাঁর মেয়েও ‘মিস ইন্ডিয়া’ হন। রিয়েল এস্টেট এবং কিছু কিছু ব্যবসায় ইহুদি এজরাদের সেই সময় একচেটিয়া প্রতিপত্তি ছিল। কলকাতার এজরা স্ট্রিট, মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে এজরা বিল্ডিং, চৌরঙ্গি ম্যানসন সমেত আরও বেশ কিছু বাড়ি এজরারা তৈরি করেন। এজরা স্ট্রিটের সমস্ত বাড়ির মালিক ছিলেন এজরারাই। অর্থ আর প্রতিপত্তিতে এর পরেই নাম আসে গাব্বেদের। আলিপুর চিড়িয়াখানায় গাব্বে হাউস এদেরই অবদান। নিউ মার্কেটের নাহুম, যার কেক কলকাতায় এখনও বড় প্রিয়, সেটিও ইহুদিদেরই। স্বাধীন ইজরায়েল গঠন এবং আরও নানা কারণে একসময় দলে দলে ইহুদি ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যেতে থাকেন।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ