পূর্ব মেদিনীপুর: সরকারের অনুরোধ ও প্রশাসনের আবেদন মেনেই নিরস্ত্র মিছিল করা হয় এগরার পানিপারুলে। জেলা পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রের খবর, কোনও রকম রাজনৈতিক বিতর্ক যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, তাই সরকারের তরফে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তাঁরা যেন অস্ত্র নিয়ে মিছিল না করেন। তাই প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই এগরার পানিপারুল ইসলাম কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মহরমের শোভাযাত্রায় নিরস্ত্র মিছিল হয়। মঙ্গলবার পানিপারুলে অস্ত্র ছাড়াই মহরমের তাজিয়া নিয়ে জৌলুস বের হয়।

পানিপারুল ইসলাম কমিটির সম্পাদক বাবুল সাহা বলেন, “মহরম হল একটি শোকের দিন। আমরা রীতি অনুযায়ী শোক পালন করি। আমরা বরাবরই নিরস্ত্র জৌলুষ বার করি। আমরা চাই না কার ধর্মে ও ভাবাঘাতে আঘাত করতে। আমরা উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা একে অপরের উৎসবে সামিল হই।” সংস্থার সভাপতি আব্দুল সাহা বলেন, “সম্প্রীতির বার্তা দিতেই নিরস্ত্র মিছিল। আমরা শোকজ্ঞাপনের জন্য সবাই একত্রে মিলিত হই।” ছিলেন আলিমুদ্দিন সাহা, লতিফ সাফা, আবু সালেক ও সাগির সাহা প্রমুখ।পাশাপাশি এ দিন এগরা, রামনগর, কাঁথি, পটাশপুর, ভগবানপুর, চণ্ডীপুর, খেজুরি, নন্দীগ্রাম, হলদিয়া, মহিষাদল, নন্দকুমার, তমলুক, কোলাঘাট, ময়না, পাঁশকুড়া – সর্বত্রই সাড়ম্বরে মহরম উৎসব পালিত হয়।

প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগেই তমলুকে মহরম উপলক্ষে প্রশাসনিক বৈঠক হয়েছিল। সেখানে মহরমের উদ্যোক্তারা অস্ত্র মিছিল করবে না বলে জেলা প্রশাসনকে আশ্বাসও দিয়েছিল।পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সুপার ভি সোলেমান নেসাকুমার বলছেন, “শান্তিপূর্ণ ভাবে জেলার সর্বত্রই মহরম হয়েছে। কোথাও কোন কিছু হয়নি।” উল্লেখ্য, মহরম কোনও উৎসবের দিন নয়, মহরম হল একটি শোকের দিন। আরবি মহরম মাসের ১০ তারিখ ইমাম হুসেন শহিদ হয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে ধরেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মহরম ইসলামি মাস এবং এই মাস থেকেই ইসলাম ধর্মের নতুন বছরের সূচনা হয়। দশম মহরমে হজরত ইমাম হুসেনের স্মরণে শোক উদযাপন বলা হয়।এই দিনটিকে রোজ- এ- আশুরা বলা হয়।

এইদিন জুলুস বের করে হুসেনকে স্মরণ করা হয়। দশম মহরমে রোজা রাখারও প্রথা রয়েছে। আরবি মহরম মাসের ১০ তারিখে দিন ইসলামের রক্ষার্থে হজরত ইমাম হুসেন নিজের প্রাণের বলিদান দিয়েছিলেন। আজ সেই মহরম। ইসলামি ধর্মাবলি মানুষের বিশ্বাস অনুসারে, ইরাকে ইয়াজিদ নামের এক নিষ্ঠুর বাদশাহ ছিলেন। তিনি ছিলেন মানবতার শত্রু। ইয়াজিদ নিজেকে খলিফা মনে করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর প্রতি তাঁর কোন বিশ্বাস ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন হজরত ইমাম হুসেন তাঁর শিবিরে যোগদান করুক। কিন্তু হুসেন এতে সম্মতি জানায়নি। তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করেন। হুসেনই ও পরিবার, বন্ধুবান্ধব সহ শহিদ হন কারবালায়। এই মহরম মাসেই তিনি শহিদ হয়েছিলেন। মহরমের মাসে মুসলমানরা শোক পালন করেন ও নিজেদের সব খুশি ত্যাগ করেন।

হুসেনের উদ্দেশ্য ছিল নিজে শহীদ হয়ে ইসলাম ও মানবতার রক্ষা করা। মহরম কোনও উৎসব নয়। এটি হল অধর্মের উপরে ধর্মের জয়ের প্রতীক।ইসলামের বিশ্বাস অনুসারে হজরত ইমাম হুসেন তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের সঙ্গে ছোট ছোট শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধরাও ছিলেন।দশ মহরমের সকালে হুসেন নামাজ পড়েন।তখনই ইয়াজিদের সেনাবাহিনী তির ছুঁড়তে লাগলো।সব বন্ধুরা হুসেনকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন।হুসেন নামাজ পড়া শেষ করেন।এরপর দিন শেষ হওয়ার আগে হুসেনের ৭২ জন সঙ্গী শহীদ হন।এর মধ্যে হুসেনের ছয় মাসের ছেলে আলি অসগর ও ১৮ বছরের ছেলে আলি আকবরও ছিল। হুসেনের মাথা কেটে ফেলা হয়।কথিত আছে যে হুসেনের ঘাড় মাটিতে পড়ে গেলেও তা সেজদার অবস্থায় ছিল।কারবালার যুদ্ধে হুসেনের ছেলে জয়নাল আবেদিন ছাড়া গোটা পুরো পরিবার শহীদ হয়েছিল।মহরম মাসের দশম দিনটিকে আশুরা বলা হয়।

এই ঘটনার পরে, ইসলাম ধর্মালম্বীরা ইসলামিক নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করে দেয়।পরবর্তী সময়ে মহরম মাস দুঃখের মাসে পরিণত হয়। শিয়া সম্প্রদায়ভুক্তরা দশম মহরমের দিন কালো পোশাক পরে হুসেন ও তাঁর পরিবারের ‘শাহদাত’ কে স্মরণ করেন। হুসেনের শাহাদাতের স্মরণে রাস্তায় একটি শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং শোক উদযাপিত হয়।মহরমের নবম এবং দশম তারিখে, মুসলমানরা রোজা রাখে।মসজিদ ও বাড়িতে নামাজ আদায় করা হয়।পাশাপাশি সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্তরা মহরম মাসে ১০ দিন পর্যন্ত রোজা রাখে।মহরমের একদিনের পুণ্য ৩০ দিনের সমান।পবিত্র মহরম উপলক্ষে জেলাবাসীকে অভিনন্দন ও অনুষ্ঠানের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করেন জেলার প্রাক্তন সহকারী সভাধিপতি মামুদ হোসেন, জেলা পরিষদের সদস্য উত্তম বারিক ও সমাজকর্মী আনিসুর রহমান।